এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

হারিয়ে যাওয়া মেয়েটির যুদ্ধদিনের ডায়েরি

421

২য় বিশ্বযুদ্ধের আগের জার্মানি। যেখানে ধর্মের জন্য মেরে ফেলা হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। উচ্ছেদ করে দেওয়া হচ্ছে পুরো সম্প্রদায়কে। তাদের একটাই অপরাধ ছিল। তারা ইহুদি।

এমনই এক ভয়াবহ পরিবেশে বেড়ে উঠছিল এক তরুণী। যার নাম আনা ফ্রাঙ্ক। ওই সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। জীবনের যে সময় টাতে মানুষ হেসে, খেলে, আনন্দ করে পা্র করে সেই সময়টাতে তাকে ছুটতে হয়েছে পরিবারের সাথে নিজের জীবন বাচানোর তাগিদে। শুধু তাকেই নয়, তার মতো এমন অনেককেই পালিয়ে বেরাতে হয়েছে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য। কেউ পেরেছে কেউ পারেনি।
কোথায় যাবে পালিয়ে? যেখানে সারা বিশ্ব দখলের চেষ্টা করছে জার্মান এর হিটলার ও তার বাহিনী।

আনার জন্ম ১৯২৯ সালের ১২ই জুন। তখনই মাথা তুলতে শুরু করে হিটলার এবং তার বাহিনী। তার অত্যাচার এর হাত থেকে রক্ষা পেতে ইহুদি সম্প্রদায় দেশ ত্যাগ করতে শুরু করে।

আনা ফ্রাঙ্ক হলো অটো ফ্রাঙ্ক এবং এডিথ দম্পতির ২য় সন্তান। তাদের প্রথম সন্তান মারগট বয়সে আনা ফ্রাঙ্ক থেকে ৩ বছরের বড়। নিরাপত্তার স্বার্থে ১৯৩৩ সালে অটো ফ্রাঙ্ক পরিবার দেশ ত্যাগ করে হল্যান্ডে চলে যায়। তখন আনার বয়স মাত্র ৪ বছর। কিন্তু তাতেও নিরাপত্তা জোরদার হয়নি। এর ৬ বছর পর অর্থ্যৎ ১৯৩৯ সালেই শুরু হয় ২য় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা।

কিশোরী আনা ফ্রাঙ্ক

জার্মান থেকে পালিয়ে গিয়েও নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি তার পরিবার। ১৯৪১ সালে হিটলার হল্যান্ড দখল করার পর থেকে শুরু হয় সেখানকার ইহুদিদের উপর অত্যাচার।

বাবা মায়ের কোলে আনা

১৯৪২ সালের জুন মাসে শমন জারি করে অটো ফ্রাঙ্ক এর নামে। অর্থ্যাৎ তাদেরকে চলে যেতে হবে বন্দী শিবিরে। যেখানে তাদের নেই স্বাধীন ভাবে বাঁচার অধিকার। বন্দীশিবিরের লোকদের ওপর     প্রতিদিন বর্বরতা চালানো হতো । এই বর্বরতা থেকে রক্ষা পেতে ফ্রাঙ্ক পরিবার আত্তগোপন করে অটো ফ্রাঙ্ক এর অফিস বাড়ির একটি গোপন আস্তানায়।

আনা তার ১৩ বছর বয়সের জন্মদিনে উপহার পাওয়া একটি ডায়েরিতে তার জীবনের অবশিষ্ট সময়ের ভয়াবহতা লিখে গেছে। সারাদিন তার নিজের অনুভূতিকে প্রকাশ করার জন্য এই ডায়েরিকেই নিজের আপন করে নিয়েছিল। তার ডায়েরিকে খুব কাছের একটি বন্ধু হিসেবে নিয়েছিল এবং একে একটি অদৃশ্য চরিত্র হিসেবে তার নিজের কথা গুলো লিখে যেত চিঠির মতো। ডায়েরিটিকে সে কিটি নাম দিয়েছিল। এই কিটিকে সে তার হতাশা ও একাকীত্বের কথা গুলো লিখে গেছে। আনা ফ্রাঙ্ক তার ডায়েরিতে যুদ্ধ ও সমসাময়িক বিষয় গুলো বেশ পরিপক্ব ভাবে তোলে ধরেছে।

আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি

কিছু দিন পর তাদের সাথে যুক্ত হয় আর একটি পরিবার। এটি হল ৩ সদস্যের ফান ডান পরিবার।
প্রথম কিছু দিন এই সাত জন এবং পরে তাদের সাথে যুক্ত হয় একজন ডাক্তার। তার নাম ড. ডোসেল।

গোপন আস্তানায় সেই আট সদস্য

গোপন আস্তানায় নিজেদের আত্মগোপনের জীবন যাপন সম্পর্কে আনা তার ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করে গেছে। সেখানে দীর্ঘ ২৫ মাস তারা আত্মগোপন করেছিল। সেখানে তাদের সাহায্য করেছিল তাদের দুই বন্ধু এলি এবং মিপ। আট জনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সদস্য হিসেবে আনার সেখানে মনমানসিকতা কেমন ছিল, তার সাথে পরিবার এবং অন্যান্যদের ব্যবহার কেমন ছিল, কেমন ছিল তাদের সেখানকার দিন গুলি এর সবই এনা তার ডায়েরিতে লিখে গেছে। সদ্য বেড়ে ওঠা একটি কিশোরী যখন তার বন্ধু বান্ধব নিয়ে আনন্দ করার কথা, স্কুলে যাওয়ার কথা তখন সে পার করছে এমন একটি জীবন যেখানে নেই তার স্বাধীনতা, নেই জীবনের নিশ্চয়তা কেমন হতে পারে এমন একটা জীবন? এই ২৫ মাসে তার সব রকম শারীরিক মানসিক পরিবর্তন এর সব কিছুই উল্লেখ করেছে সে তার ডায়েরিতে। এমনকি সেখানে তাদের আত্মগোপন করার জন্য কি পরিমাণ খাবার মজুদ আছে তাও লিপিবদ্ধ করেছে সে। সেখানে তাদের একসাথে থাকতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে কখনো কখনো দেখা দিয়েছে নানা রকম সমস্যা। কখনোবা হয়েছে মনোমালিন্যতা। তবুও সব কিছু উপেক্ষা করে তারা একসাথে পার করেছে এতগুলো দিন। সবকিছুর মধ্যে তার মায়ের সাথে মতবিরোধিতা, বোনের সাথে ছোট ছোট ঝগড়া গুলোও বাদ যায়নি তার লিখায়। তার বাবা তাকে কতটা বুঝতেন এবং তার শান্ত এবং বিচক্ষণ স্বভাবের বর্ণনা সে দিয়েছে। এমনকি তার বয়সে একটি মেয়ের অন্য ছেলের প্রতি যে ভাললাগা কাজ করে তাও সে অনায়েসে লিখে গেছে তার ডায়েরিতে। সেখানে রয়েছে  ফান ডান দম্পতির একমাত্র ছেলে পিটারের  প্রতি তার ভাললাগার কথা।

বুক সেলফ এর পিছনে সেই গোপন আস্তানা

বুক সেলফ সরালেই গোপন আস্তানার দরজা।

তাদের প্রতিদিনের কাজকর্মের সাথে আনা তখনকার উত্তপ্ত পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেছে আনা। হিটলার কিভাবে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল ইহুদিদের। একে একে বোমা হামলায় প্রাণ যাচ্ছিল কত সাধারণ মানুষের। মানুষদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বন্দী শিবিরে। সেখানের অবস্থা ছিল খুবই ভয়ানক। আনা তার ডায়েরিতে বন্দী শিবিরে পুরুষ ও  নারীদের ভয়াবহ জীবন সম্পর্কে লিখেছে। যেমন: ” আমাদের ইহুদি বন্ধুদের ডজনে ডজনে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এদের সঙ্গে ব্যাবহারে গেস্টাপো কোনোরকম ভদ্রতার বালাই রাখছে না,  গরু- ভেড়ার ট্রাকে বস্তাবন্দি করে তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছে ভেস্টারব্রুকের ডেণ্টির বিশাল ইহুদি বন্দী শিবিরে। সেখানে একশো লোকের জন্য একটি ছোট কলঘর এবং পায়খানাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। মেয়ে, পুরুষ, বাচ্চা সবাই একসঙ্গে   গাদা হয়ে শোয়। এর ফলে নৈতিক অধঃপতন ঘটছে।  সেখানে স্ত্রী লোক এবং অল্প বয়সী মেয়েদের পেটে বাচ্চা  এসেছে।” ( আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি)

এমন অনেক ভয়াবহ অবস্থার কথা বলা আছে তার ডায়েরিতে।

তখন হিটলারের পৃথিবীতে ইহুদিরা ছিল অসহায়। ফলে আত্মগোপন করেও হিটলারের গোপন বাহিনীর হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারেনি তারা। ১৯৪৪ সালে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তারা ধরা পড়ে যায়। গ্রেফতারের পর তাঁদেরকে প্রথমে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে আনা ও মার্গটকে বার্গেন-বেলজান কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তাদের জীবন ছিল অত্যাধিক করুণ। তখন যদি আনার কাছে তার ডায়েরিটি থাকত হয়ত তখনকার সুস্পষ্ট বর্ণনাও আনা দিয়ে যেত। ১৯৪৫ সালে সেখানেই টাইফাসে আক্রান্ত হয়ে এই দুই বোন মৃত্যুবরণ করেন। অমানুষিক নির্যাতনের মারা যায় সেই আট সদস্যের মধ্যে সাত জন।শুধু বেঁচে ফিরেছেন আনা ফ্রাঙ্কের বাবা অটো ফ্রাঙ্ক। পরবর্তীতে তিনিই আনার ডায়েরিটি উদ্ধার করে এবং ১৯৪৭ সালে এটি প্রকাশ করেন। ১৯৫২ সালে এটি প্রথম বারের মতো ইংরেজিতে অনূদিত হয়। এর ইংরেজি নাম হয় দ্য ডায়েরি অফ আ ইয়াং গার্ল। এটি বিশ্বের ৭০ টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

মন্তব্য
লোডিং...