এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

তামাম শুদ রহস্যঃ দ্যা সম্যারটন ম্যান

ওমর খৈয়ামের ”রুবাইয়াৎ” বই এর সাথে সম্পর্কিত তামাম শুদ এমনই জটিল এক কোড, যেটা ভেঙ্গে রহস্য উদ্ঘাটন ৭০ বছরেও সম্ভব হয় নি।

“তামাম শুদ কেস” অনেকের মাঝে “দ্যা সম্যারটন ম্যান কেস” হিসেবেও বেশ জনপ্রিয়। অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবথেকে দীর্ঘস্থায়ী অমীমাংসিত রহস্যের স্থান দখল করে আছে। এই কেসটি এতটাই জনপ্রিয় যে স্টিফেন কিং “কলোরাডো কিড” বইয়ে এটির কথা উল্লেখ করেছেন। এমনকি জনপ্রিয় টিভি সিরিজ “হ্যাভেন”-এর একটি অংশ এই মামলার উপর ভিত্তি করে তৈরি।

চিত্রঃ X চিহ্নিত স্থানে দ্য সম্যারটন ম্যানকে পাওয়া যায়। (সোর্সঃ historicmysteries.com)
চিত্রঃ মৃত দ্য সম্যারটন ম্যান (সোর্সঃ theunredacted.com)

মুল ঘটনার সুত্রপাত ১৯৪৮ সালের ১লা ডিসেম্বর। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে সম্যারটন বিচে এক অচেনা মানুষের মৃতদেহ পাওয়া যায়। মৃতদেহ দেখে ঠিক স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না যে মানুষটিকে কি হত্যা করা হয়েছে, নাকি আত্মহত্যা করেছেন, নাকি স্বাভাবিকভাবেই মারা গেছেন। ইনভেস্টিগেশনে উঠে আসে ঠিক তার আগের রাতে, অর্থাৎ ৩০শে নভেম্বর রাতে, অন্ততপক্ষে দুজন পথচারী সমুদ্রের পাড়ে একজন লোককে বসে থাকার কথা বলেছিলেন। তাদের ভাষ্যমতে যেখানে সম্যারটন ম্যানকে সকালে মৃত পাওয়া যায়, ঠিক সেই যায়গার কথাই তারা বলেছেন। সাক্ষীরা অবশ্য বলছেন যে তারা রাতে তাকে খুব ভালভাবে দেখতে পারেন নি, তবে যে লোকটা মারা গেছে, তিনি কিছুটা এরকমই। সন্ধ্যা ৭ টার দিকে তাকে বিচের আশেপাশেই ঘুরতে দেখা যায়। তবে সাড়ে সাতটা থেকে আটটার মাঝে তাকে সেখানে বসেই থাকতে দেখা যায়, এমনকি কোন গোলযোগও শুনতে পাওয়া যায় নি। একজন সাক্ষী অবশ্য বিস্ময়ের সাথে বলেছিলেন, তিনি তখনও বেঁচে ছিলেন, আমি ভেবেছিলাম তিনি হয়ত মাতাল।

সেদিন ভোরের দিকে একজন পথচারী পুলিশকে খবর দেন যে একটি মৃত লোক বিচে বসা অবস্থায় পাওয়া গেছে। লোকটির পরনে ছিল সুন্দর একটি স্যুট, যা অন্তত তার সামাজিক মর্যাদা নির্দেশ করতে যথেষ্ট ছিল। তার কানের উপরে একটি দামী ব্রিটিশ ব্র্যান্ডের সিগারেট ছিল, যা তখনও অস্ট্রেলিয়াতে বিক্রি হত না। ঐ একই ব্র্যান্ডের আরেকটি অর্ধপোড়া সিগারেট তার চিবুক এবং কলারের এর মধ্যে গোজা ছিল। অবে রহস্যজনক আবিষ্কার ছিল সিগারেটের প্যাকেটগুলো, তিনি একটি সস্তা ব্র্যান্ডের প্যাকেটে করে সেগুলো নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। এছাড়াও লোকটির পকেটে পাওয়া যায় এক বাক্স ম্যাচ, গ্লেনেলগে (Glenelg-দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার একটি শহর) যাওয়ার একটি বাস টিকেট যেটি ব্যবহৃত এবং হেনলি বিচে যাওয়ার একটি অব্যাবহৃত ট্রেন টিকেট।

চিত্রঃ বামে ওমর খৈয়ামের “রুবাইয়াৎ” বইয়ের ছেঁড়া পাতা ও ডানে পকেট থেকে পাওয়া বইয়ের অংশ (সোর্সঃ ciphermysteries.com)

লোকটির পোশাক থেকে সকল নেভিগেশন ট্যাগ মুছে ফেলা হয়েছিল, যার কারনে তাকে সনাক্তকরণ কঠিন হয়ে যায়। তার মাথায় কোন হ্যাট ছিল না এবং তার ব্যাবহৃত জুতা ছিল সন্দেহজনকভাবে পরিষ্কার। পরবর্তিতে আরেকটি খুব রহস্যময় এভিডেন্স পাওয়া যায় লোকটির প্যান্টের লুকানো পকেট থেকে। সেখানে কোন বই থেকে ছেঁড়া এক টুকরো কাগজ ছিল, যার উপর লেখা ছিল “Tamam Shud”। ফার্সি ভাষায় এই শব্দের অর্থ দাঁড়ায়, “The End”। আর কাগজটির পিছনের অংশে কিছু লেখা ছিল না। কিন্তু পুলিশ এই কাগজের উপর ইনভেস্টিগেশন করে ওমর খৈয়ামের কবিতার বই “রুবাইয়াৎ” এর সন্ধান পায়।

তারও কিছু পরে বেশ কিছু অনুসন্ধানের পর, এই কাগজটি কোন বই থেকে ছেড়া সেটির সন্ধানও পুলিশ পায়। তবে যার গাড়ির পেছনের সিটে এই বইটি পাওয়া যায়, তার ভাষ্যমতে এটা ওখানে কিভাবে এলো তা তার জানা ছিল না। বইয়ের পিছনে পেন্সিলে লেখা নিম্নোক্ত অনুক্রম ছিল। পুলিশ মনে করে এটি একটি কোড হতে পারে, কিন্তু এখনও সেই কোড ভাঙ্গা সম্ভব হয় নি। একই সাথে দ্বিতীয় সিরিজের স্ট্রাইকথ্রুটি দেখতেও একটি তালিকার মত মনে হয়।

চিত্রঃ বইয়ে লিখিত কোড (সোর্সঃ theunredacted.com)

বইয়ের পেছনে আরো একটি মহিলার ফোন নাম্বার লিখিত ছিল। মহিলাটি যেখানে সম্যারটন ম্যান-কে পাওয়া যায় সেই জায়গাটির কাছাকাছিই বাস করত ও কাজ করত। নিরাপত্তার স্বার্থে মহিলাটির পরিচয় পুলিশ গোপন করে ও তাকে একটি ছদ্মনাম দেয় – জেস্টিন। জেস্টিন এর কাছেও একসময় একটি  “রুবাইয়াত” এর একটি কপি ছিল ও তিনি তা একজন লোককে দিয়েছিলেন। পুলিশ অনুসন্ধান করে সেই লোককে পায়। তার কাছে তখনও সেই বইটি ছিল, যেটি কোন অস্বাভাবিক ব্যপার ছিল না। পুলিশ সেই মহিলা ও লোকটিকে সম্ভাব্য আসামীর তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয় এবং এই বইটিও খারিজ করে দেয়। এজাহারে বলা হয়েছিল এই মামলার সাথে তাদের কোনো যোগসুত্র আছে এমন কোন প্রমাণ নেই। তবে ধারণা করা হয় যে এই বইটিই কোড ভাঙ্গার জন্য প্রয়োজনীয়, তবে আজ পর্যন্ত এই কোড ভাঙ্গা সম্ভব হয় নি।

এগুলো মিস করা ঠিক হবে না!
1 এর 4

যে সময় পুলিশ ইনভেস্টিগেশন করছিল, অপ্রত্যাশিত কয়েকটি লিড তাদের হাতে আসে যেখানে অনেক মানুষই দাবী করে বসেন যে সম্যারটন ম্যান একজন নিখোঁজ ব্যাক্তি ছিল। প্রত্যেকটি কেসে পুলিশ আলাদা আলাদাভাবে ইনভেস্টিগেশন করে তাদের দাবীকে ভুল প্রমাণিত করে যে, তারা যে হারানো ব্যাক্তির কথা বলছে সে সম্যারটন ম্যান নয়। ঘটনা ধীরে ধীরে এমন দাঁড়ায় যে বেশ কিছু হারানো ব্যাক্তি নিজেরাই পুলিশ স্টেশনে এসে জানিয়ে দিয়ে যান যে তারা সম্যারটন ম্যান নন।

সম্যারটন ম্যান এর অটোপসি বা ময়নাতদন্তে আরো রহস্যময় জিনিস পাওয়া যায় – শরীরে তার মৃত্যুর কারণের কোন প্রমাণই ছিল। মানুষ ছিল পাঁচ ফুট এগার ইঞ্চির মত, সবুজ চোখ এবং মাথায় ছিল বাদামী-লাল চুল। তিনি চমৎকার স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। ধারণা করা হয় তিনি সম্ভবত কোন ক্রীড়াবিদ, নৃত্যশিল্পী বা একজন রানার ছিলেন, কিন্তু তার হাত পরীক্ষা করে এটা নিশ্চিত করা হয় যে তিনি কোন শ্রমিক ছিলেন না। ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার বলেন যে এটি কোন বিশেষ ধরনের বিপজ্জনক বিষ হতে পারে, তবে তা এমন সাধারণ ময়নাতদন্তে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। তিনি বলেন যে এটি একটি প্রাকৃতিক মৃত্যু হতে পারে, যদিও তিনি মূল কারণ খুঁজে পান নি। তবে কোনও ভাবেই লোকটি আত্মহত্যা করেছিলেন কিনা নাকি প্রাকৃতিক কারনেই মারা গেছেন তা জানার কোন উপায় ছিল না। এমনকি তারা তার শরীরে কোন বিষ পাননি, তাই এটিকে মার্ডারও বলতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর কোন কারণ নির্ধারিত হয়নি।

চিত্রঃ টেন স্টেশনে পাওয়া লাগেজ (সোর্সঃ theunredacted.com)

লোকটির শনাক্তকরণের অভাব নাটকীয়তার সৃস্টি করতে পারে, যেমন তিনি ছিলেন একটি গুপ্তচর যার পরিচয় আর পাওয়া যাবে না – তার সিগারেট এই থিওরি শক্তিশালী করে, – তবে ঘটনা নাটকীয় না হয়ে জাগতিকও হতে পারে, যেমন হয়ত তিনি তার ঘরে তার আইডি ভুলে ফেলে এসেছিলেন। তার ওয়ালেটে খুব কম টাকা পাওয়া যায়, যা আত্মহত্যার প্রমানে একটি ভাল ইঙ্গিত ধরা হয়, কিন্তু তিনি এক দিনের ট্রিপ হিসাবে সঙ্গে সামান্য টাকা আনতেও পারেন। তবে এই ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হয়, কারন তার ফিজিক দেখে বোঝা যায় যে তিনি অবশ্যই কোন স্থানীয় লোক ছিলেন না এবং এখানে হয়ত এক মাসের জন্য এসেছিলেন এবং দুই সপ্তাহ পরে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়।

এডিলেডের ট্রেন স্টেশন থেকে পুলিশের কাছে একটি স্যুটকেস দেওয়া হয় যেটা মৃত্যুর আগের দিনে লোকটি কোটরুমে রেখে গেছে। এটি উল্লেখ করা উচিত যে মৃত্যু রাত ২ টায় দেওয়া হয়েছিল। স্যুটকেসে একটা স্যুট জ্যাকেট, স্টেনসিলিং ব্রাশ, কাফ প্যান্ট যার ভাজে ছিল বালি, স্ক্রু ড্রাইভার, কেঁচি যার আগায় ছিল তীরচিহ্নযুক্ত পয়েন্ট, দড়ি, পায়জামা, আন্ডারওয়্যার, ড্রেসিং গাউন, শেভ করার জিনিসপত্র, স্যান্ডেল, ছুরি এবং লন্ড্রি ব্যাগ। পোশাকের একমাত্র লেবেল লেখা ছিল T. Keane। তবে একটিতে বানান লেখা ছিল Kean।আর সবগুলো ছিল ড্রাই ক্লিন করা। তবে ইনভেস্টিগেশনে এই এলাকার অধিবাসী কোন Keane বা Kean এর সাথে এই মামলার কোন সংযোগ পাওয়া যায় নি। আশ্চর্যজনকভাবে জ্যাকেটটি সরাসরি আমেরিকার দিকে আঙুল তুলেছিল। ব্রিটিশ সিগারেট এবং একটি আমেরিকান জ্যাকেট এই মানুষটিকে মৃত কোন জেমস বন্ড করে তুলেছিল। দুর্ভাগ্যবশত, তারা সম্যারটন বন্ডের জ্যাকেট থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার একটি সঠিক অবস্থান ট্রেস করতে সক্ষম ছিল না।

চিত্রঃ সম্যারটন ম্যান এর টাই ও ট্যাগ (সোর্সঃ www.historicmysteries.com)

পরিশেষে বলা যায় তামান শুদ কেসের দুটি জিনিস আমাদের সামনে পরিস্কার করে। কখনো কখনো অসংখ্য এভিডেন্সও আমাদের শূন্যে নিয়ে যেতে পারে। আবার কখনো কখনো কোন এভিডেন্সের অভাবও সন্দেহের দেয়াল ভেঙ্গে দিতে পারে। এমনকি তার মৃত্যুর স্থানও অনিশ্চিত, কারণ কেউ কেউ মনে করেন যে সম্যারসেট ম্যান সেখানে মারা গিয়েছিল, তার ও তার দেহের নিকটে বমি থাকা উচিৎ ছিল। এই কেস সম্পর্কে যা কিছু জানা যায় সবকিছুই এটাকে আরও রহস্যময় করে তোলে। আর প্রায় ৭০ বছর পরেও এর রহস্য সমাধান করা সম্ভব হয় নি।

নিচে কমেন্টে লিখে ফেলুন এই লোকটির ব্যাপারে আপনার মতামত।

আর লাইক করুন বাংলাহাব-এর ফেইসবুক পেজ ও সাথেই থাকুন। হাজারও ক্লিকবেইট ও অশ্লীল সাইটের ভীড়ে একমাত্র বাংলাহাব-ই আপনাকে পরিচ্ছন্ন ও তথ্যমূলক কন্টেন্ট বাংলায় দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বিশ্বাস না হলে আমাদের সাইটটি ঘুরেই দেখুন। ধন্যবাদ।

মন্তব্য
লোডিং...