পহেলা বৈশাখের বিশেষ গল্প- নববর্ষের আনন্দ ছুঁয়ে যাক প্রতিটি জীবনকে


ছবি সৌজন্য- আফরোজা আলী তুলি ও পূজা ধর

প্রচণ্ড চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে গেল তৃষার । কোথায় ভেবেছিলো আজ পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে অফিস ছুটি , লম্বা একটা ঘুম দেওয়া যাবে। তার আর হলো কোথায় ! চোখ দুটি বলছে “ তৃষা মা আমার , তুই আরেকটু ঘুমিয়ে নে । ছুটির দিনের ঘুম এইভাবে নষ্ট করতে নেই সোনামণি ‘’। আর কান দুটি যেন চোখের সতীনের মতো বলছে , “ অনেক ঘুম হয়েছে মহারাণী । আর ঘুমিয়ে কাজ নেই । ছুটির দিন বলে সারাবেলা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে হবে এটা কোথায় লিখা আছে বাছা আমার ।শীঘ্রই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়। দুই সতীনের লড়াই শেষে “কান “ দুটোকে তার বিজয়ী হিসেবে মানতে হলো । কিন্তু তৃষা এখন বুঝতে পারছেনা এতো শব্দ আসছে কথা থেকে । প্রথমে ভেবেছিলো পাশের বাড়ির বাচ্চাগুলো হয়তো চেঁচামেচি করছে । এখন তো মনে হচ্ছে এই বিকট শব্দের উৎপত্তিস্থল তার নিজ ঘর ।

বসার ঘরে গিয়ে দেখে বাবা আর ভাই চুপ করে বসে আছে আর কাজের রিনা মাসি মায়ের মাথায় জল ঢালছে । কি হয়েছে জানতে চাওয়ার সাথে সাথে মা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল

– “ আমার পহেলা বৈশাখটা মাটি হয়ে গেলরে তৃষা। কত শখ করে বিশটা দোকান ঘুরে ওই শাড়ীটা কিনে এনেছিলাম । কত প্ল্যান ছিল আমার । ঐ শাড়িটা পরে ঘুরতে বেরুবো , ফেসবুকে ছবি দিব । এইবার নিশ্চয় আমার ছবি গুলো রায় গিন্নির চেয়ে বেশি লাইক কামাবে । কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল ‘’ এই বলে তিনি আবার ডুকরে কেঁদে উঠলো ।“ ঘরে এতজিনিস থাকতে কিনা আমার এতো সাধের শাড়ীটাকেই উধাও হতে হলো।

-“ তোদের মাকে সে কখন থেকে বলছি বাজারেতো আরো অনেক শাড়ী রয়েছে । তৃষা আর তুমি বেরিয়ে না হয় অন্য একটা কিনে নিবে । হয়তো দেখা যাচ্ছে যা গেছে তার চেয়ে আরো ভালো কিছু পেয়ে গেছো”।

– “ তুমি চুপ করো । সারাজীবনতো কাটিয়ে দিলে ঐ অফিস আর খবরের কাগজ নিয়ে । ফ্যাশনের কিছু বোঝো ?’

মায়ের এই ধমকের পর স্বান্তনা দেওয়ার সাহস আর কারোরই ছিলোনা । মা এমনি । তার এই ছোট্ট সংসার আর নতুন ডিজাইনের শাড়ী । এই দুটোই যেন তার পৃথিবী । কাজ শেষে সারাদিন একা থাকে । তাই তৃষা মাকে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিল যাতে অবসর সময়টা মায়ের ভালোই কেটে যাই । কিন্তু এই অ্যাকাউন্ট অনেকটা “ খাল কেটে কুমির আনার” মতো হয়ে গেল তাদের জন্য । মায়ের যে বান্ধবীগণ রয়েছেন তারা সবাই যেন এক নতুন প্রতিযোগিতাই নেমেছে । কার চেয়ে কার ছবিতে বেশি লাইক, কমেন্ট পড়বে আন্টিরা এখন সে চিন্তায় মশগুল সর্বদা । সারাদিন অফিসের এতো চাপ , তারপর বাড়ি ফিরে এসে মায়ের এই অনলাইন জগতের গল্প । আবার না শুনতে চাইলেও বিপদ । মায়ের চোখ দুটো থেকে অবিরাম বর্ষণ হতে থাকে ।

কিন্তু আজকের বৃষ্টি যেন কিছুতেই থামছেনা । রিনা মাসি এতো জল ঢালছে মনে হচ্ছে একটু পর একটা প্রবল বন্যা হতে পারে । মা শোকে এতটাই জমে গেছে যে, পহেলা বৈশাখে শাড়ী পরে ফেসবুকে ছবি দেওয়া ছাড়া যে আরো অনেক কাজ থাকে সেটা মায়ের মাথা থেকেই বেরিয়ে গেছে ।

-“ মা, আজ আমাদের সবাই মিলে বেরুনোর কথা আছে । তুমি তো দেখছি সে কথা ভুলেই গেছো। এমন জলভর্তি মাথা নিয়ে বেরুলে লোকে কি বলবে বলো তো। তোমার একটা ছবিও ভালো আসবেনা । আর তোমার বান্ধবীদের ……’’

– “ অনেক বলেছ, আর বলতে হবেনা । কিগো বীণার মা , কাজকর্ম না করে বসে থাকলে চলবে কি ? জলদি কাজ শেষ করে নাইতো বাপু। বিকেল বেলা মেয়েকে নিয়ে এসো । মনে থাকবে তো ?’’ “ আজ্ঞে দিদি , মনে থাকবে।‘’

পরিবারের সবার সাথে সময় কাটানোর ব্যপারটাই অন্যরকম । তা যদি আবার বিশেষ কোন উপলক্ষ্যে হয় । সারাদিন ঘোরাফেরার পর সবাই খুব ক্লান্ত । মায়ের সে মন খারাপের ব্যাপারটি এখন আর নেই । হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে ঊঠলো ।

“ মনে হয় বীণার মা এসেছে । ওদের তো নেমতন্ন করেছিলাম । দরজাটা খুলে দিয়ে আয় তো মা ‘’। বীণা আর রিনা মাসিকে দেখে মায়ের চোখ দুটো ছানাবড়া । যেন তারা মেয়ের দুটো কিডনি খুলে নিয়ে বসে আছে । তৃষা অবশ্য এরকম কিছু দেখবার জন্য আগে থেকেই প্রস্ত্রুত ছিলো । কিন্তু মা তো আর প্রস্তুত ছিলোনা । তার হারিয়ে যাওয়া শাড়ী বীণার কাছে কি করে গেল । তবে বীণার মা…। না না ,চুরির অভ্যেস এই মহিলার নেই।এতো বছর ধরে দেখে আসছে । কিন্তু বীণার কাছে কি করে ? নতুন কিনেছে নিশ্চয়। কিন্তু এতো দাম তো কিনতে পারার কথা না । মায়ের মনে একটা প্রশ্নের জাল তৈরি হয়ে গেছে তৃষা তা ভালই টের পাচ্ছিলো ।

-“ কি সুন্দর লাগছে তো কে বীণা । শাড়ীটা খুব সুন্দর মানিয়েছে তো কে । “

-“ মাসি এর আগে আমাকে এতো সুন্দর উপহার কেউ দেয়নি । দিদি যখন কাল আমকে শাড়ীটা দিয়ে বললো আপনি আমার জন্য এটা নিজে পছন্দ করে কিনেছেন তখন মনে হচ্ছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে দামি উপহারের মালিক আমি । কিন্তু আবার একটু খারাপ লাগছিল এটা ভেবে, আমাকে এতো ভালো একটা উপহার দিলো কিন্তু আমার তো মাসিকে দেওয়ার মতো কিছু নেই । স্কুলের টিফিন খরচ থেকে সামান্য কিছু টাকা জমিয়েছিলাম দিয়ে এই চুড়ি গুলো আপনার জন্য কিনে এনেছি ম্যাডাম । জানিনা এই সস্তা উপহারটুকু আপনি গ্রহন করবেন কিনা “ তৃষা দেখছে মায়ের চোখ জলে ছলছল করছে ।

_ “ পছন্দ হবেনা কি বলছিস , এইবার পহেলা বৈশাখে এর চেয়ে ভালো উপহার আমাকে কেউ দেয়নিরে ‘’। বলার পর মা আড়চোখে তৃষার দিকে একটু তাকালো এই চাহনিতে কোন অভিমান নেই ।

“ তৃষা ,দাঁড়িয়ে আছিস কেন ওখানে ? জলদি আয় ।আমার দুই মেয়ের সাথে একটা সেলফি তুলি । ফেসবুকে অ্যাড করতে হবে তো ।‘’

কমেন্ট করুন

What's Your Reaction?

hate hate
1
hate
confused confused
0
confused
fail fail
2
fail
fun fun
0
fun
geeky geeky
1
geeky
love love
3
love
lol lol
1
lol
omg omg
0
omg
win win
0
win
Puja Dhar
বি.বি.এ শেষ করেছি। নিজের অজান্তেই হাতে কলম তুলে নিয়েছি, ইচ্ছে আছে এই কলম নিয়ে বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার। আর বাংলাহাব সেই ধাপের প্রথম সিঁড়ি।

লগইন করুন

আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন।

পাসওয়ার্ড রিসেট করুন!

পাসওয়ার্ড রিসেট করুন!

সাইন আপ করুন

আমাদের পরিবারের সদস্য হোন।

Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles
Meme
Upload your own images to make custom memes
Video
Youtube, Vimeo or Vine Embeds
Audio
Soundcloud or Mixcloud Embeds
Image
Photo or GIF
Gif
GIF format