এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ২৯ বছর পরেও যে সৈনিক জানত না যুদ্ধ শেষ

1,680

- Advertisement -

ছবিঃ হিরো অনোদা

আজ বলব জাপানের একজন সৈনিকের কথা যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার ২৯ বছর পরেও যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলেন, কারণ তিনি জানতেনই না যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।

হিরো অনোদা ছিলেন একজন জাপানী নাগরিক, যিনি মূলত একটি চীনা ট্রেডিং কোম্পানির হয়ে কাজ করতেন। যখন তার বয়স ২০ বছর, তখন যুদ্ধে যোগদানের জন্য জাপানি সেনাবাহিনীতে তার ডাক পরে। সেনাবাহিনীতে ডাক পেয়ে তিনি অবিলম্বে তার চাকরি ছেড়ে জাপানের নেতৃত্বে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে চলে যান। প্রশিক্ষণের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে, তিনি ইমপেরিয়াল আর্মি গোয়েন্দা অফিসার হিসাবে নাকানো স্কুলে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পান। এই বিশেষ সামরিক গোয়েন্দা প্রশিক্ষণে তিনি বিশেষ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন এবং গেরিলা যুদ্ধ চালানোর পদ্ধতি শেখেন। পরবর্তিতে তিনি শত্রু বাহিনীর পিছনে যেতে লেগে পড়েন এবং জাপানের শত্রুদের জীবন ঝালাপালা করা ও ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহ করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

১৯৪৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বর অনোদাকে ফিলিপাইনে লুবাং দ্বীপে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর প্রতি কমান্ডিং অফিসার মেজর ইয়োসিমী তানগুচীর আদেশগুলি ছিল এরকমঃ

“নিজের হাতে মরার জন্য তুমি একেবারে নিষিদ্ধ। এতে তিন বছর সময় লাগুক বা পাঁচ বছর, কিন্তু যাই হোক না কেন, আমরা তোমাকে ফিরিয়ে আনবো। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার একজন সৈনিকও আছে ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি তাকে নেতৃত্ব দিবে। তোমাকে নারকেল গাছের ডগায় বাস করতে হতে পারে। যদি দরকার হয়, তবে তাই করে। কোন পরিস্থিতিতেই তুমি নিজের জীবন স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিবে না।”

সেখানে দ্বীপে উপস্থিত অন্যান্য জাপানি সৈন্যদের সাথে তাকে সংযুক্ত করা হয়েছিল। কিছুদিন পরেই, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৫-এ ভয়াবহ এক যুদ্ধে মিত্রবাহিনী দ্বীপটি দখল করে ফেলে। অধিকাংশ জাপানী সৈন্যই মারা যায়। দ্বীপে অবশিষ্ট জাপানি সৈন্যরা ৩ বা ৪ টি ছোট দলে মধ্যে বিভক্ত হয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেয়।

ছবিঃ আত্মসমর্পণ করতে জঙ্গল ছেরে বেরিয়ে আসছেন অনোদা

এই ছোট ছোট দলের বেশিরভাগই খুব দ্রুত নিহত হয়। অনোদার দলের লোকেরা অবশ্য সেদিক থেকে ভিন্ন ছিল। এই দলে ছিল অনোদা নিজে, ইয়াইচি আকাৎসু, সিয়োচি শিমাদা এবং কিনিশিচি কোজুকা এই কয়জন। তারা গেরিলা যুদ্ধের কৌশলগুলি ব্যবহার করে শত্রু বাহিনীকে আক্রমন করত যাতে তারা যথাযথভাবে খাবার, গোলাবারুদ ইত্যাদির ব্যাবস্থা করতে পারে। কখনও কখনও তারা খাবারের সন্ধানে চালের সাথে কলা, নারকেল এবং অন্যান্য জংলী খাদ্য, এমনকি স্থানীয় খামারগুলিতে আক্রমন করেও গরু/মহিষ বা শস্য সংগ্রহ করতো।

১৯৪৫ সালের অক্টোবরে, একটি স্থানীয় খামার থেকে খাদ্যের জন্য একটি গরু মারতে গিয়ে তারা স্থানীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে উড়ে আসা একটি লিফলেট পায়, যেখানে লেখা ছিল,

এই যুদ্ধ ১৫ই আগস্ট শেষ হয়েছে। পাহাড় থেকে নেমে আস!

পাহাড়ের গুহায় তাদের গোপন কক্ষে ফিরে তারা কয়েকজন মিলে এই লিফলেটটি নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা করে। কিন্তু অবশেষে তারা এই সিদ্ধান্তে আসে যে, এটা আসলে মিত্রপক্ষের একটা প্রোপাগান্ডা। তারা বিশ্বাস করে যে সোজাপথে ধরতে না পেরে ছদ্মের আশ্রয় নিয়ে এসব লিফলেট বিলি করে বেড়াচ্ছে শত্রু বাহিনী। তাদের মনে এও দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে জাপান এই যুদ্ধে এত সহজে হেরে যেতে পারে না। অবশ্য হিরোশিমা এবং নাগাসাকির উপর পরমাণু হামলার ব্যাপারে যাদের কোনও ধারনা নেই, এমন ব্যক্তিদের কাছে এটা অদ্ভুত বলে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।

সেই একই বছরের শেষের দিকে, স্থানীয় আলেপ্পোদের উপর গুলি চালানোর খবর ফাঁস এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ার পর আবারও বোয়িং বি-১৭ প্লেনের দ্বারা এই লিফলেট ছিটানো হয়েছিল। জেনারেল ইয়ামাশিতই এই লিফলেটগুলি ছাপানোর আদেশ দিয়েছিল। অনোদারা আবারও এটার প্রামাণিকতা নির্ধারণ করার চেষ্টা করার জন্য সবাই মিলেই লিফলেটগুলি পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবারও ভুল বোঝে। কারন কথা ছিল, যদি জাপান জিতে, তাহলে জেনারেল এসে তাদের নিয়ে যাবে। আর জাপান হারাতে পারে না, তাই যুদ্ধ এখনও চলছে। তাই তারা আবারও ভেবে বসে যে, মিত্ররা তাদের সফল গেরিলা কৌশলগুলিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এবং কৌশলে তাদের আত্মসমর্পণ করানোর চেষ্টা করছে।

লিফলেটগুলি দিয়ে কোন কাজ হচ্ছিল না বলে এই পন্থা বাদ দেওয়া হয়। এবারে জাপানী সেনাবাহিনী থেকে কয়েকটি সার্চপার্টি পাঠানো হয় তাদের খোঁজে। তারা লাউডস্পিকার দিয়ে জঙ্গলে জঙ্গলে সার্চ করেছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রে, সৈনিকেরা ভুল বোঝাবুঝির সম্মুখীন হয়। তারা ভাবতে শুরু করে এরাও হয়ত শত্রুপক্ষের কোন চর। ফলে তারা জংলে তাদের অবস্থান আরো দৃঢ় করে তোলে।

এভাবেই এই চারজন বছরের পর বছর জঙ্গলে কাটাতে থাকে ও শত্রুদের বিরুদ্ধে আক্রমন চালাতে থাকে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পরে তারা খেয়াল করল যে অধিকাংশ লোক বেসামরিক পোশাক পরে আছে। তখন আবার তারা ভেবে বসেছিল যে, এটিও হয়ত মিত্রবাহিনীর মিথ্যা কোন প্রোপাগান্ডা। আর এটা হয়ত জাপানী গেরিলা সৈন্যদের আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দেওয়ার কোন অংশ। অন্যদিকে জাপানীরা যখনই কোন “বেসামরিক” মানুষদের উপর আক্রমনের খবর পেত, সাথে সাথে ওই এলাকায় অনোদাদের জন্য সার্চ পার্টির ব্যাবস্থা করত।

- Advertisement -

সময়ের সাথে তারা ধীরে ধীরে নিজের অজান্তেই তাদের মন সবাইকে শত্রু ভাবতে শুরু করে, এমনকি তাদের নিজের জাপানী স্কুলের সহপাঠী, যারা কখনো কখনো সার্চপার্টির সাথে আসত এবং তাদেরকে খুঁজে বের করে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার চেস্টা করত, তাদেরকেও।

এভাবে চলতে চলতে, জঙ্গলে প্রায় ৫ বছর কাটানোর পর, আকাৎসু অন্য তিনজন সৈন্যকে না জানিয়েই সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি আত্মসমর্পণ করবেন। তাই, ১৯৫২ সালে তিনি অন্যদের কাছ থেকে দূরে সরে যান এবং ৬ মাস জঙ্গলে একা একা ঘুরাফেরা করার পর সফলভাবে আত্মসমর্পণ করতে সক্ষম হন। এই ঘটনার কারণে, অনোদা আরও বেশি সাবধান হয়ে ওঠে এবং গভীর জঙ্গলে নিজেদের অবস্থা শক্ত করে। এ ধরনের ঘটনার পরে পুর্বের স্থানের জন্য আকাৎসু নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাড়ায়। “তাকে হয়ত বন্দী করা হয়েছে”, তারা এ ধরনের চিন্তাও করে।

ছবিঃ আত্মসমর্পণ করছেন অনোদা

আরো প্রায় ৫ বছর পর, গন্তিনের সমুদ্র সৈকতে একটি সংঘর্ষে শিমাদা নিহত হন। এখন কেবল তারা দুইজন, অনোদা আর কোজুকা ছিল। প্রায় আরো ১৭ বছর তারা দুজন জঙ্গলে পার করে দিলেন এই আশায় যে শেষ পর্যন্ত জাপান আরো সৈন্য প্রেরণ করবে। তারপর তারা গেরিলা যুদ্ধে এই সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেবে এবং এই দ্বীপ পুনরায় ফিরিয়ে নিতে পারবে। কারন তাদের কমান্ডিং অফিসার এর কমান্ড ছিল, যাই হোক না কেন প্রতিশ্রুতি পর্যন্ত কাজ করা ছিল।

অক্টোবর ১৯৭২ সালে, অর্থাৎ ২৭ বছর পরে কোজুকা ফিলিপাইন পুলিশ পেট্রোল এর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। জাপানিরা ভেবে নিয়েছিল যে তারা ইতিমধ্যেই হয়ত মারা গিয়েছে। কারন এতদিন জঙ্গলে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু কোজুকার মৃত্যুর পরে, তারা আবার ভাবতে শুরু করে, অনোদা বেঁচে থাকলেও থাকতে পারে। তাই খবর পাওয়া মাত্র তৎক্ষণাৎ তারা জঙ্গলে আবার একটা সার্চ পার্টির আয়জন করে। কিন্তু সঙ্গী মারা যাওয়ার পরে এমন সার্চ পার্টি দেখে অনোদা মনে করে তাকেই হয়ত ধরতে এসেছে শত্রুপক্ষ। ফলে সে তার নিরাপত্তা জোরদার করতে আবারও গভীর জঙ্গলে ডুব দেয়। এতে করে জাপানী সার্চপার্টি আবার ব্যর্থ হয়। অনোদাও তার মিশন অব্যাহত রাখেন।

এদিকে ১৯৭৪ সালে নারিও সুজুকি নামের এক জাপানী কলেজ ছাত্র পৃথিবী ভ্রমণে বেরি হয়। সুজুকি লুবাং দ্বীপের জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ করেই এমন একটা জিনিস পেয়ে যায়, যা গত ২৯ বছর ধরে হাজার খানেক লোক চেষ্টা করেও পারে নি। ঠিক তাই, অনোদার বাসস্থান ও স্বয়ং অনোদাকে। এরপর সে তাকে তার সাথে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য জোর চেষ্টা করে। কিন্তু অনোদা তাকে বলেন, তার কমান্ডিং অফিসাররা বলেছিলেন যে যাই ঘটুক, তারা অনোদার জন্য ফিরে আসবে। এবং তিনি এর আগে আত্মসমর্পণও করবেন না এবং বিশ্বাসও করবেন না যে যুদ্ধ শেষ, যতদিন না তারা এসে তাকে ফিরে যেতে আদেশ দেওয়া হয়।

ছবিঃ জাপানে ফিরলেন অনোদা

বছরের পর বছর ধরে অনোদা গেরিলা কৌশল ব্যবহারে খুব সফল ছিল। ইতিমধ্যে প্রায় ৩০ জন ফিলিপিনো হত্যা এবং গোটা শতেক আহত করার পাশাপাশি প্রচুর গবাদি-পশু ও ফসল ধ্বংসও করে ফেলেছিলেন। তাকে এভাবে ফিরিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়ে সুজুকি জাপান ফেরত যায়। সেখানে তিনি গিয়ে দেখতে পান মেজর তানগুচি এখন অবসরপ্রাপ্ত এবং একটি বইয়ের দোকানে কাজ করেন। তাকে বিস্তারিত খুলে বললে তানগুচি দ্বীপে আসেন এবং অনোদাকে আদেশ করেন যে জাপান যুদ্ধ হারিয়েছে, তিনি যেন তার অস্ত্র ছেড়ে দেন এবং ফিলিপিনোদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এই কথা শোনার পরে অনোদার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। তিনি বিগত ২৯ বছর ধরে যে এই সকল বেসামরিক লোকদের আঘাত করেছেন, এই মনকষ্টে মুষড়ে ওঠেন।

১৯৭৫ সালের ১০ই মার্চ ৫২ বছর বয়সে অনোদা নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত ফুল ইউনিফর্মে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসেন ও ফিলিপাইনের রাষ্ট্রপতি ফার্দিনান্দ মারকোস এর কাছে তার সামুরাই তলোয়ার প্রদানের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করেন। যদিও তিনি ফিলিপাইনে খুব জনপ্রিয় ছিলেন না, কিন্তু জাপানে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন, তাই মার্কোস তার অপরাধের জন্য অনোদকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কারন অনোদা মনে করেছিলেন যে তিনি পুরো সময় যুদ্ধে ছিলেন।

এখন শেষ পর্যন্ত, আমরা অনোদাকে একজন বোকা কিংবা খুনি হিসাবে ভাবতে পারি। কিন্তু একই সাথে, তিনি তাদেরও অন্তর্ভুক্ত, যারা কঠোর দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যে বাস করে, যারা সমস্ত কষ্টকে সফলতা হিসাবে অর্জন করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করে এবং যারা যেকোনো অবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।

ছবিঃ শেষ বয়সে অনোদা

জাপানে অনোদাকে বর্তমানে অধ্যাবসায় এর প্রতিক হিসেবে উদাহরণ দেওয়া হয়ে থাকে। ১৯৯০ সালে অনোদা “No Surrender: My Thirty-Year War” নামে একটি বই লিখেছিলেন। ২০১৪ সালের ১৬ই জানুয়ারি ৯১ বছর বয়সে অনোদা নিউমোনিয়া ও হার্ট ফেইলিওর হয়ে টোকিয়োর সেন্ট লুক’স ইন্টারন্যাশনাল হসপিতালে মারা যান। তার মৃত্যুতে জাপানের চিফ কেবিনেট সেক্রেটারি ইয়োশিহিদে সুগা বলেছিলেন,

“I vividly remember that I was reassured of the end of the war when Mr Onoda returned to Japan.”

সোর্সঃ

১. Hiroo Onoda (1999). No Surrender: My Thirty-Year War. Translated by Terry, Charles S. New York: Dell. 
  ISBN 978-1557506634.
২. https://en.wikipedia.org/wiki/Hiroo_Onoda
মন্তব্য
লোডিং...