এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

“আমার ধর্ষককে আমি ও বন্ধুরা মিলে পিটিয়েছি এবং এজন্য আমি কখনোই ক্ষমা চাইবো না!”

Xojane ওয়েবসাইটে ২০১৬ সালের ১৬ মে প্রকাশিত হয় এমিলি ইভল্যান্ডের লেখা ফিচার "My Friends and I Beat Up My Rapist, And I Will Never Apologize for Getting Revenge"। সেই লেখাটিরই অনুবাদ এটা।

927

- Advertisement -

ন্যায়বিচারের আশায় না থেকে আমি নিজেই নিজের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছি। আমি এবং আমার বন্ধুবান্ধব মিলে আমার ধর্ষককে বেধড়ক পিটিয়েছি। বিশ্বাস করুন, আমি একটুও অনুতপ্ত নই।

 

আমাকে ধর্ষণ করার আগে শন ছিলো আমার বন্ধু। সবচেয়ে ভালো বন্ধু। আমি তার জন্মদিনের জন্য কেক বানিয়েছি, গিটার বাজিয়ে গান গেয়ে তাকে শুনিয়েছি। কত ছোটছোট সুখদুঃখের সময় একসাথে পার করেছি, মন খুলে হেসেছি। আমি শন কে বিশ্বাস করতাম।
হ্যা, বিশ্বাস!

থ্যাংকসগিভিং এর দুইদিন পরের ঘটনা। আমার রচেস্টার এপার্টমেন্টের পাশেই একটা বার আছে। বারের নাম “Bug Jar”। সেই বারেই একটা ব্যান্ড শো হচ্ছিলো। আমি শনকে সেই শো দেখার জন্য আসতে বললাম। যেহেতু আমার বয়স ১৯, আমি বারে কোন এ্যলকোহল পান করতে পারবো না। তাই আমরা দুজন আগে আমার এপার্টমেন্টে এলাম। এবং ১৫ মিনিটের মধ্যে আধ লিটার UV Blue খেয়ে ফেলেছি। যখন আমি আর শন বারে গেলাম, আমি পুরোপুরি মাতাল। প্রথম ব্যান্ডটা সবেমাত্র পারফর্ম করা শুরু করেছে আর আমি দাঁড়াতেই পারছিলামনা। আমি শন কে বললাম যে আমি আ্যপার্টমেন্টে ফিরে যেতে চাই। দুজন আ্যপার্টমেন্টে ফিরে এলে আমি শনকে লিভিং রুমের সোফায় শুতে বললাম, কারণ তখন অনেক রাত হয়ে গেছিলো। আমি ঘরে ঢুকে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পরলাম। আমার আর কিছু মনে নেই।

আমি ঘুমিয়ে পরার পর ঠিক কতটুকু সময় পার হয়েছে আমার মনে নাই। হঠাৎ ঘুম ভাঙলে দেখতে পারলাম শন আমার উপরে চড়ে আছে। আমার তখন পিরিওড চলছে। আমি বুঝতে পারলাম যে শন আমার যৌনাঙ্গের ভেতরে থাকা ট্যাম্পনটাকে ঠেলে আরো ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আমি কিছু বলতে চেষ্টা করছিলাম, পারছিলাম না। আমার জিভে কথা জড়িয়ে আসছিলো। অনেক কষ্টে আমি বললাম, “না শন, প্লিজ! না!” শন হেসে বললো, “আরে, আমি তো ভেবেছিলাম বিছানায় তুমি আরো ভালো পারফর্ম করবে।” আমি শনকে বাধা দেয়ার অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু তাকে থামাতে পারিনি। শেষপর্যন্ত আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পরি।

সকালবেলা আমি মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রণা নিয়ে ঘুম থেকে উঠলাম। আমি মনে করার চেষ্টা করছিলাম যে রাতে কি হয়েছিলো, কিন্তু মনে পরছিলো না। পাশে চেয়ে দেখি শন আমার পাশে নগ্ন হয়ে শুয়ে আছে। তারও ঘুম ভেঙেছে। শন আমার দিকে চেয়ে হাসলো। আমি দেখলাম আমার জামাকাপড় গুলো দুমড়ে পড়ে আছে মাটিতে। আমি কোনমতে কিছু গায়ে চাপিয়ে দৌড়ে পাশের রুমে গেলাম আমার রুমমেটের কাছে। আমার রুমমেট লিয়াহ আমাকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ” কি হয়েছে তোমার?” আমি কোন জবাব দিতে পারিনি। আমি শুধু বললাম, আমার খুব খারাপ লাগছে জানিনা কেন! লিয়াহ প্রস্তাব দিলো ব্রেকফাস্ট করতে যাওয়ার। আমি শন আর লিয়াহ মার্ক’স টেক্সাস হটস ডাইনারে গেলাম ব্রেকফাস্ট করতে। এই ডাইনারেই শনের সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিলো।

ডাইনারের বুথে আমার পাশে বসলো শন, উল্টোদিকে লিয়াহ। আমার বোধশক্তি তখনো কাজ করছিলো না। আমি জুলিয়ান সালাদ অর্ডার করলাম ব্লু চিজ ড্রেসিং দিয়ে। খাবার আসার পর শন আঙুল দিয়ে আমার প্লেট থেকে আঙুল দিয়ে চীজ তুলে খেতে লাগলো। ভাবখানা এমন, যেন সে আমার বয়ফ্রেন্ড! আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম মানুষ কেমন করে এত নির্লজ্জ হতে পারে!

এপার্টমেন্টে আমি আর লিয়াহ ফিরে এলাম। বাড়িতে এসে আমি লিয়াহ কে বললাম আমার জরায়ুতে ট্যাম্পন আটকে গেছে। আমি নিজে সেটা খুলে আনতে পারছিনা। লিয়াহ যেন আমাকে সাহায্য করে। তিরিশ সেকেন্ড পর লিয়াহ বলে উঠলো, “ওহ গড এমিলি! আই আ্যম সরি!” বলে সে আঙুল দিয়ে আমার ভেতর থেকে একটা ব্যবহৃত কনডম বের করে আনলো, তার সাথে আটকে ছিলো আমার ট্যাম্পন। লিয়াহ আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলো। আমি লিয়াহকে বললাম, ” লিয়াহ, আমাকে শন রেপ করেছে।” বলে আমি ডুকরে কেঁদে উঠলাম।

আমি জীবনে প্রথম যৌন হয়রানির শিকার হই ১৩ বছর বয়সে। আমি একথা কাউকে জানাইনি। নিজে নিজে কেঁদেছি, নিজেকে শাস্তি দিয়েছি, আ্যনারক্সিয়ায় ভুগেছি। আমি ভেবেছি সব দোষ আমার। হয়তোবা আমিই এমনভাবে শরীর দেখিয়ে বেড়িয়েছি যে ১৭ বছরের ছেলেরা নিজেদের কন্ট্রোল করতে পারেনি। কিন্তু শন যখন আমাকে রেপ করলো, আমি বুঝতে পারলাম দোষ আমার নয়। আমি এর প্রতিবাদ করবো, প্রতিশোধ নেবো।

- Advertisement -

পুলিশের কাছে আমি ইচ্ছে করেই যাইনি। আমি জানি, পুলিশ উলটো আমাকেই দুষবে, আমার চরিত্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে পোস্টমর্টেম করবে। আমি কেন এলকোহল খেলাম, কেন শন কে নিয়ে বারে গেলাম, কেন শনকে আমার এপার্টমেন্টের সোফায় ঘুমুতে দিলাম। তাছাড়া আমি তো মাতাল ছিলাম, আমি কিভাবে জানলাম যে আমার রেপ হয়েছে? হয়তোবা আমিই রাজি ছিলাম। আমাকে তারা চরিত্রহীন প্রমাণ করে ছাড়তো, মজা লুটতো। তাই আমি ঠিক করলাম, আমার ন্যায়বিচার আমি নিজেই করবো।

আমি প্রেরণা পেয়েছিলাম সেইসব নারীদের কাছ থেকে যারা নিজেদের অন্যায়ের প্রতি রুখে দাঁড়িয়েছে। গার্ল উইদ দ্য ড্রাগন ট্যাটু মুভির ফিকশনাল হিরো, যে তার রেপিস্টকে পিটিয়ে তার গায়ে ট্যাটু করে লিখে দিয়েছিলো “I AM A SADISTIC PIG, A PERVERT, AND A RAPIST”। টার্কিতে এক প্রেগন্যান্ট মহিলা তার রেপিস্টের মাথা কেটে ফেলেছিলো, লরেনা ববিট; যে কিনা তার মেয়ের রেপিস্টকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছিলো, টেক্সাসের এক মহিলা যে তার রেপিস্ট স্বামীর পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলেছিলো। আমি তাদের কাছ থেকে প্রেরণা নিয়েছি। আমি ভিক্টিম হতে হতে ক্লান্ত হয়ে গেছিলাম। আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না।

আমি আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড, এক আত্মীয় এবং এক বন্ধুকে ফোন করলাম। তাদের বললাম যে আমি ধর্ষিত হয়েছি। সবাইকে বললাম আমার প্ল্যানের কথা। সবাইকে রচেস্টারে চলে আসতে বললাম। তারা বিনাবাক্যে মেনে নিলো। সবাই আমার বাড়িতে এলে আমরা বদলা নেওয়ার ছক কষলাম। সবাই আমাকে সাপোর্ট করেছিলো।

আমার ধর্ষণের দুই সপ্তাহ পর আমরা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য শনের বাড়ি গেলাম এক গাড়িতে আমি আর আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড, অন্য গাড়িতে আমার বন্ধু আর আত্মীয়। আমি আর বয়ফ্রেন্ড প্রথমে ওর দরজার সামনে গেলাম, আড়ালে দাঁড়ালো বাকি দুইজন। কলিং বেল টেপার কিছুক্ষণ পর দরজা খুললো শন। কিছু বলার আগেই আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড আমার পেছন থেকে বের হয়ে এসে গদাম করে একটা ঘুষি মারলো শনের মুখে। শন মাটিতে ছিটকে পরলো। এবার আমরা সবাই ভেতরে ঢুকলাম। সবাই মিলে ওকে চ্যাংদোলা করে ফেলে দিলাম কাচের কফিটেবিলের ওপর। সবাই মিলে এলোপাথাড়ি লাথি ঘুষি মারতে লাগলাম। শনের গা দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছিলো, ও মাটিতে শুয়ে গোঙাছিলো অসহায়ের মতো। আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড ওর পেটে কষে লাথি বললো, “কি ভেবেছিলি? আমাদের বন্ধুকে রেপ করে পার পেয়ে যাবি?” শনকে মেরে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে আমরা চলে আসছিলাম। হঠাৎ আমি ওর মুখে লাথি মেরে চেঁচিয়ে বললাম। “FUCK YOU”। আমি উপলদ্ধি করলাম, আমি আমার আওয়াজ ফিরে পেয়েছি, আমার সাহস ফিরে পেয়েছি যা শন সেদিন স্তব্ধ করে দিয়েছিলো।

অনেকেই বলতে পারে, শনের সাথে সেদিন যা করেছিলাম, অন্যায় ছিলো। ভায়োলেন্সের বদলে ভায়োলেন্স, এটা ঠিক নয়। কিন্তু শন শুধু আমাকে ধর্ষণ করেনি, ধর্ষণ করেছে আমার বিশ্বাসের, আমার বন্ধুত্বের।

শনের বাড়ি থেকে বের হয়ে আমি সেদিন ট্যাটু পার্লারে যাই। বুকে ট্যাটু করে লিখি, “Burn It To The Ground”। সাথে প্রতিকী ছবি থাকে দুটো প্রার্থনারত ম্যান্টিস, একটি ম্যান্টিসের হাতে তার সঙ্গীর রক্তাক্ত ছেঁড়া মাথা। নারী ম্যান্টিস মিলনের পর পুরুষসঙ্গীর মাথা ছিঁড়ে ফেলে। সেই ট্যাটুই আমি বুকে করিয়েছি।

ধর্ষণ একদিনের ঘটনা নয়। একদিন একমাস একবছরের ধর্ষণের ক্ষত মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ধর্ষণের যন্ত্রণা, অপমান, কষ্ট গায়ের রক্তে মিশে যায়। টেনে আলাদা করা যায় না। ধর্ষিতার কষ্ট অন্য কাউকে বোঝানো সম্ভব না।

আজ পাঁচবছর পর আমি এই ঘটনা শেয়ার করছি। কিন্তু এই পাঁচবছরে আমার একবারও মনে হয়নি আমি অনুতপ্ত। আমার মনে হয়নি আমি ভুল করেছি। আমি অনেক রেপ ভিক্টিমকেই চিনি যারা চুপ করে বসে আছে। আইনব্যবস্থা তাদের ন্যায়বিচার দিতে অক্ষম হয়েছে, তাদেরকে চরিত্রহীন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাদেরকে বলছি, আওয়াজ তোলো, প্রতিবাদ করো। নিজেকে নিজেই সাহায্য করতে হবে। পৃথিবী কোন রূপকথার জগত নয়। রাজপুত্র আসবেনা তোমাদের বাঁচাতে। এতদিন পর আমার এই কথা শেয়ার করা উদ্দেশ্যই হচ্ছে যেন কেউ একজন আমার কথা শুনে সাহস পায়, অনুপ্রাণিত হয়। আমি আমার জীবনের আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা উপড়ে ফেলে দিয়েছি অনেক আগেই। আবার তোমার পালা।

Xojane ওয়েবসাইটে ২০১৬ সালের ১৬ মে প্রকাশিত হয় এমিলি ইভল্যান্ডের লেখা ফিচার “My Friends and I Beat Up My Rapist, And I Will Never Apologize for Getting Revenge“। সেই লেখাটিরই অনুবাদ এটা।

মন্তব্য
লোডিং...