এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

গল্প- পাষন্ড জগৎ সংসার

146

- Advertisement -

এইতো যেন সেদিনের কথা। জগতের আলোয় ঠুস করে পড়লাম ! এক মমতাময়ী উষ্ণ আদরে মুড়িয়ে বুকে ঠাই দিলেন। মাগো কি শীতগো কি শীত ! এতদিনতো বাপু কত আরামেই ছিলাম। কি দরকার ছিল ওখান থেকে টেনে হিচড়ে বের করার ! একসময় ঘুম ক্লান্ত আমি একটু সুখের উষ্ণতায় এক স্বপ্নপুরীতে ডুবে গেলাম। অদ্ভূত সুন্দর কোন জগৎ। যার বর্ণনা কোন কালেই কেউ দিতে পারবেনা।

অসহ্য জ্বালাময় ক্ষুধা আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিল ! মাগো কি কষ্ট গো ক্ষুধার ! এতদিন কি আরামেই না ছিলাম ! নিরাপদ সুখের সে রাজ্য। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, দুনিয়ার হূল ফুটানো যন্ত্রনা কিছুই ছুঁতে পারেনি আমায়। একটু একটু করে খাপ খাওয়াতে লাগলাম নতুন জগতের সাথে। সাদা কালো দৃষ্টিতে মধুর এক ভালোবাসা দৃষ্টিগোচর হল।

হুম তবে এ জগতেও এক স্বর্গীয় ভালোবাসা আছে গো ! পরম যত্নে, স্নেহে মমতাময়ী মা আমায় দুধ পান করিয়ে তৃপ্ত করলেন। আর সে কি আদর ! বুঝলাম আমার কান্না মায়ের বড় দুর্বলতা। আমার ক্ষুধা তৃষ্ণা সমস্ত কষ্টে বিচলিত মা আমায় ঘিরে থাকেন সবসময় যেন ওসব কিছু ছুঁতে না পারে আমায়। একেই বুঝি মায়ের ভালোবাসা বলে।

আমার কত জ্বালা কত কষ্ট মা সহ্য করেছেন ! মা শান্তিতে বসে কখনও একমুঠো খেতে পারেননি, এক প্রহর ঘুমোতেও পারেননি। মা সমস্ত কাজের মাঝেও আমার খেয়াল ঠিক ঠিক রাখতেন। সারাদিন খেটে মা রাত জেগে আমায় নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। কখনও ঘুম পাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পাড়াতেন, যখন ক্লান্ত মায়ের চোখদুটো লেগে আসতো তখনই যেন কাঁথা কাপড় নষ্ট করে মায়ের ঘুমের বারটা বাজাতাম। কতরাত মা আমার নষ্ট ভেজা যায়গায় শুয়ে আমাকে বুকে নিয়ে ঘুমাতেন যাতে আমার ঠান্ডা না লাগে ! শীত বর্ষায় মায়ের এ কষ্ট যেন আরো দ্বিগুণ হত !

গাঁয়ে যৌথ পরিবারে আমার বেড়ে ওঠা। মাকে দেখতাম সারাদিন খাটতেন তবু আমার বিরতিহীন দুরন্তপনাগুলো কিকরে যেন সামলে নিতেন। পরিপূর্ণ আদরে ভরপুর ছিল আমার শৈশব এবং কৈশরের অনেকটা সময়।

- Advertisement -

হঠাৎ সব ঠুনকো কাঁচের ন্যায় শেষ হয়ে গেল ! ব্যবসার জের ধরে বাবা শত্রুপক্ষের হাতে খুন হন ! মা যেন অতল দুখের সাগরে ভাসতে লাগলেন। তবে দাদা দাদী যতদিন ছিলেন মোটামুটি চলছিলো কিন্তু একদিন তারাও চলে গেলেন আমাকে আর মাকে সম্পূর্ণ একা করে ! চাচারা একদিন গাঁও ছেড়ে চলে গেল। কেউ আমাদের কথা ভাবেনি আমাদের বিপদে ফেলে যে যার জীবন নিয়ে বাঁচলো যেন।

মনে আছে, মা খালি নুন দিয়ে ভাত খেতেন আর আমায় একটি সিদ্ধ আলু চটকে অথবা একটি ডিম ভেজে অর্ধেক করে দুবেলা ভাত খাওয়াতেন। এত কষ্ট সহ্য করেও মা বাপ দাদার ভিটে আগলে থাকতে চাইলেন কিন্তু কিছু মানুষরুপী পশুর কুদৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে মা আমায় নিয়ে নানার বাড়িতে চলে এলেন। মামারাও বিয়ে করে যে যার সম্পত্তি বুঝে নানাকে একলা রেখে আলাদা হয়ে গিয়েছে ! নানি মারা যাবার পরে নানা কোনরকম একলা পড়ে ছিল ! এক প্রতিবেশী চাচী কোনরকম দুবেলা খাবার দিয়ে যেতেন বা রান্না করে দিতেন। আমরা আসার পরে নানার বেশ শান্তি হল আর আমাদেরও নিরাপদ আশ্রয় হল। এই চলছিলো ভালোই দিনগুলো।

যৌবনে পাঁ দেবার আগেই বিয়ে হয়ে গেল আমার। নানা বেঁচে থাকতেই তড়িঘড়ি করে বিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।যৌবনের প্রারম্ভে যখনও পর্যন্ত শিশুসুলভ আবেগ উৎকন্ঠা রয়ে গিয়েছিল আমার ভেতরে তখন নিজেই মা হয়ে গেলাম। জীবন সংসার কি জিনিস বুঝে উঠতে পারিনি তবু একে একে পাঁচ সন্তানের মাও হয়ে গেলাম। বহু ত্যাগ তিতিক্ষার মাঝে কতগুলো সময় চলে গিয়েছে তাও বাপু টের পাইনি। জীবন ছায়াহ্নে এসে ভরপুর সংসারটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল গো ! ছেলে মেয়েগুলো নিজের পাঁয়ে দাঁড়িয়ে বিয়ে থা করে সব দূরে চলে গেল। কেন গো আমরা বুঝি একসাথে মিলেমিশে সুখ দুখ ভাগাভাগি করে সংসার করিনি গো? তাতে কি আমরা সুখে ছিলামনা গো?!

আজ ওরা সবাই খুব ব্যস্ত ! সুযোগ পেলে মাঝে মাঝে খোঁজ নেয় বেঁচে আছি নাকি মরে পঁচে গেছি !
কত যত্নে তোমার আমার সংসারটা সাজিয়েছিলাম যেখানে সবাই ছিল। কত স্নেহে ওদের বড় করেছি তবু কেন সব ভুলে ওরাও যন্ত্র মানব বনে গেল গো? যাক ওরা ভালো থাকলেই আমরা খুশি।

খোদার দরবারে শুকরিয়া যে তুমি আজো আমায় ছেড়ে যাওনি গো ! ( মুখে পান পুরে একগাল হাসি দিয়ে…)
রোজ আমার দুখের প্যানপ্যানানি, কোমর আর বাতের ব্যাথার গোঙ্গানি সহ্য করেও কুঁচকানো হাতদুখানা ধরে রেখেছো ! ( হঠাৎ বুকের বাঁ পাশে তীব্র এক ব্যাথা অজানা হাহাকারে মোচর দিয়ে উঠল ! সুরমা জড়ানো ডাগর চোখদুটো অশ্রুজলে ভিজে গেল…)

আচ্ছা হ্যাঁ গো ইমনের বাবা, আমি আগে যাব নাকি তুমিই আমায় একলা ফেলে চলে যাবে গো !? আমি আগে গেলে তোমার খেয়াল কে রাখবে, আর তুমি আগে গেলে আমি একলা কিকরে থাকবো গো !? ( হাতদুটো শক্ত করে ধরে ) বড্ড পাষান্ড জগৎ সংসার !

মন্তব্য
লোডিং...