রহস্য গল্প- লাশটি কার? ( পর্ব-০১)


মাঠের ঠিক দক্ষিণে ঘন ভেট গাছের জঙ্গল।তার পাশেই শতবছরের একটা পাকুড় গাছ তার ডালপালা ছড়িয়ে দিয়েছে তিন চার শতক জায়গা জুড়ে।এ দিকে গাঁয়ের লোকজনের খুব একটা যাতায়াত নেই বললেই চলে।থাকবেই বা কেমন করে, গাঁয়ের লোকের মগজে ঘাপটি মেরে বসে আছে জহির আলী পরামানিকের ভূতের ভয়।গতবছর আশ্বিণের শেষে এক অজানা কারণে পাকুড় গাছের উত্তরের লম্বা ডালের সাথে নিজের গামছা দিয়ে ফাঁস লাগিয়েছিলো জহির আলী।মরার পর প্রায় একহাত জিব বেরিয়েছিলো তার।তা দেখে ভয়ে গনি মন্ডলের ১০ বছরের ছেলেটার জ্বর প্রায় মাস খানিক পরে কবিরাজের অনেক ঝাড়ফুঁক, হুজুরের পানি পড়ার দৌলতে সেরেছিলো। জহিরের মরার কারণ এতোদিন কেউই ঠাওর করতে পারেনি। দারগা-থানা-পুলিশ-মামলা-মকদ্দমাও কম হয় নি।গত বছরে থানা পুলিশের ভয়ে গাঁয়ের বেটা ছেলে কেউই ঘরে থাকতে পারেনি।

মসজিদের ঈমাম মোসলেম উদ্দিনের ফতোয়া মোতাবেক জহির আলী পরামানিকের জানাজাও হয়নি।ঈমাম সাহেবের কড়া ফতোয়া ছিলো যে, ফাঁস লাগানো মরা মানষের জানাজা, মাটি দেওয়া যাবে না। যদি কোন মুসলমান তার জানাজা পড়ে তাইলে সেও জাহান্নামের আগুনে পুড়বে।গাঁয়ের লোকজন ঈমাম সাহেবের কথায় খুব মান্যি গন্যি করে।তাই তো ডোমের ঘর থেকে লাশ গাঁয়ে ফেরার পর জহিরের বাড়ির পুবের ভিটায় জানাজা ছাড়াই কাছের দুই একজন আত্নীয় মিলে কোনমতে মাটি চাপা দিয়েছে। সেই থেকে গাঁয়ে সব ঘটনার পেছনে এই জহির আলী পরামানিকের ভূতের হাত আছে বলেই সবাই মনে করে। সবার ধারণা যেহেতু গাঁয়ের লোক জানাজা ছাড়াই জহির কে মাটি চাপা দিয়েছে সেহেতু এই জহিরের ভূত গাঁয়ের সকলের উপর ভীষন নারাজ।আর তাই সে গাঁয়ে নানা অনাচার অনিষ্ট করে চলেছে সবার।

এই জহিরের ভূতের ভয়ে গাঁয়ের লোকজন পাকুড় গাছের এদিকে যাওয়া আসা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। জমির বিশেষ কাজ না থাকলে কেউই ওদিকে ভূলেও যায় না। যদিও কারো যাওয়ার দরকার পড়ে তাহলে সাথে দু একজন কে নিয়ে যায় কিন্তু একা একা যাওয়ার সাহস কেউ করে না কখনো।

গনি মোল্লা আজ সকাল সকাল বেরিয়েছে পাকুড় গাছের দক্ষিণে তার আড়াই বিঘা ফসলের জমির ধান দেখতে। সকাল দেখে সে অন্য কাউকে সাথে নেয়নি আজ।ভেট গাছের জঙ্গলের কাছে আসতেই হঠাৎ গনি মোল্লার নজর পড়ে জঙ্গলের ভিতরে একটা ছিট কাপড়ের দিকে। সে মনে মনে চিন্তা করে এখানে মেয়ে মানুষের কাপড় আসলো কই থেকে? এদিকে তো ভয়ে লোকজন কেউ আসে না।আস্তে আস্তে সে জঙ্গলের ভিতরে যায়।

“ইয়া রাসুল্লাহ ইডা কি?–”

বলেই এক লাফে সে চার পাঁচ হাত সরে আসে।আবার উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে।একটা মেয়ে মানুষের উলঙ্গ দেহ জঙ্গলের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। পরনে পায়জামা ছাড় আর কিছুই নাই। তাও সে পায়জামার বাম পাশের অংশ ছেঁড়া।আর গায়ের ওড়না পাশে পড়ে আছে মানে যেটা দেখে গনি মোল্লা জঙ্গলের মধ্যে যায়।

এবার গনি মোল্লার ভয়ে হাত পা হীম হয়ে আসে। সে বার বার আল্লাহ রসুলের নাম যেমন জপতে থাকে তেমনি একনাগাড়ে চলে দোয়া ইউনুস পড়া। এরই ফাঁকে সে নিজের পাঞ্জাবির গলা খানিক উচু করে কয়েক বোতলা থুতু নিজের বুকে ছিটিয়ে দেয়।

আবার একটু উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করে পিছিয়ে যায়। উলঙ্গ দেহ খানের উপর নিজের গায়ের চাদরখান বাঁ হাতে বিছিয়ে দেয়।

সারা গায়ে দাগ আর ছোপ ছোপ রক্ত লেগে আছে। লাশ উপুড় হয়ে থাকায় খালি পিঠ দেখা যাচ্ছে ভালোভাবে।মাথার চুল গুলান মনে হচ্ছে কেউ হাত দিয়ে উপড়ে উপড়ে দড়ি বানিয়েছে কাজের জন্য। বাম গালের দুই দিকে আঁচড়ের দাগ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।মনে হচ্ছে কোন মানব পশু তার দেহ ভোগ করে এই জঙ্গলে ফেলে গেছে। সেটা একজন ও হতে পারে আবার কয়েকজন মিলেও হতে পারে। গনি মোল্লার ওতো ভাববার সময় এখন নেই। সে যতো দ্রুত সম্ভব এখান থেকে পালাতে পারলেই বাঁচে। শেষমেশ যদি জহির আলীর ভূতে তার উপর হামলা করে!

সে চাদরখান বিছিয়ে দিয়ে দ্রুত পায়ে রাস্তা ধরেছে বাড়ির।

অল্প সময়ের পরেই গাঁয়ের ঘন সবুজ দেওয়াল ভেদ করে মানুষের পাল ছুটেছে। কেউ দৌড়াচ্ছে তো কেউ আরেক জনকে ডাকতে ডাকতে হয়রান। ছেলে বুড়ো জোয়ান, মেয়ে ছেলে মানুষ, ছোট ছোট নেংটা উদোম শরীরের বাচ্চা গুলান কেউই বাদ নেই, সবার যাত্রাপথ পাকুড় গাছের পাশে ভেট গাছের জঙ্গলের দিকে।এই অল্প সময়ের মধ্যেই যে গনি মোল্লা পুরো গাঁও এই খবর রাষ্ট্র করতে পেরেছে সে জন্য তাকে ধন্যবাদ দিতেই হয়।

সবার মুখে এক কথা আহ আহ আল্লাহ মাবুদ একি সর্বনাশ, একি সর্বনাশ। এমন কাম কেডায় করলো, আহ তার উপর আল্লার গজব পড়ুক।

ভেট গাছের ঝোপের চারিদিকে মানুষের গোল চত্বর তৈরি হয়েছে ইতিমধ্যেই।গনি মোল্লাও এসেছে, সাথে ডেকে এনেছে ইউনিয়ন পরিষদের মাজু মেম্বার কে।

ইতোমধ্যে মাজু মেম্বার আবার তার ছোট ছেলেকে দিয়ে পরিষদে খবর পাঠিয়েছে চেয়ারম্যানের কাছে, আর বলে দিয়েছে দফাদার কে বলিস দুটো চৌকিদার কে যেন এখনি পাঠিয়ে দেয় এখানে।

খালেক মুন্সির বউ আবার তার কোলের তিন বছরের ছেলেটাকে সাথে নিয়ে এসেছে।বাচ্চা ছেলে মানুষ তাই বাড়িতে একা একা রেখে আসতে ভরসা পায় নি, যদি জহিরের ভুতে কিছু করে বসে।

দুজনেই ব্যাস্ত লাশটা কার সেটা দেখতে।ছোট ছোট নেংটা উদোম বাচ্চা ছেলে মেয়ে গুলান হুড়োহুড়ি শুরু করে দিয়েছে ভীড় ঠেলে লাশের কাছে যাবে বলে।কিন্তু ভীর এতোই বড় যে এরা কোন কূল কিনারাই করতে পারছে না, বরং দু একজনের ধমক খেয়ে সরে আরেক খানে গিয়ে আবার চেষ্টা করছে।

মাজু মেম্বার উচু গলায় খেঁকিয়ে:

-“ঐ মিয়ারা এতো কি দেহ এ্যা, মেয়ে ছেলের লাশ এতো কি দেখনের আছে। যাও যাও দূরে যাও, আর তোমরাও যে হইছো বাপু খালি কুনো কিছুর খবর পাইলে হয়।

ঐ আমরুল্লা লাশখান সিদা কর দেখি।কার লাশ এইডা।”

-আমি কেন মেম্বার চাচা।এইডা মেয়ে ছেলের লাশ, বেটা ছেলেপেলে হাত লাগানোডা কি ঠিক হবিনে।

-তাও ঠিক কতাই তো কচু রে আমরুইল্লা।ঐ জমিতনের মাও তুমি উল্টাও তো দেখি।তুমি তো শক্তি সামর্থবান মানুষ নামাজ কালাম জানো। তুমিই উল্টাও তো দেহি এইডা কার লাশ।

প্রথমে জমিতনের মা আপত্তি জানালেও শেষমেশ মেম্বারের ধমকে লাশের ডান দিকে হাত দিয়ে লাশখানা উল্টিয়ে দিয়ে চাদর খানা ভালো করে লাশের গায়ে ঢেকে দিলো।

লাশের মুখ এদিক করতেই ভীরের মধ্যে হইচই এইডা কার লাশ।

-এই মাইয়া তো এই তল্লাটের কেউ না।
-“কিগো মিয়ারা এই মাইয়ারে কি তোমরা কেউ চেন? কি মিয়ারা কথা কও না ক্যা”ধমক দেয় মাজু মেম্বার।
উপস্থিত সকলেই একবাক্য জানান দেয় এই লাশ তারা চেনে না আর কোনদিন এই মেয়েকে তারা দেখেও নি এই তল্লাটে।

ইতিমধ্যে মেম্বারের ছেলের খবরে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দুজন চৌকিদার এসেছে। মেম্বার কে সালাম দিয়ে :-

-যে মেম্বার সাব আমরা আইছি। 
চেয়ারম্যান সাব আইতাছে।কি করতে হইবো কন।

-আগে লাশের কাছ থেইকা এই মানুষ গুলান রে সরা।ঐ আমরুল্লাহ চেয়ারম্যান সাব আসপো জলদি কয়খান বেঞ্চ নিয়া আয় তো। যা তারাতারি আনিস নির্দেশ দিয়ে মাজু মেম্বার গনি মোল্লারে একটু সাইটে ডেকে নিয়ে পুনরায় ঘটনার বিস্তারিত শুনতে চাচ্ছে। কেননা চেয়ারম্যান আসবে তাকে তো পুরো ঘটনার বর্ননা দিতে হবে ।

-যাই কন মেম্বার সাব আমার মুনে হয় কুনো বজ্জাত মাইয়াডার সাথে আকাম কুকাম কইরা মাইরা লাশখান এইহানে ফালাই গেছে।
-“তা হইবার পারে। লাশ দেইখা তো তাই মনে হয় “, মেম্বারের একটু চিন্তা।

খানিক চিন্তা শেষে হকচকিয়ে মেম্বারের প্রশ্ন-

“ঐ মিয়া লাশডা তো একখান মাইয়া মানসের, এই মাইয়া হিন্দু না মুসলমান না জাইনা আমরা যে এতো কাউলা কাউলি করতাছি এইডা কেমুন কতা কও দেহি।যদি হিন্দু হয় তাইলে তো মুসলমানের নাড়াচাড়া করা যাবো না। পাপ হবো মিয়া।”

-“হুম হুম ঠিকই তো কইছেন মেম্বার সাব। আমি তো এইডা ভাইবা দেখি নাই।যদি হিন্দু হয় তাইলে কি হইবো? আর আমি কিনা না জাইনা আমার গায়ের চাদর খান গায়ে দিলেম।যদি সত্যে সত্যে মাইয়াডা হিন্দু হয়?”

-গভীর চিন্তার বিষয় মিয়া গভীর চিন্তার বিষয়।মাইয়াডা হিন্দু না মুসলমান না যাইনা তো আর কিছু করন যাবো না বুঝলা গনি মিয়া?

-হুম বুঝছি মেম্বার সাব।

-তয় দেহি চেয়ারম্যান সাব আসুক, কি কয় আগে শুনি, উনার ও তো একখান মতামত আছে কি কও মিয়া।
-হুম তাও কতা ঠিক।
-ঐ মিয়ারা সরো না কে এ্যা, দূরে গিয়া দারাও তো দেহি। সরো সরো মিয়ারা”-বলে চৌকিদার দুজন লাশের কাছ থেকে গাঁয়ের মানুষ গুলাক হাত তিনেক সরিয়ে দিলো।

এরি মধ্যে আমরুল আর তার সাথে এ গাঁয়ের দুজন তাগড়া জুনান ছেলে মিলে দু খান বেঞ্চ নিয়ে লাশের কাছে হাজির।

-“মেম্বার সাব বেঞ্চ আনিছি এহন কি করুম।”

-যা ঐ গাছের নিচে একখান ভালো জায়গা দেইখা বসার ব্যাবস্থা করেক গিয়া, চেয়ারম্যান সাব আসলো বইলা।

-চলো মিয়া ঐহানে যাই দেহি চেয়ারম্যান সাব আইসা কি করে।

উপস্থিত সকলেই লাশ কার সেই নিয়ে কানাঘুষা শুরু করে দিয়েছে।কেউ বলছে এই মাইয়া পাশের গাঁয়ের কেউ হইবার পারে।সাববিলে একখান খবর দেও গো মিয়ারা ওরা আইসা দেহুক চিনবার পারে কিনা।জমিতনের মায়ের সোজা উত্তর, না না মিয়ারা এই মাইয়া সাববিলের কেউ হইবার পারে না। ঐ গাঁয়ের বেবাক মানুষরে আমি চিনি, হাজারো হোক ঐডা তো বাপদাদার গাঁও।এই মাইয়া ঐ গাঁয়ের হইবার ই পারে না। তয় মধ্যে গাঁয়ে কেউ হইবার পারে মনে হয়।

কথাগুলো মাজু মেম্বার এতোক্ষণ চুপচাপ শুনছিলো। এবার সে ধমক দিয়ে বলে, ” ঐ মিয়ারা কি শুরু করলা এ্যাঁ? কি শুরু করলা। এক কাম করো আশপাশ যতো গাও আছে সবহানে খবর বিলাও বেবাক আইসা দেইহা যাক। তারা চিনবার পারে কিনা তুমরা হুদাই কাউলা কাউলি কইরো না তো। এমনিতেই একখান চিন্তার মধ্যি আছি।যাও যাও পারলি যেরাম কইলাম সেরাম খবর বিলাও।”

ইতিমধ্যে ইউনিয়নের ছামেদ আলী চেয়ারম্যান এসে হাজির। সবাই একসাথে সালাম-

-“আসসালেমালাই কুম চেয়ারম্যান সাব।”

চেয়ারম্যান মুখে কোন উত্তর না দিয়ে শুধু সালাম নেওয়ার ভঙ্গিতে মাথাটা একটু নাড়লো।তারপর লাশের কাছে এগিয়ে গিয়ে লাশটা ভালোভাবে দেখে নিলো।তারপর মাজু মেম্বার চেয়ারম্যান কে ডেকে নিয়ে পাকুড় গাছতলায় যেখানে আমরুল বসার জন্য ব্রেঞ্চ পেড়েছে সেখানে বসালো।সাথে সাথে লাশের কাছে মানুষের সব জটলা পাকুড় গাছের নিচে চলে গেলো।লাশ পাহাড়ায় তখন শুধু পরিষদের চৌকিদার দুজন। মানুষের জটলার ঠিক মাঝখানে বেঞ্চের উপর চেয়ারম্যান,মাজু মেম্বার,গনি মোল্লা,আসগর আর করিম উল্লাহ বসা।

মাজু মেম্বার সবাই কে থামিয়ে দিয়ে বলে, ঐ মিয়ারা তোমগো মুকখান কি বন্ধ থাহে না,হারাদিন প্যাচ প্যাচ করা লাগে কে? দেখতাছো না চেয়ারম্যান সাব আইছে হেই ঠিক করবো কি করন লাগবো।চুপ করো তো মিয়ারা।

সবাই মাজু মেম্বারের ধমকে চুপ হয়ে গেলো।

এবার ছামেদ আলী চেয়ারম্যান জেরা শুর করলো ঘটনার আদ্যো পান্ত জানতে।

-তা এই লাশখান প্রথম দেখলো কেডা?
-যে চেয়ারম্যান সাব গনি নাকি দেখছে।
-তুমি থামো তো মেম্বার বেশি কতা কও ক্যা।যে দেখছে আমি তারে জিগাইছি তারেই কইতে দেও। তা গনি তুমি কি দেখিছো কও তো একটু শুনি, আর এই সকাল সকাল তুমি এইহানে কেন আইছিলা, এদিকে তো ভয়ে কেউ আহে না বাবা।

-না চেয়ারম্যান সাব তা না। ঘটনা হইলো ঐ যে জমিডা দেখতাছেন না ঐডাতে পানি দেওন লাগবো কিনা হেইডা দেখতে আইছিলাম।তয় একা একা আমার ঐ সব ভুতে একটু ভয় ডর কম, তাছাড়া সকাল সকাল ভুত পেত আইবো কোত্থেইকা।তো আইসা দেহি ভেট গাছের চিপা দিয়া একখান ছিট কাপড়ের লাহান দেহা যায়। মনে মনে ভাবলেম এইহানে কাপড় কিসের।এই দিহে তো কেউ তেমন আহে না।যেই ভেট গাছের মিধ্যি গেছি চেয়ারম্যান সাব দেহি এই লাশখান উপুড় হয়া পইড়া আছে।হারা গায়ে কুনো কাপড় নাই।প্ররথমে ভয় পাইছিলাম, মনে করছিলাম ভূত পেত কিছু।তয় পরে সাহস কইরা কাছে যাইতেই দেহি না এইডা তো একখান মাইয়া মানুষের লাশ।মনে হয় কুন বজ্জাত আকাম কুকাম কইরা লাশহান এই হানে ফালাই গেছে। উদোম শরির দেইখা আমার গায়ের চাদরখান লাশের গায়ে ঢাইকা দিয়া একনাগারে দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে বাড়িত যাইয়া খবর দেই। মেম্বার সাবরেও আমিই খবর খান পৌছাইছি।তাই না মেম্বার চাচা?

–হুম , বলে মাজু মেম্বার একটু মাথা নাড়লো।

-ও বুঝছি।তা মিয়ারা তোমরা লাশের গায়ে হাত দিছো কে।এহন পুলিশ আইসা তো ভেজাল করবো।


পাশ থেকে আমরুল-

-মেম্বার চাচাই তো উল্টাইতে কইছে।
-ঐ আমরুইল্লা কি কইতাছোস, চাপা সামাল দে।তোর থেইকা বুদ্ধি নিমু নাকি?

ধমক দেয় মাজু মেম্বার।

-থামো তো মেম্বার। যা হবার হইছে। এখন কি করা যায় সেইডা চিন্তা করো।এই মাইয়ারে তো দেহি কেউ চেনে না এহন থানা পুলিশে খবর দেওয়া ছাড়া তো কুনো উপায় দেখি না।

-চেয়ারম্যান সাব আশপাশ দুই চার গাঁয়ে খবর দিয়া দেহি। কোন গাঁয়ের মেয়েছেলে? তারপর না হয় থানা পুলিশ করা যাবো।
মাজু মেম্বার কে উদ্দেশ্য করে- তা দাও মেম্বার কিন্তু এই লাশ তো ভালো মরা না থানা পুলিশে খবর না দিলি শেষমেশ আমরা বিপদে পড়মু।
তুমি এক কাজ করো মেম্বার চৌকিদারে দিয়া থানায় একখান খবর দেও।দেশে আইন বলে তো একখান কতা আছে নাকি?

-আচ্ছা চেয়ারম্যান সাব খবর দিতাছি বলে একজন চৌকিদার কে ডেকে থানাতে খবর পাঠালো মাজু মেম্বার।

এবার গনি মোল্লা চেয়ারম্যান ছামেদ আলীকে উদ্দেশ্য করে –

চেয়ারম্যান সাব একখান কতা।এই মাইয়া হিন্দু না মুসলমান হেইডা কিন্তু কওন যাইতাছে না যদি মাইয়াডা হিন্দু হয় তাইলে কি হইবো চেয়ারম্যান সাব।

মাজু মেম্বার ও গনির কথার সাথে সায় দেয়।এতোক্ষণ এই ব্যাপারে চিন্তা কারো মাথায় আসে নি।সবাই লাশের বিকৃত বিষয় আর লাশের পরিচয় নিয়েই আলোচনা করছিলো।কিন্তু গনি মোল্লার কথায় এবার তাদের নতুন ভাবনা যুক্ত করে।তাদের মধ্যে এখন মেয়েটার পরিচয়ের চাইতে লাশটি হিন্দুর নাকি মুসলমানের সেই চিন্তার ঢেউ খেলে যাচ্ছে।

জটলাতে তখন একটাই আলোচনা –

হায় হায় এইডা কি কতা।তাই তো লাশ ডা যদি হিন্দু কারো হয় তাইলে কি হবো।জমিতনের মাও এই কথায় একটু নড়েচড়ে বসে। কারন হিন্দু না মুসলমান সেটা না জেনে সেই তো মাজু মেম্বারের কথায় লাশটা নিজের হাতে উল্টিয়েছিলো।

আ্যা কতা তো ঠিকই কইছে গনি।তাইতো মাইয়া ডা হিন্দু না মুসলমান না জাইনা আমরা কেন এতো কাউলাইতাছি?- প্রশ্ন করে জমিতনের মা।

আরে থামো তো মিয়ারা থামো আগে কথা কইবার দেও ধমক দিয়ে সবাইকে এবার থামিয়ে দেয় ছামেদ আলী চেয়ারম্যান।
বিষয়খান আগে আমারে বুঝতে দেও দেখি।কি কইলা গনি মিয়া আবার কও তো?

-না মানে মাইয়াডা যদি হিন্দু হয়?
-তাও তো ঠিক মিয়া। তয় আশপাশ গাঁয়ের মানুষ আসুক দেকুক। দেখি কেউ চিনবার পারে কিনা। তারপর দেখা যাইবো।যদি কেউ চিনবার পারে তাইলে তো মিটাই গেলো।মাইয়া ডা হিন্দু না মুসলমান তখন জানাই যাবো। আর এক কাম কর তো আমরুল যা ঈমাম সাহেব মোসলেম উদ্দিন রে একটু খবর দে, যা কবি আমি সালাম দিছি জলদি যেন এইখানে আসে।

পাকুড় গাছের নিচে হিন্দু না মুসলমান এই প্রশ্নের আলোচনা চলতেই থাকে।একেক জনের অভিমত একেক রকম।এরি মধ্যে আমরুল ঈমাম সাহেবের সাথে দেখা করে ফিরতি খবর নিয়ে এসেছে।

-ঈমাম সাহেব কি কইলো রে আমরুল?
-ঈমাম সাহেব কইলো আর একটু পরে জোহরের আযান হবে। তিনি যোহরের নামাজ পইড়া আসবেন কইছে।

দেখতে দেখতে সকাল থেকে বেলা যে কখন যোহরের ওয়াক্তে পৌছাইছে সে দিকে কারোই কোন খেয়াল ছিলো না।আমরুলের ফিরতি খবরে সবার হুস ফিরে আসে।

জমিতনের মা তো বলেই বসে –

হায় হায় কি কস আমরুল্লা।যোহরের ওয়াক্ত হয়া গেছে?হিন্দু না মুসলমান তার কোন খবর নাই নামাজ কালাম বাদ দিয়া হুদাই বইসা আছি, যাই গাও গোছল কইরা আবার নামায পড়তে হবো।তার মধ্যি আবার মরা খান ধরছি।বলে সে বাড়ির পথে পা বাড়ালো।

নামাযের ওয়াক্তের কথা শুনে এবার একে একে ছামেদ আলী চেয়ারম্যান,মাজু মেম্বার,গনি মোল্লা, সহ মুরুব্বিরা সবাই নিজ নিজ বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছে।

বাড়ি যাওয়ার পথে মাজু মেম্বার চৌকিদার কে কড়া নির্দেশ দিয়ে গেলো কোন মতেই যেন কেউ লাশের কাছে ঘেঁষতে না পারে।সে যেন চেয়ারম্যান ফিরে না আসা পর্যন্ত কড়াভাবে লাশ পাহাড়া দেয়।

(চলবে)

কমেন্ট করুন

What's Your Reaction?

hate hate
0
hate
confused confused
0
confused
fail fail
1
fail
fun fun
0
fun
geeky geeky
0
geeky
love love
0
love
lol lol
0
lol
omg omg
0
omg
win win
0
win

লগইন করুন

আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন।

পাসওয়ার্ড রিসেট করুন!

পাসওয়ার্ড রিসেট করুন!

সাইন আপ করুন

আমাদের পরিবারের সদস্য হোন।

Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles
Meme
Upload your own images to make custom memes
Video
Youtube, Vimeo or Vine Embeds
Audio
Soundcloud or Mixcloud Embeds
Image
Photo or GIF
Gif
GIF format