এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

একুশে ফেব্রুয়ারির গল্প- ভাষা আন্দোলন থেকে Cool Dude আর looking Hot প্রজন্ম

0 53

- Advertisement -

ছবি ডিজাইন- তৌফিক মিথুন

রফিক সাহেবের শহরে তার প্রচুর নামডাক আছে। তিনি তার শহরের একজন বড় ব্যবসায়ী এবং নেতা। প্রায় অনেক সভাই বিশেষ অতিথি হিসেবে দেখা যায় তাকে।তিনি সবার সামনে নিজেকে “দেশপ্রেমিক” বলে উপস্থাপন করেন। তার একমাত্র মূলমন্ত্র দেশের সেবা করা, দেশের ইতিহাস সবার কাছে তুলে ধরা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া। তাই তিনি দেশের প্রত্যেকটি দিবসে সভার আয়োজন করেন এবং সবাইকে উৎসাহিত করেন।

 রফিক সাহেবের সব ধ্যান ধারনা একমাত্র ছেলে রবিনকে নিয়ে। রবিন একমাত্র ছেলে রফিক সাহেবের কিন্তু একমাত্র সন্তান নয়, রফিক সাহেব আরও দুইটি কন্যার জনক। কিন্তু মেয়েদের নিয়ে তার চিন্তা ভাবনা সেকেলের। তার ধারনা মেয়েরা এত পড়াশুনা করে লাভ কি? ঠিক ই তো পরের ঘরেই যাবে। তাই রফিক সাহেব মেয়েদের বাংলা মিডিয়াম এবং ছেলেকে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়িয়ে হয়ত পার্থক্যটা বুঝাতে চেষ্টা করেছেন। সে যাই হউক তিনি নিজেকে একজন সফল বাবা মনে করেন। তার কাছে তার ছেলেই তার গৌরব, তার অহংকার, তার বংশের প্রদীপ। এক কথায় ছেলে ছাড়া রফিক সাহেবের জীবন অপূর্ণ বলে মনে করেন রফিক সাহেব।

ছেলেকে ছোটকাল থেকে খুব যত্নে লালন পালন করেছেন তিনি। কোন কমতি রাখেননি ছেলের দিক দিয়ে। ছেলেকে সব ধরনের স্বাধীনতা দিয়েছেন তিনি।কোন কাজেই বাধা ছিলনা রবিনের।কারন, রফিক সাহেব প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছেন একমাত্র ছেলে রবিনের প্রতি, যার একভাগ ও তিনি তার মেয়েদের প্রতি রাখেন না। রফিক সাহেব তার ছেলের সব চাহিদা পূরণ করেন। চাহিদা বললে ভুল হবে, ছেলে চাহিদার লিস্ট দেওয়ার আগেই বাবা তা পূরণ করেছে। চাহিদা কি তা হয়ত রবিন জানেইনা। এইত সেদিনকার কথা ছেলের পনেরো বছর পূর্তিতে তাকে “Lamborghini” গিফট করেছেন তিনি। এরপরেই ছেলেকে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন মালয়েশিয়া, লন্ডন, কানাডায়। দীর্ঘ ৮ বছর ছেলেকে নিজ থেকে দূরে রেখেছেন, ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য।

রফিক সাহেব খুব খুশি আজ। তার এতদিনের সাধনা সাফল্যের ছোঁয়া পেতে যাচ্ছে। তার একমাত্র ছেলে রবিন বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় হতে ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরেছে। রফিক সাহেব এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছেন। প্রতিটা মুহূর্ত যেনো ঘণ্টার মত কাটছে। দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন অপলক দৃষ্টিতে।

অবশেষে রফিক সাহেবের অপেক্ষার শেষ হল। ছেলেকে দেখতেই রফিক সাহেব জড়িয়ে ধরলেন। ছেলে আজ তার সব স্বপ্ন পূরণ করে তার সামনে দারিয়ে। সত্যি তার গর্ব তার ছেলে।

কাল ২১শে ফেব্রুয়ারী, বাঙালী জাতির জন্য গৌরবময় দিন। বাঙালী জাতি নিজের ভাষার জন্য রক্ত ঢেলে দিয়েছে ১৯৫২ সালের এই দিনে। রাফিক সাহেব প্রতিবারের মত এইবার ও সভার আয়োজন করেছেন। নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানতে হবে।তবে এইবার অতিথি রফিক সাহেব নয়, তার একমাত্র ছেলে রবিন হবে। ভাবতেই খুশিতে মন ভরে উঠছে রাফিক সাহেবের। কাল শুধু ভোরের আলোর অপেক্ষা।

ভোরে ছেলের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে কড়া নাড়তেই, ছেলে বের হয়ে বাবাকে আশ্বাস দেয় সব সামলে নেবার। রফিক সাহেবের বুক গর্বে ফুলে উঠে। সত্যি মানুষ করতে পেরেছে ছেলেকে, মনে মনে ভাবতে লাগলেন তিনি।  

ছেলেকে নিয়ে সভায় হাজির রফিক সাহেব। সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিলেন ছেলের সাথে।সভা শুরু হল, যথাক্রমে অথিতির পালা আসলো। রবিন উঠে দাঁড়াল, শুরু করল বক্তব্যঃ

- Advertisement -

  • আসসালামু আলাইকুম, আশা করি সবাই ভাল আছেন। সবাইকে আজকের এই সভায় উপস্থিত থাকার জন্য “thank you”.

রফিক সাহেব ছেলেকে বারবার সাবধান করেছেন ইংরেজি না বলতে, কি করছে রবিন? চুপ করে ভাবতে লাগলেন, শুধু “thank you”  ই তো বলেছে, টেনশন নেওয়ার কিছুই নেই। চুপ করে ছেলের বক্তব্য শুনতে লাগলেন।

  • আমি নিজেকে অনেক “Fortunate” মনে করি বাংলাদেশের একজন হতে পেরে। আজকের এইদিনে শেখ মুজিবুরের ডাকে লাখো মানুষ সাড়া দিয়েছে। আমরা ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে বাংলা ভাষা পেয়েছি।

রফিক সাহেব আর এক মুহূর্ত ও দেরি না করে ছেলেকে মাইকের সামনে থেকে টেনে নিয়ে আসলেন।

  • রবিন, কি বলছিস এসব?? ভাষার জন্য ৩০ লাখ শহীদ?
  • পাপা প্লিস, কি হবে এতকিছু জেনে?আর এসব বোরিং বক্তৃতা আমার দিয়ে হবেনা। কি দিয়েছে এই দেশ আমকে? কিছুই তো না।সব পেয়েছি বাইরে গিয়ে। তাই এসব বুল শিট আমার মুখ থেকে বেরুবেনা। আর হ্যাঁ পাপা শুনো, আমি আজকের ফ্লাইটেই ব্যাক করছি। আমাকে আর এই দেশে ডেকো না।

রফিক সাহেবের চোখের কোণে এক বিন্দু জল, কিছুই সেখাতে পারিনি ছেলেকে। কিছুই দিতে পারিনি দেশকে। এই লজ্জা তার একার নয়, পুরো দেশের।

বার্তা 

এই গল্পের মাধ্যমে একটি বার্তাই পৌঁছে দিতে চাই, নতুন প্রজন্মকে কিছু দেওয়ার চেষ্টা আমাদের সবার থাকা উচিৎ। আর এই চেষ্টাটা আমাদের নিজেদের ঘর থেকেই শুরু করা উচিৎ। “আমার একুশে , আমার অহংকার”।

লেখকঃ আফরোজা আলী তুলি। এম বি এ শিক্ষার্থী, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্কুল, চট্টগ্রামে কর্মরত। 

মন্তব্য
লোডিং...