এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

গ্রামবাংলার লোকগাঁথা-এক আশ্চর্য দীঘির গল্প

13

- Advertisement -

অনেক আগেকার কথা, আমার দাদার কাছ থেকে শোনা একটি ব্রিটিশ আমলের গল্প। গল্পটি এক জমিদার এবং তাঁর পরিত্যক্ত জমিতে দীঘি খনন করাকে কেন্দ্র করে।

বহুকাল আগে জনদরদী এক জমিদার ছিলেন।তিনি  সবার জন্য মন প্রাণ উজার করে দিতেন, খুব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। গ্রামের সবাই একদিন জমিদারের কাছে আর্জি নিয়ে আসল। তিনি যেন গ্রামবাসীর সুবিধার্থে সবার জন্য একটি উন্মুক্ত পুকুর বা দীঘি খনন করে দেন। সবাই এজন্য নিজ নিজ জমির কিছু অংশ জমিদারকে দীঘির জন্য দিতে চাইলো কিন্তু জমিদার গ্রামের জনসাধারণের জমি নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কারণ, তাঁর নিজেরই মাইলের পর মাইল জমি আছে । কত জমি পরিত্যক্ত পড়ে আছে !তিনি গরীব গ্রামবাসীর সম্বল সামান্য জমি না নিয়ে নিজেরই একটি পরুত্যাক্ত বিস্তীর্ণ জমি খনন করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনে দীঘি খননের জন্য তিনি পাঁচশত লোক নিয়োগ দিলেন। সবার অক্লান্ত পরিশ্রমে দশ ফুট পর্যন্ত খনন করার পরেও দীঘিতে বিন্দুমাত্র জলও উঠল না। জমিদার এবং গ্রামবাসী সবাই বেশ অবাক হল। তবুও তারা জমিদারের কথায় নিরাশ না হয়ে প্রতিদিন পানির আশায় একটু একটু করে আরো দশফুট খনন করে ফেলল। কিন্তু নাহ্ এবারও পানি উঠল না ! জমিদারও হাল ছাড়লেন না। তিনি দীঘি আরো গভীর করার নির্দেশ দিলেন। প্রায় পঁচিশফুট খনন করা হল কিন্তু নাহ্ এখনও ঝরঝরে মাটি , দীঘির কোথাও কোন পানি নেই !

এবার জমিদারও চিন্তামগ্ন হয়ে গেলেন। গ্রামসুদ্ধ সবাই জমিদারকে চিন্তামগ্ন দেখে তারাও হতাশ হয়ে গেল এবং কানাকানি করতে লাগল।‌ তাছাড়া এতগুলো মানুষের পন্ডশ্রম হল এসব ভেবে জমিদার খুব ছটফট করতে লাগলেন। এক সময় ভাবতে ভাবতেই ক্লান্ত ঘুমিয়ে গেলেন।সে রাতেই জমিদার একটি স্বপ্ন দেখলেন। তিনি দেখলেন, তাঁর খননকৃত দীঘিতে স্বচ্ছ জল টলমল করছে ! আর সে জলের ওপরে সুসজ্জিত একটি পানসী নৌকা ভাসছে এবং তার ভেতর থেকে একটি গম্ভীর অদৃশ্য আওয়াজ তাঁকে বলছে,

– “রক্ত দে জল উঠবে ! রক্ত দে জল উঠবে !”

আতঙ্কে জমিদারের ঘুম ভেঙে গেল , সারারাত তাঁর ঘুম হল না। ভোর বেলা তিনি দীঘির পাড়ে বসে অদ্ভুত স্বপ্নটা নিয়ে চিন্তা করছে্। কি দেখলেন স্বপ্নে! কেনই বা দেখলেন? এটা কি সত্যি?

জমিদার এই স্বপ্ন ব্যাখ্যার জন্য গোপনে এক বিশ্বস্ত খোয়াব বা স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারীকে ডেকে পাঠালেন। তিনি তার কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারী বলল, দীঘিতে কোন প্রাণীকে বলি দিয়ে রক্ত দিতে। তাতে হয়ত জল উঠবে ! কথামত জমিদার বেশ কয়টি মোরগ বলি দিলেন। কিন্তু তিনদিন চলে গেলেও কোন জল উঠল না।

তারপর তিনি আবারও একই স্বপ্ন দেখলেন কিন্তু কিছু বুঝে উঠতে পারলেননা ! আবার তিনি খোয়াব ব্যাখ্যাকারীকে ডেকে পাঠালেন। খোয়াব ব্যাখ্যাকারী বলল, এবার একটি পাঁঠা বলি দিয়ে রক্ত দিতে। কথামত জমিদার তাই করলেন কিন্তু সাতদিন পেরিয়ে গেলেও কোন পানি নেই। শুধু ধু ধু প্রান্তর। স্বপ্নও দেখলেননা এর মাঝে আর !

এ ঘটনায় গ্রামের সবাই আহাজারি করতে লাগল কারণ গ্রামবাসীর দীঘির খুব প্রয়োজন ছিলো বলেই তারা জমিদারের নিকট গিয়েছিলো। এতো সব ভেবে ভেবে জমিদার খাওয়া নাওয়া ভুলে মনমরা দীঘির পাড়েই সারাদিন চিন্তামগ্ন হয়ে হেঁটে বেড়াতেন। তাঁর স্ত্রী তাঁকে অনেক স্বান্তনা দিতেন কিন্তু তবু তাঁর পক্ষে এটা মেনে নেয়া সম্ভব ছিলো না ! তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন।

- Advertisement -

এভাবে প্রায় মাস কেটে গেল। তারপর আবার একই স্বপ্ন দেখলেন ! এবার তিনি স্বপ্নেই জিজ্ঞাসা করলেন, রক্ত তো দিয়েছি আর কত রক্ত দেব?জবাবে অদৃশ্য আওয়াজ বলল –

“নর রক্ত দে ! নর রক্ত দে !”

ঘুম ভেঙে গেল জমিদারের ! কি করে নর রক্ত দেবেন তিনি! চিন্তায় চিন্তায় জমিদার রোগা হয়ে যেতে লাগলেন। অবশেষে তিনি চূড়ান্ত একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন !

হঠাৎ একদিন জমিদার আবার আগের মত হাসি খুশি প্রাণবন্ত হয়ে গেলেন। স্ত্রী সন্তানকে আবার আগের মত সময় দিতেন, ভালোবাসতে লাগলেন, তাঁর স্ত্রী, পুত্র, কাছের মানুষরা সবাই এ দেখে খুশি হল। এমনি একদিন একসাথে নৈশভোজের পরে আনন্দ ফুর্তিতে সবার থেকে বিদায় নিয়ে তিনি শুতে গেলেন। জমিদারের সুস্থ স্বাভাবিক আচরণ দেখে নিশ্চিন্তে বাড়ির সবাই সে রাতে ঘুমিয়ে গেল।

কিন্তু হঠাৎ শেষ রাতে জমিদারের স্ত্রীর ঘুম ভেঙে গেলে সে জমিদারকে বিছানায় দেখতে পেল না ! সে এবং বাড়ির সবাই পুরো জমিদার বাড়ি খুঁজেও তাঁকে পেল না ! সকাল হলেও জমিদারকে গ্রামের কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। সবাই সমস্ত গ্রাম খুঁজেও তাঁর কোন সন্ধান পেল না! কিন্তু সবাই যখন দীঘির পাড়ে খুঁজতে গেল তখন অলৌকিক অবিশ্বাস্য একটি ঘটনা দেখে হতবাক হয়ে গেল গ্রামবাসী ! দেখল, দীঘিতে স্বচ্ছ টইটুম্বুর জল ! কেউ ভেবে পায় না এত জল কোথায় ছিলো এতদিন, কোথা থেকে এলো, আজ এমন কি ঘটেছে !! জমিদারই বা কোথায় গেলেন !!

শত প্রশ্নের জাল ভেদ করে তারা জমিদারের খোঁজে যে যেভাবে পেরেছে জলেও খুঁজতে নেমে গেল। অবশেষে বেলা শেষে তারা জমিদারের গলাকাটা লাশটি দীঘির জল থেকে তুলল….! এদিকে জমিদার তার স্ত্রীর উদ্দেশ্যে একখানা পত্র লিখে রেখে গেছেন। সেই পত্রে তাঁর অপমৃত্যু বা আত্মহত্যার কারণ জানিয়ে লিখেছিলেন। তিনি পত্রে বলে গেছেন যে, সেদিন রাতেও সে স্বপ্নটি দেখেছিলেন ! পানসি নৌকায় বসে থাকা নিজেরই গলাকাটা দেহটি গম্ভীর আওয়াজে তাঁকে বলে যে,

– “এ পরিত্যক্ত জমিখানা( দীঘি খননকৃত জমিটি) তাদের আবাসভূমি ছিলো। তিনি অন্যায় করেছেন যার বিনিময়ে নর রক্ত দিতে হবে। নইলে দীঘিতে কোনদিন জলও উঠবে না এমনকি গ্রামের মানুষ যারা দীঘিটি খনন করেছে তাদেরও বড় ক্ষতি হবে !”

জমিদার বুঝে গেলেন যে তাঁকেই ডাকছে দীঘিটি, নিজেকেই বলি দিতে হবে !

এ ঘটনার পরে শোকাহত জমিদার পত্নী প্রায় বোবা হয়ে গেলেন আর পুরো গ্রাম শোকে মুহ্যমান হয়ে গেল…।

তারপর থেকে দীঘিতে কোন ঘাটতি হয়নি জলের, যত ব্যবহারই করা হোক দীঘির জল কখনও ময়লা হয়না ! সারাদিন বা দিনের বেলায় অদ্ভূত সুন্দর রূপ ধারণ করে দীঘিটি। তবে রাতে কেমন ভয়ঙ্কর শান্ত আর গা ছমছম করা পরিবেশ থাকে দীঘিটি এবং দীঘির চারিপাশ ! আতঙ্কে কেউ আসেও না সন্ধ্যার পরে।

জমিদার চলে যাবার পরও বহুকাল অবদি জমিদার পত্নী এবং গ্রামের বিভিন্ন মানুষ প্রতি অমাবশ্যা, পূর্ণিমার রাতে দীঘির জলে সুন্দর একটি পানসী নৌকা ভাসতে দেখতেন ! যাতে নাকি মৃত জমিদারের গলাকাটা দেহটি বসে থাকতে দেখা যেত ! তবে সে রহস্য কখনও কারোরই ভেদ করা সম্ভব হয়নি…।

এমন অনেক সত্য / কাল্পনিক ঘটনা ছোট বেলায় নানা নানী, দাদা দাদীর কাছে অনেকেই শুনেছি ! এরকম এমন কিছু কিছু ঘটনা বা গল্প ছিলো যা কয়েকযুগ পর্যন্ত অক্ষত ছিলো। যদি এসব একদম নিছকই হবে তবে এতগুলো সময় বা যুগ অবদি ঘটনা বা গল্পগুলো অক্ষত কিকরে থাকে, মানুষের মনে এতটা আলোড়ন কি করে সৃষ্টি করে ?

তাছাড়া বিজ্ঞানও এখন অদৃশ্য শক্তির কথা স্বীকার করে।

এ ঘটনা সত্য কতটুকু জানি না। তবে সারা দুনিয়ায় এমন অনেক অদ্ভূত রহস্যের অদৃশ্য জাল ছড়িয়ে রয়েছে। যে জাল ভেদ করা আজও সম্ভব হয়নি। আশা করি অদূর ভবিষ্যতে হবে…..।

মন্তব্য
লোডিং...
Translate »