এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

বাংলাহাব হরর গল্প- রহস্যময় আয়না

483

বেশ কিছু দিন ধরে সায়নের মনে হচ্ছে বাসাটা এবার পরিবর্তন করা দরকার। ঢাকা শহরে মুটামুটি একটা বাসা নিয়ে একা থাকার মতো অবস্থা এখনো তার হয়ে ওঠেনি। তাই একটা পরিবারের সাথে সাব লেট নিয়েই থাকে সে। শুরুর দিকে বেশ ভালোই চলছিল সব। কিন্তু দিন দিন মনে হচ্ছে সমস্যা বেড়েই যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে সায়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্র সে, পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশন আর টুকটাক লিখালিখিতেই সময় কাটে তার। ইদানিং সে লিখালিখির চিন্তায় এতটাই ডুবে যাচ্ছে যে আশেপাশের সব কিছু থেকেই নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছে। কেমন যেন একটু এলো মেলো হয়ে গেছে সে। আজকাল সে কাদা মাখা জুতা নিয়েই বাসায় ঢোকে পড়ছে, নিজের রুমে না গিয়ে হুটহাট অন্য রুমে ঢুকে পরছে, এ.এম/পি.এম খেয়াল না করেই রাত দুপুরে ক্লাসের জন্য বেড়িয়ে পড়ছে ইত্যাদি। এসব কিন্তু সে ইচ্ছাকৃত করছে তা না। এসব কিছুর জন্যই এবার বাড়িওয়ালা তার ওপর মহা বিরক্ত। তাকে একরকম সরাসরি বলেই দেওয়া হয়েছে বাসা খুঁজে নেওয়ার জন্য। 

মুটামুটি চেষ্টা চালিয়ে তার সুবিধা মতো একটা বাসা পেয়ে গেল। আনিস নামের ছেলেটাও ২ রুমের ফ্ল্যাটটি একা নিতে হিমসিম খাচ্ছে। এদিকে সায়ন এলে ২ জন মিলে মুটামুটি সুন্দর ভাবেই তাদের চলে যাবে।

অতঃপর সব ঝামেলা শেষ করে সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ নতুন বাসায় উঠে গেল সায়ন। কিছু দিন পর সায়নের মনে হলো বাসায় একটা আয়না দরকার। পুরো বাসা জুড়ে কোনো আয়না নেই। বেসিনের আয়নাটারও এমন নাজেহাল দশা যে এটাতে চেহারা দেখলে নিজেকে নিজেই চিনা যায় না। আর সাত পাঁচ না ভেবে সায়ন চলে গেল একটা পুরাতন জিনিসপত্রের দোকানে। কখনো কখনো এসব দোকানে সস্তায় বেশ ভালো জিনিস পাওয়া যায়। অনেক দেখে হঠাৎ একটা আয়নায় চোখ আটকায় তার। আয়নাটি দেখা এতটুকু নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি নিশ্চয়ই কোনো মেয়ের ব্যবহৃত আয়না। আয়নাটি দেখে আরো একটা ব্যপার বুঝা যায় মেয়েটি বেশ সৌখিন, হয়তোবা আয়নাটিও সে নিজের মতো করে সাজিয়ে ছিল। এই আয়নাটির দিকে তাকালে অনেক কিছু তার মাথায় ঘুরপাক খায়। আয়নাটি সে নিয়েই নিল এই ভেবে যে এটি লিখালিখি ও নতুন নতুন চিন্তার যোগান দিতে পারে।

আসলেই তাই, আয়নাটির দিকে তাকালেই তার মনে নানান প্রশ্ন আসে। ভাবে নতুন কিছু লিখবে। আয়নাটির ইতিহাস ও সেই মেয়েটিকে নিয়ে। যদিও আনিস তার আয়নার প্রতি এই আগ্রহ দেখে প্রতিনিয়ত ঠাট্টা করেই যাচ্ছে। কিন্তু এতে সায়নের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

আনিস: বন্ধু, মনে হচ্ছে আজকাল বাংলা সাহিত্য ছেড়ে আয়না সাহিত্যে বেশি আগ্রহ?
সায়ন: হুম…
আনিস: আগে জানতাম মেয়েরা আয়না দেখতে ভালবাসে। কিন্তু তুই সারাদিন আয়নার দিকে তাকিয়ে কি এতো ভাবিস?
সায়ন: আচ্ছা তোর কি আয়নাটার দিকে তাকিয়ে একবারের জন্য মনে হয়নি এটা কারো শখের বস্তু। কেউ কারো শখের বস্তু কেনইবা বিক্রি করে দিবে?
আনিস: পুরোনো হয়ে গেছে বিক্রি করে দিয়েছে, আবার নুতন একটা কিনেছে। সহজ হিসাব।

প্রথম ২ দিন ১ রাত চলে গেল। ৩য় দিন আনিস জরুরি কিছু কাজে গ্রামের বাড়িতে চলে গেল। ওই দিন রাতে সায়ন একা বাসায়। হটাৎ ঘুম ভেঙে যায় মনে হচ্ছে পুরো বাসা আলোতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। সাথে সাথেই উঠে বসে সায়ন। আশে পাশে তাকিয়ে তেমন কিছুই দেখতে পায়না সে। হয়তো স্বপ্ন দেখছিল এই ভেবে আবার শুয়ে পড়ে সে। সকালে ঘুম ভাঙার পর সে নিজেকে আবিষ্কার করে মেঝেতে আয়নাটার সামনে। তার পা দুটো ঠিক আয়নাটার সাথে লাগানো যেন কেউ আয়নার ভিতর থেকে তার পা ধরে টেনে ভিতরে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সায়নের স্পষ্ট মনে আছে সে রাতে তার বেডে শুয়ে আয়নাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। ঘুমের মধ্যে হাটা চলা বা কোনো কাজ করার অভ্যাসও তার নেই। উঠতে গিয়ে খেয়াল করলো ঘাড়ের বাম পাশটাতে বেশ ব্যথা লাগছে। কোনো রকম ঘাড় নাড়াতে পারছে না। রাতে ঘুমের পর আর কি হয়েছিল তার কিছুই আর মনে পড়ছে না। কোনো রকম ওঠে সে ফ্রেশ হয়ে নিল। হটাৎ করেই তার চোখ আটকায় বেসিনের আয়নাটার দিকে। এটাও বেশ পরিষ্কার মনে হচ্ছে। এর আগে বহু বার চেষ্টা করেও সে এতটা পরিষ্কার করতে পারে নি। বেপার টাকে বেশ স্বাভাবিক নিয়েই সে সারাদিন বাইরে নিজের কাজে ব্যস্ত ছিল। সন্ধ্যায় বাসায় এসে নিজের রুমে ঢুকতেই তার মনে হলো কেউ একজন তার আয়নাটার সামনে দাড়িয়ে আছে আর গুনগুন করে গান গাইছে, মেয়ে গলা, গানের সুর ভালো। কেমন যেন ব্যাপারটা স্বাভাবিক মনে হলো তার কাছে, যেন এমনটা রোজ হয়ে থাকে। এখন তার কি করণীয় সেটাও যেন তার মাথায় আছে। সে স্বাভাবিক ভাবেই এগিয়ে গেল। বাইরের লেম্প পোস্টের আলোতে অন্ধকার রুমে সে স্পষ্ট দেখতে পেল মেয়েটিকে। এইতো সেই মেয়েটি যার গানের গলায় মুগ্ধ হয়ে শুরু করেছিল লিখা লিখি। তার সব গল্পের নায়িকা ছিল একটি মেয়ে। ইউনিভার্সিটি লাইফে তার প্রথম কাউকে এত ভাল লাগা। দূর থেকেই তাকে দেখতে ভাল লাগতো তার। কতদিন ভেবেছে সামনে গিয়ে কথা বলবে। কিন্তু বলা হয়ে ওঠে নি। তিন থেকে সাড়ে তিন মাসের মাথায় মেয়েটিকে আর দেখতে পায়নি সে। লোক মুখে শুনেছে মেয়েটি মারা গেছে। কিন্তু কখন, কেন, কিভাবে মারা গেল তার কিছুই সে জানতে পারেনি।

হটাৎ করেই কলিং বেল বেজে উঠল। চার পাশে তাকিয়ে দেখলো সব কিছুই স্বাভাবিক। কোথায় গেল মেয়েটি? ঠিক তখনই আবার কলিং বেল এর শব্দ। দরজা খুলে দেখে আনিস। কিন্তু আনিসেরতো আরও দুদিন পর আসার কথা। সায়ন হটাৎ করে বাস্তবে ফিরে এল। কিছুক্ষণ আগের ঘটে যাওয়া ঘটনা ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাথায়। আনিসকে কি এখনই সব কিছু বলবে সে? ঠিক করতে পারছে না।

সায়ন: আ…আনিস… তোর না আরও দুদিন পর আসার কথা?

আনিস কিছুই না বলে বাসায় ঢুকে পড়ে। আনিসতো এতো চুপ থাকার ছেলে না। ওর কি কোনো কারণে মন খারাপ? ভাবতে থাকে সায়ন। সাথে সাথে ২ দিন যাবৎ ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা বলতে থাকে। আনিস কোনো রকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে আপন মনে সায়নের রুমের আয়নাটার দিকে এগিয়ে যায়। সায়ন আনিসের কাঁধে হাত রাখতেই আনিস দাঁড়িয়ে পড়ে এবং পেছনে ফিরে সায়নের দিকে তাকিয়ে কেমন একটা বাঁকা হাসি দেয়, সেই সাথে তার চোখ গুলোও জ্বলজ্বল করতে থাকে আর মেয়ে কন্ঠে বলতে থাকে, “এত কৌতূহল ভালো না।”

সায়ন পরিষ্কার শুনতে পায় এত সেই মেয়েটির কন্ঠ! মেয়েটির নাম মনে পড়ছে তার, হ্যাঁ মেয়েটির নাম নিশাত। আনিস নিশাতের কন্ঠে আরো কি সব বলে যাচ্ছে। তার কিছুই বুঝতে পারছে না সায়ন। তার চোখের সামনে সব কিছুই ঘোলাটে হয়ে আসছে, পৃথিবীটা কেমন ঘুরছে। আর কিছুই মনে পড়ছে না সায়নের। জ্ঞান ফিরার পর সে নিজেকে হাসপাতালের বেডে দেখতে পায়। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কেটে গেছে। পরে জানতে পারে পাশের ফ্ল্যাটের শফিক ভাই এত রাতে তার ফ্ল্যাটের দরজা খোলা দেখে দারোয়ানকে সাথে নিয়ে তার বাসায় ঢোকে তাকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। আর তার রুমের আয়নাটা খুব বাজে ভাবে ভাঙা ছিল। ভাঙা আয়নার কাচে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কেটে গেছে।

সে আনিস কে ফোন করে জানতে পারে আনিস এখনো তার গ্রামের বাড়ি থেকে আসতে পারে নি।

মন্তব্য
লোডিং...