এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

মাহফুজা ইয়াসমিন নিপু’র গল্প- “কালো অধ্যায়- পর্ব-০১”

450

মোহিনী আজ ভীষণ খুশি । অনেক তপস্যা আর কষ্টের বেড়াজাল ভেঙে আজ সে তার সবচেয়ে কাছের মানুষটার কাছে যেতে পারবে । আজ মোহিনীর বিয়ে । কতো স্বপ্নই না থাকে একটা মেয়ের । সেই ছোট বেলা থেকে বারবার লাল শাড়ি পরে বউ সাজার শখ থাকে প্রতিটা মেয়ের । এটা বোধহয় প্রকৃতিরই নিয়ম । মেয়েদেরকে ছোট বেলাতেই বুঝে যেতে হয় বাবা-মার ঘরে সে কিছুদিনের অতিথী মাত্র ।

নীলয়ের সাথে বহু বছরের ভালোবাসা মোহিনীর । কতো যত্ন করে সাজিয়ে গুছিয়ে এই ভালোবাসাকে টিকিয়ে রেখেছে মোহিনী । জীবনের প্রথম ভালোবাসাকে কোন ভাবেই কষ্ট দিতে বা হারিয়ে ফেলতে রাজি নয় সে । নীলয় উদাসীন গোছের ছেলে । উদাসীন ছেলেরাই হয়তো এতো ভালোবাসা পায় । মেয়েরা হয়তো উদাসীন ছেলেগুলোকেই এতো ভালোবাসে । মোহিনী মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে । তাই তার স্বপ্ন গুলোও হিসাব করে গোছানো । নীলয় যে মোহিনীকে কম ভালোবাসে , ব্যাপারটা ঠিক এমন নয় । নীলয়ের প্রকাশ ক্ষমতা কম । প্রচণ্ড ভালবাসে সে মোহিনীকে । নাহলে এতো ঝড় ঝাঁপটা পেরিয়ে আজ তাদের বিয়েটা হচ্ছে কি করে ?

লাল টুকটুকে বউ সেজে মোহিনী আজ কতো কথাই না ভাবছে । এই বিয়ে নিয়ে নীলয়ের পরিবার কেউ রাজি ছিল না । নীলয় একমাত্র ছেলে বাবা-মায়ের । ধনাঢ্য পরিবার তাদের । নীলয়ের মা তার বান্ধুবীর মেয়ের সাথে নীলয়ের বিয়ে নাকি অনেক আগেই ঠিক করে রেখেছিল । কোন ভাবেই মোহিনীকে তারা মেনে নিবেনা । মোহিনীর গায়ের রঙটাও আবার একটু কালো । নীলয় প্রচণ্ড সুন্দর একটা ছেলে । সেই হিসেবে তাদের মতে মোহিনী , নীলয়ের যোগ্য না । নীলয়ের মা একদিন ফোন করে মোহিনীকে কতো বাজে বাজে কথাই না বললো । মোহিনী সেগুলো আর মনে করতে চায় না । নিজের পরিবারকে ছোট করবে না ভেবে সে নীলয়কে বিয়ে করবে না বলে জানিয়ে দেয় । তারপর নীলয়ের সাথে যোগাযোগ বন্ধ । দুইদিন পর রাজুর ফোন আসলো মোহিনীর কাছে । রাজু নীলয়ের বন্ধু । ফোন করে বললো ,এখনই হসপিটালে যেতে ,নীলয় এক্সিডেন্ট করেছে ।

মোহিনী কিভাবে হসপিটালে পাগলের মতো দৌঁড়ে গেলো তা তার মনে নেই । জানা গেল দুইদিন ধরে নীলয় নাকি বাসায় যায়নি । রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছে । সারারাত ঘুমায় নি ,খায় নি । এমন অবস্থায় ড্রাইভ করছিল রাতের বেলা । হটাৎ করে পেছন থেকে একটা বাস এসে ধাক্কা দিয়েছে । পা ভেঙ্গেছিল,মাথা কেটে গড়গড় করে রক্ত পরছিল । আর ঘোরের মধ্যে মোহিনীর নাম নিচ্ছিল বারবার । নীলয়ের মা ঐ রাতে মোহিনীকে হসপিটালে নীলয়ের রুমে যেতে দেয়নি । একটু দেখতে দেয় নি । সারা রাত মোহিনী হসপিটালের বারান্দায় বসে ছিল । ভোর বেলায় মোহিনীর ছোট ভাই আশিক জোর করে মোহিনীকে বাসায় নিয়ে গেল ।বাসায় ফেরার পর মোহিনীর মা মোহিনীকে বেধড়ক মার দিয়েছিল । নষ্টা মেয়ে বলে অনেক গালিও হজম করেছিলো মোহিনী ।

সে অনেক কাহিনী পার হয়ে নীলয় সুস্থ হবার পর তার বাবা একদিন হুট করে মোহিনীদের বাসায় এসে হাজির । বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন তিনি । নীলয় নাকি সাফ জানিয়ে দিয়েছে মোহিনীকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবেনা সে । ছেলের জেদের কাছে বাধ্য হয়েই হয়তো আজ এই বিয়ের প্রস্তাব । আর আজ সেই বিয়ের দিন । যদিও নীলয়ের মা মোহিনীর সাথে এখন পর্যন্ত একবার কথা বলছেন না । কিসের এতো অভিযোগ উনার ?

বিয়ের ঝামেলা শেষ হলো । মোহিনীর নতুন সংসার । এতো অপমানের পরও নীলয়কে কাছে পাবার মতো উপহার তার জীবনে আর হয়তো কিছুই হবে না । এভাবে ভালোই কাটছিল মোহিনীর সংসার । শাশুড়ি মাও একটু আধটু কথা বলা শুরু করলেন । মোহিনী একাই পুরো বাড়ি গুছিয়ে নিচ্ছিল ।রান্না ঘরেও বিস্তার করলো মোহিনীর হাতের ছোঁয়া । এভাবে বিয়ের প্রায় দুই বছর পেড়িয়ে গেল । মোহিনীর চাকরী করা নিষেধ । এতো পড়াশোনা বিফলে গেল । সংসারের মায়া জালে বন্দী জীবন ।

এমন সময় নীলয়ের গ্রামের বাড়ি থেকে শায়লা ফুফু বেড়াতে আসলেন । উনাকে আজই প্রথম দেখল মোহিনী ।বিয়েতেও উনি আসেন নি । শায়লা ফুফুর পরনের কাপড় কালো । কুচকুচে কালো । উনি নাকি সচরাচর কারো বাসায় যান না । নীলয়ের মায়ের অনেক আবদারে আজ উনি এসেছেন । মোহিনী উনাকে সালাম করতে গেলে উনি হটাৎ পা সরিয়ে নিলেন । বললেন ‘ওই ছেমড়ি … সালাম করতে বলছি তোরে ??? যখন তখন গায়ে হাত দিবি না … আমার পছন্দ না… ‘।।’

মোহিনী ভয়ে পেছন চলে আসলো ।শায়লা ফুফুর চোখগুলো লাল টুকটুকে , ভয়ংকর । উনার কপালে কালো কাজলে আঁকা লম্বা রেখা । এই বয়সে এমন সেজেছেন কেন তিনি? তা বোঝার আগেই শাশুড়ি মার হুংকার ‘ না ডাকতেই চলে আসো কেন ??? কাজ কাম নাই ???’

মোহিনীর ইচ্ছা করে এসব কথার উত্তর দিতে ।কিন্তু পারেনা । নীলয় ইদানীং ব্যস্ত হয়ে গেছে ব্যবসার কাজে । আগের মতো ওরা আর ঘুরতে যায়না । রাত করে যখন ও বাসায় ফিরে তখন ওর ক্লান্ত মুখটা দেখে মোহিনীর আর ইচ্ছা হয়না তার দুঃখের কথার কীর্তন করতে । নিজেকে জলাঞ্জলী দিয়েও সবাইকে সুখে রাখার এক আপ্রাণ চেষ্টা করে মোহিনী ।

শায়লা ফুফু বেড়াতে আসার পর থেকে বাড়ির বেশ পরিবর্তন হয়ে গেলো । শায়লা ফুফুর খবার দাবার সব আলাদা । উনি নিজের রান্না নিজে করে খান । অন্য কারো ছোঁওয়া বারন । আর পরনে সব সময় ওই কালো কাপড় । মোহিনীর সাথে এই পর্যন্ত কথা বলেননি তিনি । মোহিনীর অবশ্য এতে অভ্যাস হয়ে গেছে । এই বাড়িতে কেউ প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেনা তার সাথে । কাজের মহিলা আছে একজন ফুলবানু খালা , আর নিচের দারোয়ান বরকত মিয়া । ওদের সাথেই শুধু মোহিনী নিজে থেকে কথা বলতে পারে । নীলয়ের ভালবাসার কাছে বাকি সব তুচ্ছ মোহিনীর কাছে । তাই সব সয়ে গেছে তার । খুব মন খারাপ হলে ছাঁদে উঠে হাঁটাহাঁটি করে ।

দুইদিন ধরে দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যা হতেই নীলয়ের মায়ের ঘরে দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । ভিতরে শায়লা খালা আর নীলয়ের বাবা মা কিসব করছে তা বোঝা মুশকিল ।ঘরের আলো কম । পুরো বাড়িটা কেমন থমথম করছে ।

মোহিনীর মাথা ধরেছে ভীষণ । এক কাপ চা খাওয়া দরকার । রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল সে। হটাৎ লোড শেডিং । পুরো বাড়ি অন্ধকার । নীলয়দের বাসাটা ডুপ্লেক্স । সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলে রান্নাঘর । অন্ধকারে সিঁড়িতেই হোঁচট খেলো মোহিনী । সে অবাক হচ্ছে এই ভেবে পুরো বাড়ি অন্ধকার তবুও নীলয়ের মায়ের ঘরের দরজা খুলছে না ।তারা ভিতরে চুপচাপ । অন্ধকারে হাতড়ে চার্জার লাইটটা খুঁজছে সে । ফুলবানু খালাকে ডেকে লাভ নেই । উনি এসময় পাশের বাসায় উনার বোন কাজ করে,ওখানে যায় গল্প গোজব করতে। মোহিনী চার্জার লাইটটা পাচ্ছে না ।

এমন সময় মনে হলো কে যেন মোহিনীকে জোরে ধাক্কা দিল …সে ছিটকে পরে গেলো মেঝেতে । ঠাণ্ডা দুইটা হাত । মোহিনী চিৎকার দিয়ে উঠলো কে কে এখানে ??? কোন উত্তর নেই । এমন সময় কারেন্ট চলে আসলো । পুরো ঘরে কাউকে দেখতে পেলনা মোহিনী ।

[ চলবে]

লেখিকা-মাহফুজা ইয়াসমিন নিপু

মন্তব্য
লোডিং...