এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

ক্লিওপেট্রা সম্পর্কে অজানা দশটি তথ্য

229

মিশর এবং এর অদ্ভুত ও আধ্যাত্মিক ইতিহাস যেমন আমাদের সবাইকে উত্তেজিত করে তেমনি মনে ভাবনারও সৃষ্টি করে। অনেক অদ্ভুত ও রহস্যময় চরিত্রের মধ্যে মিশরের রানী ক্লিওপেট্রা অন্যতম। শেষ ফারাও ও সন্দেহাতীতভাবে প্রভাবশালী এই মহিলাকে নিয়ে আমাদের মনে রয়েছে নানান ধরনের জল্পনা-কল্পনা । যার বেশিরভাগই এসেছে লোককথা বা সিনেমা থেকে। আজ বলব ক্লিওপেট্রা সম্পর্কে দশটি অজানা তথ্য যা তার সম্পর্কে আপনার ধারণা বদলে দেবে।

বলে রাখা ভালো ক্লিওপেট্রার আসল নাম সপ্তম ক্লিওপেট্রা ফিলোপ্যাটোর। তবে আমরা তাকে এই নিবন্ধে ক্লিওপেট্রা নামেই ডাকবো। তিনি খৃষ্টপূর্ব ৬৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন ও ১০ মতান্তরে ১২ই আগস্ট, খৃষ্টপূর্ব ৩০ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়েসে মারা যান।

১. ছোট ভাইয়ের সাথে বিয়ে

নিজ ভাইবোনের সাথে বিয়ের প্রচলন রাজপরিবারে অনেক আগে থেকেই ছিল। এর কারন হিসেবে তারা মনে করত এতে বংশের রক্ত শুদ্ধ থাকে। ক্লিওপেট্রা ছিলেন রাজা দ্বাদশ টলেমীর ৪ সন্তানের একজন। রাজা দ্বাদশ টলেমীর স্ত্রীর নাম ছিল ষষ্ঠ  ক্লিওপেট্রা ট্রিফিনা। সম্পর্কে তিনি ছিলেন রাজার চাচাতো বোন মতান্তরে নিজের বোন। তবে এ নিয়ে মতভেদ আছে। যখন ক্লিওপেট্রার বয়স চৌদ্দ বছর, তখন তার মা, ষষ্ঠ ক্লিওপেট্রা ট্রিফিনা, অজানা কারনে মারা যান। এসময় তার বাবা তাকে সহকারী শাসকের পদে তার পাশে নিয়োগ দেন। পরবর্তি চার বছরে তিনি রাজার সহকারী হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন ও বিচক্ষণতার জন্য প্রচুর সুনাম অর্জন করেন। যখন তার বয়স আঠারো বছর হয় তখন তার বাবা মারা যায়। এতে করে তিনি নিজেই মুকুটের তথা সম্পূর্ণ শাসনকার্যের অধিকারী হন। কিন্তু তখনকার নিয়মানুযায়ী শাসনকর্তার সাথে অবশ্যই একজন সহকারী থাকতে হবে। ফলে তিনি তার ছোট ভাই ত্রৈয়দশ টলেমীকে বিয়ে করেন, যখন তার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। কয়েক বছর পরে তার এই ভাই মারা গেলে তিনি আবারও তার আরেক ছোট ভাই চতুর্দশ টলেমীকে বিয়ে করেন।

আইসিস রুপে ক্লিওপেট্রার মুর্তি (বামে) ও টেম্পল অফ ভেনাস-জেনেট্রিক্স (ডানে)। সোর্স: cleopatradebatediplomacy.weebly.com
২. জুলিয়াস সিজার ক্লিওপেট্রার মুর্তি তৈরি করেছিলেন

যখন ক্লিওপেট্রা সিরিয়ান রাজ্যের সাথে কূটনৈতিক বন্ধুত্বস্থাপন করেন, রোমানরা তার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। এবং ক্লিওপেট্রার প্রথম স্বামী ও ছোট ভাই ত্রৈয়দশ টলেমীকে মুকুট ছিনিয়ে নেবার জন্য ভিতরে ভিতরে সাহায্য করতে শুরু করে। এটা অবশ্য তার মৃত্যুর অনেক আগের ঘটনা। তবে, তার মিত্রপক্ষের মধ্যে একজন ছিলেন জুলিয়াস সিজার একজন। সিজার একা হাতে এই কূটনৈতিক চাল রুখে দেন ও মুকুট নিজের হস্তগতই করে নেন। এতে খুশী হয়ে ক্লিওপেট্রা নিজেই তার সাথে দেখা করতে যান। প্রচলিত আছে যে ক্লিওপেট্রা নিজেকে কার্পেটে মুড়ে সকলের চোখ ফাকি দিয়ে সিজারের অন্দরমহলে প্রবেশ করেন ও তার সাথে দেখা করেন। এরপরে তিনি সিজারকে এমনভাবে খুশী করে দেন, যে ৫২ বছর বয়সী জেনারেল ২১ বছরের রানীকে তার মুকুট ফিরিয়ে দেন। ক্লিওপেট্রা ফিরে গেলে তিনি ক্লিওপেট্রার প্রেমে পড়ে তার টেম্পল অফ ভেনাস জেনেট্রিক্সে একটি মুর্তি তৈরি করেছিলেন। তবে বিভিন্ন সাহিত্য ও সিনেমায় সিজার ও ক্লিওপেট্রার মধ্যে বেশ রোমান্টিক সম্পর্ক দেখালেও গবেষকেরা প্রমান করেছেন এটা অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মিত্রাবস্থার বেশি কিছু ছিল না। কিন্তু তৎকালীন মিশরের অধিবাসীরা তাদের শাসকদের ইশ্বর হিসেবে মনে করত। আর এই মুর্তি ছিল তাদের ধর্মীয় আচার ব্যবহারের সাথে সাংঘর্ষিক। যাই হোক, মুর্তিটি সিজার মারা যাওয়ার পরও প্রায় ২০০ বছর ধরেই বহাল তবিয়তে ছিল।

সোর্স: historyplex.com
৩. মার্ক অ্যান্টনি ও ক্লিওপেট্রার অবৈধ প্রেম

মার্ক অ্যান্টনি ও ক্লিওপেট্রার প্রথম দেখা হয় টারসাস নগরীতে, যেটি বর্তমানে তুরস্ক নামে পরিচিত। ক্লিওপেট্রা জানতেন যে এই রোমান অফিসার নিজেকে গ্রীক গড ডিওনিসাস মনে করতেন ও অন্যান্যদের তাকে পূজা করতে বলতেন। তবে ক্লিওপেট্রাও কম খেলোয়াড় ছিলেন না। তিনি একদিন শহরের গেটে গ্রীক দেবী আফ্রোদিতি সেজে তার সাথে দেখা করেন। এসময়ে তার চারপাশে ছিল একদল বামন যারা কিউপিডের ন্যায় সেজে ছিল ও ছোট্ট ছোট্ট তীরের সাহায্যে ক্লিওপেট্রার চারপাশে সুগন্ধ ছড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। বলাই বাহুল্য যে মার্ক অ্যান্টনি ক্লিওপেট্রায় মজে গিয়েছিলেন, এবং এভাবেই তাদের পার্টনারশিপ শুরু হয়। এতটাই মজে গিয়েছিলেন যে একবার তিনি ক্লিওপেট্রার সাথে সময় কাটানোর জন্য একটি গুরুত্বপুর্ণ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি।

২০০৭ সালে প্রাপ্ত ক্লিওপেট্রার সময়ের কয়েন। সোর্স: fleur-de-coin.com
৪. ক্লিওপেট্রা আসলে খুব রূপসী ছিলেন না

সিনেমাতে যেমনটি সবসময় দেখায়, বাস্তব জীবনে ক্লিওপেট্রা অতোটা সুন্দরী ছিলেন না। ২০০৭ সালে আর্কিওলজিস্টরা ক্লিওপেট্রার সময়কার একটি মুদ্রার খোজ পায়, যেখানে ক্লিওপেট্রার মুখয়ব খচিত ছিল। যেটি দেখে গবেষকেরা সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ক্লিওপেট্রা আসলে খুব বেশি সুন্দরী ছিলেন না, আবার খুব কদাকারও ছিলেন না। আর দশজন রাজ পরিবারের সদস্যের মতোই তিনি ছিলেন সাধারণ চেহারার অধিকারিণী। তবে বাহ্যিক সৌন্দর্যের দিক থেকে তার বিচক্ষণতা ও মনের সৌন্দর্য ছিল অনন্যমাত্রার।

আলেকজানডার হেলিওস ও ক্লিওপেট্রা সেলেনির মুর্তি। সোর্স: Pillole di Storia
৫. ক্লিওপেট্রা ছিলেন একজন মা

ক্লিওপেট্রা শুধু একজন শাসকই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন মা, যিনি তার সন্তানদের ভালবাসতেন। যদিও ক্লিওপেট্রার ভাইদের সাথে তার কোন সন্তান ছিল না, তবে জুলিয়াস সিজার ও মার্ক অ্যান্টনি উভয়ের সাথেই তার সন্তান ছিল। সিজারের ঔরষে তার সন্তানের নাম ছিল সিজারিয়ান। আর অ্যান্টনির ঔরসে তার ছিল তিন সন্তান। প্রথম দুজনের নাম আলেকজানডার হেলিওস ও ক্লিওপেট্রা সেলেনি। হ্যালিওস ও সেলেনি মানে যথাক্রমে সুর্য ও চাঁদ। আরো একজন সন্তান ছিল, যাকে ক্লিওপেট্রা ডাকতেন টলেমী ফিলাডেলফাস। ফিলাডেলফাস মানে ভাইপ্রেমী।

৬. ক্লিওপেট্রার খরচ করতে ভালবাসতেন

ক্লিওপেট্রার খরচের হাত ছিল বিশাল লম্বা। তবে তা যে শুধু নিজের সৌন্দর্যের জন্য তা নয়। ক্লিওপেট্রার সময়ে মিশরের রুপ ছিল জমকালো ও সে সময়ের মিশর ছিল দুনিয়ার বুকে উন্নতির শিখরে। তখনকার জনগনও ছিল ক্লিওপেট্রার শাসনকার্যে বেশ সন্তুষ্ট। তবে ক্লিওপেট্রা সে সময়ে যে পানীয় (ককটেল) পান করতেন বর্তমান সময়ে তার মুল্য প্রায় ১৬ মিলিয়ন ডলারের মতো।

৭. সাপের কামড়ে তিনি মারা যাননি

ক্লিওপেট্রার মৃত্যু নিয়ে প্রচুর মতভেদ আছে। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারণা হচ্ছে ক্লিওপেট্রার স্তনে একটি বিষাক্ত সাপের কামড়ে তার মৃত্যু হয়। তবে ক্লিওপেট্রার মৃত্য বেশ দ্রুততার সাথে ঘটেছিল। কিন্তু সাপের কামড়ে মৃত্যুতে অনেক সময় লাগবে। প্রাচীন ইতিহাসবিদ স্ট্র্যাবো লিখেছিলেন, ক্লিওপেট্রা সর্বদা মারাত্মক বিষে ভেজানো একটি চিরুনি সাথে রাখতেন। যেটি ব্যবহার করে তিনি দ্রুত আত্মহত্যা করতে পারেন। অন্যান্য ইতিহাসবিদেরা বিশ্বাস করেন ক্লিওপেট্রা সম্ভবত কয়েকটি সাপের বিষের একটি মিক্সচার খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন।

৮. তিনি বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারতেন

ক্লিওপেট্রার টলেমী রাজপরিবারের বংশধর যারা প্রায় তিনশত বছর ধরে মিশর শাসন করেছে। এই পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ১ম টলেমী আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটের কাছে থেকে এই দায়িত্ব পায়। তিনি ছিলেন একজন গ্রীক, ফলে তার পরীবার সর্বদা গ্রীক আচার ব্যবহারে অভ্যস্ত। তবে ক্লিওপেট্রাই প্রথম যিনি মিশরের নিজস্ব সংস্কৃতিকে নিজের করে নেন। তিনি সে সময়ে গ্রীক ভাষা ছাড়াও আরবী ও মিশরীয় আরবীতে কথা বলতে পারতেন যা ছিল তখনকার সময়ে একজন নারীর জন্য বিশাল ব্যাপার। সে সময় তিনি নিজেকে মিশরীয় দেবতা আইসিসের নবজন্ম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

সোর্স: Bright side
৯. ক্লিওপেট্রার মেক-আপ

ক্লিওপেট্রার চোখ আকানোর ভঙ্গিমা (Eye of Ra) ছিল ক্লিওপেট্রার নিজস্বতা। তিনি সাজগোজের ব্যাপারে ছিলেন যথেষ্ট সৌখিন। তবে তার এই স্পেশাল চোখ আকানোর স্টাইলের পেছনে রয়েছে এক নিগুড় রহস্য। ক্লিওপেট্রা যে ধরনের কয়লা রঙ দিয়ে তার চোখ আকাতেন তা ছিল চার ধরনের সীসার ক্যামিকেল যা ছিল চোখের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার ওষুধ। দ্যা বিউটি উইথ ব্রেইন!

আইন গেডি, ইজরায়েল এ প্রাপ্ত ক্লিওপেট্রার পারফিউম কারখানা। সোর্স: see.news
১০. ক্লিওপেট্রার একটি পারফিউম ফ্যাক্টরী ছিল

ক্লিওপেট্রা ছিলেন একজন কেমিস্ট। তিনি সুগন্ধ খুবই পছন্দ করতেন। তাই তিনি নিজের জন্য একটি পারফিউম ফ্যাক্টরী দিয়েছিলেন, যেটা শুধু তিনি নিজের জন্য ও তার রাজ দরবারে ব্যবহার করেন। ক্লিওপেট্রার পারফিউম ফ্যাক্টরীটি আইন গেডির খুব কাছেই পাওয়া যায়, যেটি মৃত সাগরের পাশেই অবস্থিত। এখানে পারফিউমের পাশাপাশি ছিল একটি বিউটি সেলুন ও স্পা’র ব্যাবস্থা। অদ্ভুত না?

feature image source: https://www.factinate.com/people/46-seductive-facts-cleopatra-queen-nile/

এরকম আরো দারুণ দারুণ আর্টিকেল পড়তে আজই ফেইসবুকে বাংলাহাব পেইজে লাইক দিয়ে রাখুন ও ভিজিট করুন 
বাংলাহাব ওয়েবসাইট। মনোযোগ দিয়ে আর্টিকেলটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। কমেন্টে আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না।
মন্তব্য
লোডিং...