এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

ইদুরের দেহের ৪ রোগ যার জন্য মানুষ দায়ী

0 41

- Advertisement -

image source: thetartan.org
image source: thetartan.org

সবচেয়ে বেশি গবেষণা কাজ মনে হয় পরিচালিত হয় ইঁদুরের উপর। বিজ্ঞানীরা এদের দেহে জীবাণু প্রবেশ করান, সংক্রমিত করান, দেহের ব্যবচ্ছেদ করেন ও এর থেকে প্রাপ্ত তথ্য মানুষের কাজে লাগান। আর এভাবেই রোগগুলো মানুষ থেকে ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করেছে।

গনোরিয়া

গনোরিয়া একটি যৌনবাহিত রোগ, নেসেরিয়া গনোরিয়া নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে রোগটি হয়ে থাকে। সাধারণত এই রোগ শুধু মানুষের হয় । ল্যাবে বিজ্ঞানীরা সিরিঞ্জের মাধ্যমে নেসেরিয়া গনোরিয়া জীবাণুকে ইঁদুরের যোনিতে স্থাপন করেন। কিন্তু  নেসেরিয়া গনোরিয়া ইঁদুরের যোনিতে বাস করতে পছন্দ করে না তাই কোন রোগের সংক্রামণ হয় না। সমস্যা সমাধানের পরে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে ইঁদুরের ঋতু চক্রের সংক্ষিপ্ত বিরতির সময় ইঁদুরের যোনির  অবস্থা উত্তম থাকে । এই বিরতির  সময় নেসেরিয়া গনোরিয়া জীবাণু  বিস্তার লাভ করতে পারে ।  সাধারণত এই বিরতি অল্প সময় ধরে থাকে । বিরতির সময় প্রসারিত করার জন্য বিজ্ঞানীরা ১৭ বিটা- ইস্ট্রাডিওল নামক একটি মেয়েলি সেক্স হরমোন ইঁদুরের শরীরে ব্যবহার করে । এই ইস্ট্রজেন বুস্ট ব্যবহারের পরে নেসেরিয়া গনোরিয়ার জীবাণু অনেক দিন পর্যন্ত ইঁদুরের যোনিতে বসবাস করতে পারে। এই সকল ইঁদুর দিয়ে  বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন ওষুধ পরীক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে । তারা আরও অদ্ভুত তথ্য জানতে সক্ষম হয়েছে যে এক সংক্রমণ প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদী সংক্রমণ-মুক্ততা দান করে না  , মানুষের মত ইঁদুরেরাও প্রথম পর্যায়ের রোগ মুক্তির পরে আবার আক্রান্ত হতে পারে। বাস্তব জগতে খুব কম মানুষের শুধু গনোরিয়া আছে । ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, গনোরিয়া সংক্রমণ ক্লামাইডিয়া সংক্রমণ দ্বারা হয়ে থাকে । এই পরীক্ষার জন্য, বিজ্ঞানীরা  দুইটি যৌনবাহিত রোগে  আক্রান্ত ইদুরের মডেল তৈরি করে । এই মডেল তৈরির জন্য , তারা ইঁদুরের যোনিতে  সি muridarum  এবং  নেসেরিয়া গনোরিয়া  দুই ধরণের ব্যাকটেরিয়া স্থাপন করেন ।

হাম

- Advertisement -

হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ। প্যারামাইক্সি ভাইরাসের কারনে এই রোগ হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে , হাম হলে জ্বর হয় ও শরীরে ছোট ছোট লালচে গুটি/ দাগ  দেখা দেয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হামের কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতি বা মৃত্যু ও হতে পারে । প্রাকৃতিক জগতে , শুধু মাত্র মানুষই হামে সংক্রেমিত হয় । এই ভাইরাস CD46 বা CD150  দুই রিসেপ্টরের  মধ্যমে মানব কোষে প্রবেশ করে । ইঁদুরগুলিকে হামের পরীক্ষার জন্য উপযোগী করতে, বিজ্ঞানীরা  ইঁদুরের মধ্যে এই রিসেপ্টরের জিন স্থাপন করেন। সংক্রামনের পরে এই হামে আক্রান্ত ইঁদুরের কিছু তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় । উদাহরণস্বরূপ ২০০৬ সালে বিজ্ঞানীরা মানুষের CD150 রিসেপ্টর ইদুরে স্থাপন করেন । তারপর তারা দুটি ভিন্ন ভাবে নাসারন্ধ্র দিয়ে বা সরাসরি মস্তিষ্কে হামের ভাইরাস দ্বারা ইঁদুর গুলোকে সংক্রামিত করে। সংক্রামনের পরে ইঁদুর গুলো অনেক দ্রুত নিস্তেজ হয়ে পরে,  ইঁদুরগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, খিচুনী আরম্ভ হয় এবং মারা যায় ।এর  তীব্রতা নির্ভর করে ইঁদুরের  বয়সের উপর, নবজাত ইঁদুরগুলো সবসময় মারা যায় কিন্তু চার বয়সী ইঁদুরগুলো বেঁচে থাকে, দুই সপ্তাহ বয়সী এবং তিন সপ্তাহ বয়সী ইঁদুরের মৃত্যুর হার মাঝামাঝি ।

এইচআইভি

এইচ.আই.ভি. এর সম্পূর্ন রূপ হল হিউম্যান ইমিউনো ডেফিশিয়েন্সি ভাইরাস।  এখন পর্যন্ত এইচআইভিতে ৩৯ মিলিয়ন মানুষ মারা গেছে। প্রতি বছর আরও মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এইচআইভি কোষ উপরের  পৃষ্ঠের রিসেপ্টরের সাথে আবদ্ধ হয় এবং মানব কোষে সংক্রামিত হয় । শিম্পাঞ্জি মানুষের খুব কাছের প্রজাতি, এদের সাথে মানুষের অনেক মিল আছে, এদের কোষ উপরের  পৃষ্ঠের রিসেপ্টরগুলো মানব কোষের  রিসেপ্টরের মত । তাই  শিম্পাঞ্জিরাও  এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়। যদিও ইঁদুর আলাদা প্রজাতির , তারপরেও কিছু মিল আছে। ৯০ মিলিয়ন বছর ধরে ইঁদুর এবং স্তন্যপায়ী দুইটি আলাদা প্রজাতির প্রানী, এছাড়াও এদের প্রোটিন ও আলাদা। এইজন্য এইচআইভি ভাইরাস ইদুরে সংক্রামিত হয় না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিজ্ঞানীরা  মানুষের জিনে ইঁদুরের শরীরে স্থাপন করে। দেখা যায়, ইঁদুরের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস বিস্তার লাভের জন্য অন্তুত মানুষের তিনটি জিন প্রয়োজন । মানুষের ইমিউন সিস্টেমের সাথে এই ইঁদুর তৈরির একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি আছে। এই পদ্ধতিতে মানুষের কিছু কোষ ইনজেকশন মধ্যমে এবং কিছু অপরেশনের মধ্যমে ইঁদুরে শরীরে স্থাপন করা হয়। এই ইঁদুর গুলোকে হিউম্যানাইজড (Humanized)  ইঁদুর বলা হয়। আরেক ধরণের  হিউম্যানাইজড (Humanized)  ইঁদুর যাদেরকে বেকন-লেটুস-টমেটো স্যান্ডউইচ বা BLT ইঁদুর বলা হয়। BLT ইঁদুরের শরীরে থাকে অস্থিমজ্জা, যকৃত, এবং থাইমাস এই তিনটি মানব কোষের একটি মিশ্রণ যদিও এই মিশ্রণটি স্যান্ডউইচ মত না । BLT ইঁদুর তৈরির পরে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে এদের ইমিউন সিস্টেমে কিছু সমস্যা আছে। তারপর তারা মানব ভ্রূণের লিভার ও থাইমাসের কিছু অংশ ইঁদুরে কিডনির অধীনে স্থাপন করেন । এছাড়াও তারা ইঁদুরের শরীরে কিছু ষ্টীম সেল প্রবেশ করান যা মানুষের অস্থিমজ্জা থেকে সংগ্রহ করা হয়। তারপর এই রুপান্তরিত ইঁদুরগুলো, মানুষের ইমিউন কোষে পরিপূর্ণ থাকে এবং ১০০ ভাগ এইচআইভি ভাইরাস সংক্রামনে সমর্থ থাকে। Humanized ইঁদুর যোনি  বা মলদ্বার অথবা সরাসরি তাদের শিরায় একটি সুচ মধ্যমে  এইচআইভি আক্রান্ত হতে পারে।

সিজোফ্রেনিয়া

সিজোফ্রেনিয়া একটি মানসিক রোগ। দৃষ্টি বিভ্রম এবং হ্যালুসিনেশন হল  সিজোফ্রেনিয়ার  সাধারণ এবং সর্বজনীন লক্ষণ। এছাড়াও অনাগ্রাহ এবং শেখার সমস্যা এই রোগের লক্ষণ যদিও এটা খুব কম সময় দেখা যায়। সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত মানুষের, MD (mediodorsal nucleus of the thalamus) নিউরন কম সক্রিয় থাকে  , MD নিউরন এক ধরনের মস্তিষ্কের কোষ। ইঁদুরের মস্তিষ্কে এই পার্থক্য তৈরি করার জন্য , বিজ্ঞানীরা  রাসিয়নিক ভাবে ইঁদুরের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোকে ব্লক করে দেয়।  এই ব্লকের পরে, দেখা যায় ইঁদুরগুলো  পক্ষে পরিবেশের সাথে এবং খাবার সংগ্রহ করা কস্ত কর হয়ে যায়। যেটা  সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত মানুষের শেখার সমস্যা মত। এছাড়াও  সিজোফ্রেনিয়া বংশগত কারণেও হতে পারে ,বিভিন্ন জিন এক্ষত্রে মুখ্য ভুমিকা পালন করে। একটি স্কটিশ পরিবারে DISC1 নামক একটি পরিবর্তিত জিন সিজোফ্রেনিয়া ঝুকি বৃদ্ধি করেছে বলে মনে করা হয়। পরীক্ষার জন্য, বিজ্ঞানীরা DISC1 নামক পরিবর্তিত  জিনটিকে ইঁদুরের শরীরে স্থাপন করে। মিউট্যান্ট DISC1 জিন ইঁদুরের মস্তিষ্কে একটু ভিন্ন ভাবে বিকশিত হয়, যার ফলে ইঁদুরের মস্তিষ্কে  বাম পাশের লেটারাল ভেন্ট্রিকল স্বাভাবিকের চেয়ে বড় , যেটা  সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত মানুষের মস্তিষ্কে ও দেখা যায়। মিউট্যান্ট ইঁদুরগুলো মধ্য অন্যান্য লক্ষণ গুলোও প্রকাশ পায় , কখনও কখনও তাদের মধ্য অস্বাভাবিকও দেখা যায় । যদি তাদেরকে  খলা জায়গায় ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে তারা স্বাভাবিক ইঁদুরের চেয়ে দ্রুতবেগে ছুটতে থাকে, কিন্তু অন্য সময় তারা  অনাগ্রহী থাকে। যদি এই ইঁদুরগুলোকে কোন পানি ভর্তি কনটেনারে মধ্য ছেড়ে দেয়া হয় , দেখা যায় এরা স্বাভাবিক ইঁদুরের চেয়ে কম চেষ্টা করে তার ভিতর থেকে বেরিয়ে  আসার জন্য। এই আচরণগত পার্থক্য কিছু সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত মানুষের মধ্য দেখা যায় কিন্তু বিজ্ঞানীরা এ বিষয় নিশ্চিত নয়।  এই ইঁদুরগুলোর মধ্য সিজোফ্রেনিয়া রোগের খুব সর্বজনীন ও সাধারণ লক্ষণ গুলো দেখ যায় যেমন- কোন শব্দ শোনা এবং বিশ্বাস করা, এছাড়া অনেক অজানা তথ্যই অস্পষ্ট। এর জন্য দরকার মানব মস্তিষ্ক । কিন্তু যদিও সিজোফ্রেনিক ইঁদুর বিশ্বাস করে যে এটা Elvis ছিল , তারপরেও বিজ্ঞানীদের পক্ষে সিজোফ্রেনিয়া রোগের সব কিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব না।

লেখিকা সম্পর্কেঃ মাহাবুবা শিরিন সুইটি । ভাল লাগে বই পড়তে, সিনামা দেখতে, নতুন নতুন খাবার খেতে, ঘুরে বেড়াতে এবং বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে। আমি তেমন লিখতে পারি না ।

মন্তব্য
লোডিং...