ভূত ভয়ঙ্করঃ কাছে ডাকে, করে টেলিফোন (শেষ পর্ব)


পর্ব-১  এখানে  পর্ব-২ এখানে

আমি ভয়ে বুদ্ধের সামনে হাঁটু গেঁড়ে প্রার্থনা করতে বসলাম আর বলতে লাগলাম,বুদ্ধ আমাকে হাচিশহাকুশামা এর হাত থেকে বাঁচাও, আমাকে রক্ষা কর এই বিপদ থেকে”। বলেই কাঁদতে লাগলাম।

এর পর পরই আমি শুনতে পেলাম বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কণ্ঠটা বলছে, পো,পো, পো, পো, পো, পো, পো………”।

এর সাথে সাথে জানালায় আবার ট্যাপ ট্যাপ ট্যাপ ট্যাপ শব্দ শুরু হল। এবার আমি ভয়ে পুরোপুরি জমে গেলাম এবং বুদ্ধ মূর্তির সামনে নত হয়ে অর্ধ ক্রন্দনরত আর অর্ধ প্রার্থনারত অবস্থায় সকাল হবার অপেক্ষা করতে লাগলাম ।

বাইরে পো, পো, পো, পো, পো, পো শব্দ আর জানালায় ক্রমাগত ট্যাপ ট্যাপ ট্যাপ ট্যাপ শব্দ হতেই লাগল। আমি একমনে প্রার্থনা করে যেতে থাকলাম। আমার মনে হচ্ছিল এই রাত বোধহয় আর কখনও শেষ হবে না। আমি আর কখনও সকাল দেখতে পাব না। দেখতে পেলাম ধীরে ধীরে সবগুলো গামলার লবণ কালো থেকে কুচকুচে কালো রঙ ধারণ করছে। আমার কাছে সবকিছু একটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মত মনে হতে লাগল।

আমি প্রার্থনা করতেই থাকলাম যতক্ষন সকাল না হয়। একসময় জানালায় ট্যাপ ট্যাপ শব্দ আর বাইরে পো পো শব্দ বন্ধ হল। আমি তখন ঘড়ি দেখলাম এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম যে অবশেষে সকাল হল। সকাল ৭.৩০ মিনিট। অবশেষে সেই দুঃস্বপ্নের মত ভয়ংকর রাতের অবসান হল।

আমি সতর্কতার সাথে দরজা খুললাম। বাইরে দেখতে পেলাম দাদি আর কে সান দাঁড়িয়ে আছে আমার অপেক্ষায়। আমাকে দেখে আমার দাদিমা চিৎকার করে কেঁদে উঠল।

দাদিমা বলল, “আমি তোমাকে জীবিত দেখতে পেয়ে কি যে আনন্দিত হয়েছি তা বলার নয়”।

আমরা নিচে নেমে এলাম এবং সেখানে আমার জন্য যে বিস্ময় অপেক্ষা করছিল তা দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। দেখলাম নিচে আমার বাবা মা বসে আছে। কিন্তু তাদের মুখেও ভয়ের ছায়া স্পষ্ট। দাদা বলল, তাড়াতাড়ি কর। আমাদের যেতে হবে”।

আমরা সবাই সামনের দরজার দিকে গেলাম। বাইরে দেখলাম একটা বিশাল কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির চারপাশে গ্রামের অনেক লোক জড়ো হয়েছে এবং যখন আমি গাড়ির সামনে গেলাম তারা একে অপরের সাথে কানাকানি করতে লাগল এবং আমার দিকে নির্দেশ করে বলল, এটাই সেই ছেলে।

গাড়িটা ছিল ৯ আসনের। আমাকে তারা মাঝের আসনে বসিয়ে দিল এবং আমাকে ঘিরে রইল ৮জন। কে সান গাড়িচালকের আসনে বসল। সেই গাড়ি চালাবে।

আমার বাম পাশে বসা লোকটি আমাকে বলল, তুমি একটা খুব বড় ধরণের বিপদের মাঝে পরে গেছ, কিন্তু তুমি চিন্তা কর না। তুমি শুধু তোমার মাথা নিচের দিকে করে রাখবে এবং তোমার দু চোখ বন্ধ করে রাখবে। আমরা হাচিশহাকুশামাকে দেখতে পারব না কিন্তু তুমি পারবে। আমরা তোমাকে যতক্ষন পর্যন্ত না নিরাপদে এই জায়গা থেকে বের করে দিতে পারছি ততক্ষন চোখ খুলবে না একদম।

আমার দাদা সামনে একটা গাড়ি আর পেছনে আমার বাবা একটা গাড়ি নিয়ে আমাদের সাথে আসবে। যখন সবাই যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল তখন আমাদের গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। খুবই ধীরে। কিছুক্ষন চলার পরেই কে সান বলল, এটাই সেই জায়গা যেখানে হাচিশহাকুশামাকে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল এবং তারপরেই সে মন্ত্র পড়তে শুরু করল।

ঠিক তখনই আমি শুনতে পেলাম সেই শব্দ, “ পো, পো, পো, পো ,পো, পো…………”

আমাকে কে সান যেই চামড়ার কাগজ ধরতে বলেছিল আমি সেটা শক্ত করে ধরে রাখলাম হাতে। আমি আমার মাথা নিচু করে রাখলাম ঠিকই কিন্তু তারপরেও বাইরে একটু উঁকি দিলাম দেখলাম একটা সাদা জামা বাতাসে ভাসছে। দেখলাম সেই সাদা জামা আমাদের গাড়ির সাথে সাথে ভেসে চলেছে। আমি বুঝতে পারলাম সেটা হাচিশহাকুশামা। সে জানালার বাইরে ছিল কিন্তু সে আমাদের সাথে গতি ঠিক রেখে ভেসে চলেছিল আমাদের সাথেই।

তারপর হঠাৎ করেই সে নিচু হল এবং জানালা দিয়ে উঁকি দিল।

আমি আঁতকে উঠে বললাম, “না”!

আমার পাশের লোকটি বলল, “দ্রুত তোমার চোখ বন্ধ কর”।

আমি সাথে সাথেই আমার চোখ বন্ধ করে ফেললাম শক্ত করে যতটা শক্ত করে বন্ধ করে রাখা যায় আর আমার হাতের চামড়ার কাগজটাকে আরও শক্ত করে মুঠো করে রাখলাম।

তারপরেই জানালায় সেই মৃদু আঘাত শুরু হল, “ ট্যাপ, ট্যাপ, ট্যাপ, ট্যাপ,ট্যাপ………” কণ্ঠস্বর আরও উচ্চ এবং জোরে হতে থাকল, “ পো, পো, পো, পো, পো, পো,পো, পো” ……ক্রমাগত এই ট্যাপ ট্যাপ আর পো পো আওয়াজ হতে থাকল।

গাড়ির সবগুলো জানালায় সেই মৃদু আঘাত হচ্ছিল এবং ট্যাপ ট্যাপ শব্দ হতে থাকল। গাড়ির সব লোক চমকে উঠল এবং আতংকিত হয়ে একে অপরের সাথে কানাকানি করতে লাগল। যদিও গাড়ির অন্য সবাই হাচিশহাকুশামাকে দেখতে পাচ্ছিল না এবং তার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল না কিন্তু জানালায় আঘাতের শব্দ এবং ট্যাপ ট্যাপ শব্দ সবাই শুনতে পাচ্ছিল। তখন কে সান জোরে জোরে প্রার্থনা করতে লাগল ততক্ষন পর্যন্ত যতক্ষন পর্যন্ত না হাচিশহাকুশামা চিৎকার করে ওঠে। গাড়ির ভেতরে সবার মধ্যে চাপা আতংক ছড়িয়ে পড়ল এবং ভেতরের সবার অস্থিরতা ক্রমশই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল।

এর কিছুক্ষন পর ট্যাপ ট্যাপ শব্দটি বন্ধ হয়ে গেল এবং পো পো পো আওয়াজও হাওয়া হয়ে গেল।

তখন কে সান পেছনে তাকিয়ে সবাইকে আশ্বস্ত করে বলল, “আমার মনে হয় আমরা এখন নিরাপদ”।

আমার চারপাশের লোকগুলো কে সানের কথা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এরপর আমাদের গাড়িটি রাস্তার একপাশে থামান হল এবং সব লোক বের হয়ে আসল। আমাকে আমার বাবার গাড়িতে তুলে দেয়া হল। আমার মা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল এবং কাঁদতে লাগল।

গাড়ির লোকগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়ে তদের চলে যেতে বলল কে সান। তারা চলে গেল। এরপর কে সান বাবার গাড়ির সামনে এসে আমাকে বলল তোমার হাতের চামড়ার কাগজটা আমাকে দেখাও। আমি তাকে তা দেখালাম সেটা একদম কালো কুচকুচে রঙ ধারণ করেছে। কে সান বলল এখন আর ভয় নেই। তারপরেও আরও কিছুক্ষনের জন্য এটা ধরে রাখ। সে আরেকটি নতুন চামড়ার কাগজ আমার হাতে ধরিয়ে দিল। এরপর আমরা সোজা বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম এবং যখন জাপান ছেড়ে আসলাম আমার বাবা মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আমার বাবা বলল সে আগেও এই হাচিশাহাকুশামার কথা শুনেছে। তার এক বন্ধুকে হাচিশহাকুশামা পছন্দ করেছল এবং এরপর তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি।

বাবা বললেন এরপরেও অনেককেই হাচিশহাকুশামা পছন্দ করেছে এবং তারা তার হাত থেকে বাঁচার জন্য জাপান ছেড়েছে। তারা আর কখনই তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে সক্ষম হয়নি।

হাচিশহাকুশামা তার শিকার হিসেবে শিশুদের বেছে নেয় কারণ শিশুদের সহজেই ধোঁকা দেয়া যায় এবং আত্মীয়স্বজন সেজে বশ করতে পারা যায়। এজন্যই আমাদের গাড়িতে আমাদের রক্তের সম্পর্কের সবাইকে রাখা হয়েছিল এবং আমার বাবা এবং দাদারা আমাদের গাড়িকে ঘিরে রেখেছিল যেন হাচিশহাকুশামা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে এবং কোনপ্রকার ধোঁকা দিতে না পারে। ঐদিন রাতে সবাইকে একসাথে করার জন্যই আমাকে একা ঘরে রাখা হয়েছিল। সবাইকে খবর পৌঁছে নিয়ে আসার জন্য সময় প্রয়োজন ছিল।

বাবা বলল যেই ভাঙা বিল্ডিং এর মধ্যে ৪টা বুদ্ধ মূর্তি দিয়ে হাচিশহাকুশামাকে আটকে রাখা হয়েছিল সেখানের একটা বুদ্ধ মূর্তি ভেঙ্গে যাওয়ার ফলে সে সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হয়।

এরপর ১০ বছর কেটে গেছে আমি আমার দাদা দাদিকে আর দেখতে যাইনি। তাদের সাথে ফোনে কথা হত প্রায় প্রায়। ২বছর হল আমার দাদা মারা গেছে। এবং সে যখন অসুস্থ ছিল তখন আমি তাকে দেখতে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু সে খুব জোরালোভাবে আমাকে সেখানে যেতে মানা করে দেয় এবং এটাও বলে যে আমি যেন তার শেষ কৃত্যানুষ্ঠানেও না যাই। আমি খুব কষ্ট অনুভব করতে লাগলাম এই ঘটনায়।

এই শোক কাটতে না কাটতেই কিছুদিন পর আমার দাদিমা আমাকে ফোন করল এবং বলল তার ক্যান্সার ধরা পড়েছে। সে তার শেষ সময়ে তার মৃত্যুর আগে আমাকে একবার দেখতে চায়।

আমি অবাক হয়ে বললাম, “ তুমি নিশ্চিত দাদিমা, তুমি আমাকে দেখতে চাও এবং তোমার কাছে আমাকে তুমি যেতে বলছ? এটা কি নিরাপদ”?

দাদিমা বলল, “১০ বছর হয়ে গেছে সেই ঘটনার। এর মধ্যে হাচিশহাকুশামা তোমাকে ভুলে গেছে। তুমি এখন অনেক বড় হয়েছ। নিজের খেয়াল রাখতে পার। আমার মনে হয় আর কোন সমস্যা হবে না। তুমি নিশ্চিন্তে এখানে আমার কাছে আসতে পার”।

আমি একটু ইতস্তত বোধ করতে লাগলাম আর বললাম, “কিন্তু, কিন্তু হাচিশহাকুশামার বিষয়ে কি হবে? আমার যাওয়াটা কি নিরাপদ”?

আমার কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য ফোনের ওপারে নিরব হয়ে গেল। কোন কথা আসল না কিছুক্ষণ।

এরপরেই আমি খুব মোটা এবং গভীর পুরুষ কণ্ঠের আওয়াজ শুনতে পেলাম, “পো, পো, পো, পো, পো, পো……” ।

ভয়ের একটা শীতল স্রোত পুনরায় আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নিচে নেমে গেল। আমার হাত থেকে টেলিফোনটি আমার অজান্তেই পড়ে গেল……চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই ৮ ফুট লম্বা নারী মূর্তি……।

কমেন্ট করুন

What's Your Reaction?

hate hate
0
hate
confused confused
0
confused
fail fail
0
fail
fun fun
0
fun
geeky geeky
0
geeky
love love
0
love
lol lol
0
lol
omg omg
0
omg
win win
0
win
Sharmin Akter Shetu

শারমীন আক্তার সেতু। আমি পেশায় একজন মনোবিজ্ঞানী । কবিতা লিখতে এবং পড়তে পছন্দ করি । মনোবৈজ্ঞানিক ফিচার লেখার সাথে যুক্ত আছি। তাছাড়াও অন্যান্য বিষয়েও লিখতে এবং জানতে পছন্দ করি । আমি এর আগে পরামর্শ .কম এ লেখার সাথে যুক্ত ছিলাম । এখন কিছু ইংরেজি সাইটে অনুবাদের কাজ করছি । আমার শখ ভ্রমণ এবং গান গাওয়া । বাগান করতে পছন্দ করি এবং বিভিন্ন গাছ,ফুল্‌,ফল এবং নতুন নতুন জায়গার সাথে পরিচিত হতে ভাল লাগে।

লগইন করুন

আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন।

পাসওয়ার্ড রিসেট করুন!

পাসওয়ার্ড রিসেট করুন!

সাইন আপ করুন

আমাদের পরিবারের সদস্য হোন।

Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles
Meme
Upload your own images to make custom memes
Video
Youtube, Vimeo or Vine Embeds
Audio
Soundcloud or Mixcloud Embeds
Image
Photo or GIF
Gif
GIF format