এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

সহজ মেহেদি ডিজাইনে রাঙিয়ে তুলুন নিজেকে

Hena or Mehedi Design for Beautification

আবহমান কাল ধরে বাংলার মেয়েরা হাত রাঙাতে মেহেদি ব্যবহার করে। অতি প্রাচীন কাল থেকেই বিয়ে, হলুদ, ঈদ, পুজো সহ যেকোনো উৎসব-পার্বণে মেহেদি দিয়ে হাতে আলপনা আঁকে।

শুরুতে গাছের মেহেদি বেটে হাতে দেওয়া হতো। সেক্ষেত্রে খুব বেশি ডিজাইন করা যেত না। সময়ের সাথে সাথে ডিজিটালাইজেশনের ফলে এলো টিউব মেহেদি। প্রথম দিকে প্রাকৃতিক মেহেদিই খুব মিহি মিক্সচার করে টিউবের মাধ্যমে বাজারজাত করা হয়েছিল। যাতে করে চমৎকার সব ডিজাইন করা সম্ভব হতো। বর্তমানে নির্দিষ্ট কিছু ব্র‍্যান্ড বাদে বেশিরভাগ কোম্পানিই ক্যামিক্যাল পণ্য ব্যবহার করে মেহেদিতে।

বর্তমান সময়ে ঈদের আগের দিন রাতে, পুজো উপলক্ষে, বিয়ে, কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়া, এমনকি ভ্রমণে যাওয়ার আগেও মেয়েরা হাতে বা পায়ে মেহেদি পরতে পছন্দ করে। স্মার্ট ও রুচিশীল মেয়েরা চায় মেহেদির নকশাটা যেন অন্যদের চাইতে আলাদা হয়।

সুন্দর করে আকর্ষণীয় নকশা এঁকে মেহেদি সবাই দিতে পারেন না। ঈদের আগের রাতে তাই বিশেষ নকশাকারের ঘরে ভীড় জমে আশেপাশের বাসার বাচ্চাদের। ঈদ উপলক্ষ্যে কিশোরী মেয়েরা মেহেদি দেওয়ার জন্য তার কাছেই যায়, যিনি অভিনব উপায়ে নিখুঁতভাবে ভিন্নধর্মী নকশা করে মেহেদি দিয়ে দিতে পারেন। তবে এখনকার সময়ে সবারই সময়ের মূল্য আছে। তাই আজকের ফিচারে আমরা নিয়ে এসেছি আকর্ষণীয়, সহজ ও ভিন্নধর্মী কিছু মেহেদি ডিজাইনের ছবি। যেগুলো দেখে আপনিও করতে পারবেন সুন্দর ডিজাইন। সেই সাথে সহজ মেহেদি ডিজাইন, নতুন মেহেদি ডিজাইন, বাচ্চাদের মেহেদি ডিজাইন, পায়ের মেহেদি ডিজাইন, স্টোরি টেলিং মেহেদি ডিজাইন, মেহেদি ডিজাইন বই, ছেলেদের মেহেদি ডিজাইন, মেহেদি ডিজাইনার, একজন মেহেদি ডিজাইনারের সাক্ষাতকার সহ মেহেদি ডিজাইনের আনুষঙ্গিক সমস্ত বিষয়।

সহজ মেহেদি ডিজাইন

অনেকেই হাতে মেহেদির আলপনায় নিজেকে রাঙাতে পছন্দ করেন। কিন্তু নিজে মেহেদি ডিজাইন করতে পারেন না। তাতে কী? ইন্টারনেটের এই যুগে আপনি চাইলেই খুঁজে পাবেন অতি সহজেই নকশা করার উপায়। কিছু উপকরণ ব্যবহার করে সহজ ডিজাইন করা যায়। তার মধ্যে কটনবাড অন্যতম। কটনবাডের সাহায্যে সুন্দর নকশা করে ফেলতে পারবেন।

টিউব বা কোণ মেহেদি ছোটো ছোটো ফোঁটা দিয়ে, কটনবাডের সাহায্যে মেহেদি ফোঁটার একদিকে আলতোভাবে টেনে টেনে চমৎকার নকশা করা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে যেসব নকশা করা সম্ভব সেটা অবশ্য লিখে বোঝানে যাবে না। তাই আমরা কিছু লিংক এড করে দিচ্ছি, যেখানে ছবিভিডিও এর সহায়তায় বেশ ভালো আইডিয়া পাবেন। সেই সাথে নিজের মতো করে আলাদা কিছু করার স্পৃহাও তৈরি হবে৷

এছাড়াও সহজ মেহেদি ডিজাইন এর ছবিগুলো দেখে নিতে পারেন। একটু চেষ্টা করলেই এগুলো দেখেই এঁকে ফেলতে পারবেন মনমতো ডিজাইন।

বাচ্চাদের মেহেদি ডিজাইন

মেহেদি পরা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস থাকে ছোট বাচ্চাদের। কার ডিজাইন কত দুন্দর তাই নিয়ে নিজেদের মধ্যে চলে তুমুল প্রতিযোগিতা।

ঈদ এলে বড়দের চেয়ে বাচ্চাদের মেহেদি নিয়ে উৎসাহ থাকে সবচেয়ে বেশি। ঈদের যতো দিন বাকি থাকে না কেন বাচ্চাদের বায়না থাকে আগে আগে মেহেদি কিনে দেওয়ার। সে না হয় হলো। কিন্তু বাচ্চাদের মেহেদি দিয়ে দেবেন কীভাবে?

শিশুরা যেহেতু অস্থির হয়, অসাবধানতায় যাতে শিশুদের হাতের মেহেদি নষ্ট না হয়ে যায়, সেদিকে খুবই খেয়াল রাখতে হবে। হাত ভর্তি মেহেদি দেওয়ার আগে সামান্য মেহেদি লাগিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখা যায়। কেননা অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় মেহেদি লাগানোর সাথে সাথে আপনার ছোট সোনামনি হাত ধুয়ে ফেলতে চাচ্ছে। তাই কিছু সময় অপেক্ষা করে, বাচ্চা ঘুমিয়ে গেলে সুন্দর করে মেহেদি লাগিয়ে দিন।

বড়দের তুলনায় বাচ্চাদের মেহেদি ডিজাইন একটু আলাদা ধরনের করতে হয়। যেহেতু তাদের হাত আকারে ছোটো হয়ে থাকে। তাই তাদের হাতে রাউন্ড বা চৌকোনা ধরনের ডিজাইন বেশি ফোটে।
ফুল, পাখি, ঈদের চাঁদ, নামের আদ‌্যক্ষর, ঈদ মোবারক- লেখাসহ বিভিন্ন ডিজাইন, যে শিশু যেটা পছন্দ করে, সেটা অনুযায়ী আলপনা করতে পারেন।

ছোট হাতে লম্বালম্বি নকশা ভালো মানায়। হাত ভর্তি করে ভরাট নকশা না দিয়েও ছোট হাতটা ভরাট দেখানোর জন্য ছোট ছোট করে কয়েকটি নকশা করা যেতে পারে।

বাচ্চাদের হাতের তালুতে করা যায় ছোট মোটিফের একটা নকশা। আঙ্গুলে হবে সুন্দর ও মানানসই ছিমছাম ডিজাইন।

ছেলেদের মেহেদি ডিজাইন

ছেলেরা সাধারণ মেহেদি না পরলে বিয়ে বা বিশেষ উপলক্ষে কেউ কেউ ছেলেদের মেহেদি পরতে হয়। ছেলেদের হাতে যেহেতু সব ধরনের ডিজাইন মানানসই হয় না, সেহেতু তাদের জন্য চৌকো ধরনের ডিজাইন করা যেতে পারে। ফুল লতা পাতা ধরনের মেয়েলি ডিজাইন না করে একটু ভিন্নধর্মী বিভিন্ন শেপ, প্রিয় ব্র‍্যান্ড দল, ক্রিকেট বা ফুটবল দলের লোগো আঁকা যেতে পারে ট্যাটুর মতো করে। তাহলে ডিজাইনটা বেশ স্টাইলিশ হবে।

পায়ের মেহেদি ডিজাইন

ঈদের সময় দেখা যায় অনেকেই পায়ে মেহেদির ডিজাইন করতে। এছাড়াও ভ্রমণ পিয়াসু মেয়েরা বিভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে যাবার আগে পায়ে মেহেদি পরে যেতে পছন্দ করে। সৌন্দর্যের মধ্যে সুন্দর পদচিহ্ন রেখে আসাই সম্ভবত তাদের উদ্দেশ্য।
পায়ে মেহেদির ডিজাইন স্বভাবতই আলাদা হয়৷ কারণ পায়ের আকৃতিটাই আলাদা। যার ফলে ডিজাইনটাও সেভাবেই করতে হয়। নইলে সুন্দর লাগার পরিবর্তে হিজিবিজি দেখাবে৷

মেহেদির ধরণ

এবারে মেহেদির কিছু প্যাটার্ন বা ধরন নিয়ে আলোচনা করা যাক। মেহেদি লাগানোর কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। মান্ডালা বা গোল ধরনের ডিজাইন করলে হাতের মাঝখান থেকে করা হয়। আর হাত ভর্তি করে মেহেদি পরলে হাতের যে পর্যন্ত মেহেদি পরা হবে, সেখান থেকে আলপনা করতে শুরু করা হয়।আধুনিক সময়ের অভিজ্ঞ নকশাকাররা কিছু আকৃতির উপর ভিত্তি করে পুরো নকশাটা ফুটিয়ে তোলেন। সেসবের বর্ণনা নিচে করা হলো।

হার্ট চিহ্ন দিয়ে মেহেদি ডিজাইন

আপনার হাতের মেহেদি ডিজাইনটি প্রিয়জনকে ডেডিকেশন করতে করতে চাচ্ছেন? তাহলে ❤️ চিহ্ন দিয়ে করতে পারেন। চাইলে সেখানে নিজের প্রিয়জনের নামও লিখতে পারেন।

মান্ডালা ডিজাইন

মান্ডালা আর্ট ব্যতিক্রমী একটি আর্ট। বাংলাদেশে এই আর্টের পরিচিতি কম। মান্ডালা মানে হলো আত্মা। আত্মার জন্য একটি কেন্দ্রস্থল স্থান যা ব্যাধি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি আর্ট থেরাপির সরঞ্জাম। মান্ডালা হলো ‘ম্যাজিক সার্কেল’-এর সংস্কৃত শব্দ। প্রায় প্রতিটি সংস্কৃতি তাদের সাংস্কৃতিক বা আধ্যাত্মিক অনুশীলনে মান্ডালা বা বৃত্তাকার চিত্র ব্যবহার করে। শিল্পটি প্রাচীন ২ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। এখন মেহেদি ডিজাইনাররা মেহেদি দিয়ে মান্ডালা ডিজাইনের কাজও করতে পছন্দ করছেন।

ময়ূর ডিজাইন

হাতের সামনে বা পিছনে ময়ুরের মতো করে নকশা করা হয় এই ডিজাইনে। হাতের তালুতে বা পিঠে পেখম মেলা ময়ূর কিংবা ময়ূরের পালকের থিম নিয়ে আলপনা করা হয়। এই নকশা কে কলকি নকশাও বলা হয়।

পেইসলি ডিজাইন

ছোট ছোট সূক্ষ্ম নকশা একসাথে জোড়া দিয়ে পেইসলি ডিজাইন করা হয়।

ফ্লোরাল নকশা

নানান ফুলের নকশায় এটি করা হয়, তাই এর নাম ফ্লোরাল ডিজাইন। পদ্ম, শাপলা, গোলাপ, কাঠগোলাপ সহ বিভিন্ন ধরনের ফুল এঁকে নিয়ে তারপর অন্যান্য ডিজাইন করা হয় ফ্লোরাল নকশায়।

লাইনস এন্ড প্যাটার্নস ডিজাইন

ফুল ,লতাপাতা না আকতে চাইলে শুধু মাত্র লাইন টেনে বা প্যাটার্ন একেও নকশা করতে পারেন। ছেলেদের হাতেই এই ধরনের ডিজাইন বেশি ভালো লাগে।

বর্ডার ডিজাইন

খুব ভারি নকশা অনেকেই করতে চান না, হাতের বা পায়ের বর্ডারে সিম্পল ডিজাইন করতে পছন্দ করেন। তারা এই বর্ডার ডিজাইন করেন।

শোল্ডার মেহেদি ডিজাইন

হাত বা পায়ের সাথে সাথে অনেকেই এখন বাজুতে পিঠে , শোল্ডারেও মেহেদি দিয়ে নকশা আঁকছেন । বিশেষ করে স্লিভলেস ড্রেস বা ম্যাগি হাতার সাথে দারুন মানিয়ে যায় এই ডিজাইন। ছেলেরা নিজের পছন্দমতো লোগো আঁকতে চাইলে শোল্ডারে বা পিঠে এঁকে নিতে পারেন।

ব্রাইডাল মেহেদি

সর্বশেষে বলবো ব্রাইডাল মেহেদি সম্পর্কে।
বিয়ের কনে মানেই হাত ভরা মেহেদি। নতুন বউ দের কনুই পর্যন্ত মেহেদি দেওয়ার রেওয়াজ চলছে এখন। হাতের উপরে নিচে হাত ভর্তি করে করা হয় নানান রকম হাজার বুটির আকর্ষণীয় নকশা। হাতের তালু থেকে আঙ্গুলের অংশ সাথে কনুই পর্যন্ত ভিন্নধর্মী কত যে নকশা করা হয়। হাত ভর্তি মেহেদি ছাড়া বিয়ের সাজ যেন পরিপূর্ণই হয় না।

###

কোথা থেকে করাবেন নতুন মেহেদি ডিজাইন

অনেক ধরনের ডিজাইন সম্পর্কে ধারণা দিলাম লেখায়। কেউ চাইলে নিজের পছন্দ অনুযায়ী আলপনা করে নিতে পারেন। এছাড়াও যদি চান প্রফেশনাল মেহেদি ডিজাইনার দিয়ে হাত ভর্তি করে আলপনা করতে চান, সেক্ষেত্রে নিকটবর্তী পার্লারে যোগাযোগ করতে পারেন।
তবে বর্তমান সময়ে শুধু মেহেদি আলপনা করাটাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন অনেক ডিজাইনার।

তেমনই কয়েকটি পেইজের নাম উল্লেখ করছি।

১. Dola’s Mehedi
https://www.facebook.com/587349728616324/videos/187688709805814/

২. মেহেদি ডিজাইন
https://www.facebook.com/%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B9%E0%A7%87%E0%A6%A6%E0%A6%BF-%E0%A6%A1%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%A8-277919319375551/

৩. Best henna design – সেরা মেহেদি ডিজাইন
https://www.facebook.com/303844896755667/posts/1025567707916712/

৪. Mehedi design by Ratri
https://www.facebook.com/104085420936911/posts/434279417917508/

৫. Tasnim’s Henna Artwork
https://www.facebook.com/109684704193164/posts/226635862498047/

মেহেদি ডিজাইনারের সাক্ষাৎকার

এমনই একজন মেধাবী মেহেদি আলপনাকারের সাক্ষাৎকার উপস্থাপন করছি আপনাদের সামনে। যিনি চমৎকার মেহেদি ডিজাইন করেন। নিয়মিত ডিজাইন করে যথেষ্ট টাকা উপার্জনও করছেন। পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি খুলনাবাসী মেহেদি ডিজাইনার নাসরিন জাহান রীতুর সাথে। আজ শুনবো মেহেদি দিয়ে মানুষকে রাঙানোর গল্পের আদ্যোপান্ত। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মাদিহা মৌ।

মাদিহা : কেমন আছেন?

রীতু : আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?

মাদিহা : আলহামদুলিল্লাহ ভালো। মেহেদি নিয়ে কাজ করার শুরুটা সম্পর্কে বলুন প্লিজ।

রীতু : আমি নিজে ছোটবেলা থেকে মেহেদি পরতে ভালোবাসি। সেই ভালোবাসা থেকেই নিজে নিজেই মেহেদি পরার শুরু। আমার হাত খুব একটা ফাঁকা থাকতো না কখনো। বাসায় কেউ এলে আমি নিজে থেকেই তাদের মেহেদী পরিয়ে দিতাম। বান্ধবীরা পরতো আমার কাছে মেহেদি পরতে আসতো।

তো একদিন আমাকে আমার আম্মু মজা করে বলছে, এই যে ২-৩ ঘন্টা বসে মেহেদি পরাও এটা তো অনেক কষ্টের। তুমি তো কিছু সম্মানি নিতে পারো। আমি হাসলাম। আসলে আমার খুব লজ্জা লাগতো যে মেহেদি পরিয়ে টাকা কীভাবে নেবো।

মাদিহা : তারপর লজ্জাটা কীভাবে ভাংলো?

রীতু : এরপর ২০১৮ সালে রোজার ঈদের আগে খুলনার একটা গ্রুপে দেখি মেহেদি ইভেন্ট হবে এবং তারা মেহেদী আর্টিস্ট ও খুঁজছে। আমি যখন পোষ্টটা দেখি, তখন ওদের অলরেডি সব আর্টিস্ট সিলেক্ট হয়ে গেছে। কিন্তু একজন এডমিন পার্সোনালি আমাকে বলেন যে আমার কাজ তাদের খুব পছন্দ হয়েছে। পরবর্তীতে কোনো ইভেন্ট করলে তারা আমাকে নক করবে।৷ আমিও আর কথা আগাই না। তার দুইদিন পর যখন তাদের ইভেন্ট শুরু হয়, তখন সকাল ১০ টার দিকে আমার ফোনে আননোন নাম্বার থেকে একটা কল আসে। (আমি সেই এডমিন কে নাম্বার দিয়েছিলাম)

আমাকে তিনি বলেন, ‘আপনি কি ফ্রি আছেন, একটু আসতে পারবেন? আমাদের আর্টিস্ট কম হয়ে গেছে। আমরা যা ধারণা করেছিলাম, ইভেন্টে তার চেয়েও অনেক বেশী লোক এসেছে।’
হঠাৎ আমিও একটা চিন্তায় পড়ে যাই। কারণ বাসায় আগে কিছুই জানাইনি, আমার হাজবেন্ডকে জানালাম। সে বললো, ‘গিয়ে দেখোই না কেমন।’

যেহেতু আমি এর আগে কখনো বাইরে কাজ করিনি। আমার নিজের ও কিছুটা অস্বস্তি হচ্ছিলো। তখন আমি ওদের জানালাম আমি যাব। আমার কোনো ধারণাই ছিলোনা ইভেন্ট সম্পর্কে।

ওটা ছিলো ১০০ টাকার ইভেন্ট।
আমি প্রথম ক্লায়েন্ট নিলাম আমি তার কনুই থেকে শুরু করলাম। যেটা হলো ব্রাইডাল। দেড় দুই ঘন্টা বসে ১০০ টাকায় আমি তাকে ব্রাইডাল মেহেদি পরালাম। এদিকে অন্যান্য আর্টিস্টরা ততোক্ষণে ৩-৪ টা কাজ শেষ করে ফেলেছেন। তখন ইভেন্টের আয়োজকরা আমাকে অনেক ইশারা দিয়েছেন, কিন্তু আমি কিছুই বুঝিনি।
পরে দেখি ২-৩ জন দাঁড়িয়ে আছে ১০০ টাকায় ব্রাইডাল পরবে।

 

তখন একজন আয়োজক আমাকে ডেকে নিয়ে বুঝিয়ে দিলো যে ইভেন্টে কিভাবে মেহেদি দিতে হয়। ১০০ টাকার মেহেদী কেমন হয়। ততোক্ষণে আমি ২ জনকে ব্রাইডাল পরিয়েছি ২০০ টাকায়।
ব্যাপারটা বুঝতে বুঝতেই প্রায় বিকাল। রোজার দিন, আমার কাছে আমার ফ্যামিলি সব সময় আগে। আমি ওদের বলে রেখেছিলাম আমি বাসায় যেয়ে ইফতারি করবো। দেরি করলেও হয়তো কিছু বলতো না। কিন্তু আমি চাইনি আমার বর একা ইফতারি করুক। আর যেহেতু হঠাৎ করে উনারা আমাকে ডেকেছে তাই আমি বাসায় ও কোনো কিছু গুছিয়ে রেখে যেতে পারিনি। তাই ফিরে আসতে হয়েছে আমাকে।

মাদিহা: মেহেদি পরিয়ে প্রথম ইনকাম কত ছিলো?

রীতু :সেদিন আমি ৪০০ টাকা ইনকাম করেছিলাম। মেহেদী পরিয়ে ওটাই আমার প্রথম ইনকাম।

মাদিহা : এরপরে কাজ পেয়েছিলেন কীভাবে?

রীতু : সেদিনকার ইভেন্টে টাকা খুব একটা উপার্জন করত্র না পারলেও, একটা কাজ হয়েছিলো। ওই ইভেন্ট থেকে বেশ কিছু মানুষ আমাকে চিনেছিলো। আমার কাজ কে পছন্দ করে ফোন নাম্বার নিয়ে গিয়েছিলো। তাদের মাধ্যমেই অনেক ডাক পেয়েছি৷

মাদিহা : অপরিচিত মানুষজনকে মেহেদি পরিয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন?

রীতু : আমি যখনই কাজ করতাম আমি কখনো টাকার কথা চিন্তা করতাম না,আমি আমার নিজের সন্তুষ্টির জন্য কাজ করতাম। ছোটবেলা থেকে অভাব কী জিনিস আল্লাহর রহমতে কখনো বুঝিনি৷ বিয়ের পরেও কখনো নয়। তাই আমি আমার ইচ্ছায় কাজ করতাম।

আমি বেশিরভাগ কাজ করি এভাবে- ক্লায়েন্ট আমার বাসায় এসে মেহেদি পরে যায়।
হাতে গোনা অল্প কিছু কাজ আমি বাইরে গিয়ে করেছি। তাও সেসব পরিচিত লোকের মাধ্যমে। সেই ৪-৫ টা বাইরের কাজেই আমার অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে।। কিছু বাসার মানুষ মনে করেছে, পেট চালাতে এরা বাড়ি বাড়ি যেয়ে মেহেদি পরায়। আবার কিছু বাসায় অনেক আদর যত্ন সম্মান পেয়েছি।

মাদিহা : পেমেন্ট সংক্রান্ত ব্যাপারে কোনো সমস্যা হয়েছে কখনো?

রীতু : (হাসতে হাসতে) এই কাজে আমার বড় সমস্যা হলো, আমি কখনো টাকার কথা বলতে পারতাম না। জিজ্ঞেস করলে বলতাম, আপনাদের যা ইচ্ছা, না দিলেও প্রব্লেম নাই। বেশিরভাগ মানুষই আমার পরিশ্রমের মোটামুটি মূল্যায়ন করেছে। তারপর কাছের মানুষজনের বকা খেয়ে খেয়ে আমি একটা রেট ফিক্সড করলাম।

মাদিহা : কোনো নেগেটিভ অভিজ্ঞতা?

রীতু : আমি খুব অল্প কাজ করি, পরিচিত লোকের রেফারেন্সে। একবার হয়েছে কী, এক মেয়ে এই কোরবানির ঈদে মেহেদি পরে গেছে। মেহেদি দেওয়ার পর আমাকে বলেছে, ‘আপু, আমি নিচে গিয়ে তোমার নাম্বারে বিকাশ করে দিচ্ছি।’
সেই মেয়ে ফেসবুকে আমার অল্প পরিচিত ছিলো। দুইহাত ভরে সে সেমি ব্রাইডাল পরেছে ঈদের আগে যেটার রেগুলার চার্জ আমি ২০০০ রাখি। তাকে বলেছিলাম তুমি কিছু কম দিও। সেই যে গেছে আর এখনো সে পেমেন্ট দেয়নি। আর যোগাযোগও করেনি৷

মাদিহা : পরিবারের সাপোর্ট পেয়েছেন?

রীতু : এখন পর্যন্ত যা কাজ করেছি, আমার হাজবেন্ড প্রচুর সাপোর্ট করেছে। কোনো ইভেন্টে কাজ করতে করতে, রাত ৮ টার বেশি বাজলে সে নিজে গিয়ে আমাকে নিয়ে এসেছে। একবার হোটেল রয়েল এ মেহেদি ইভেন্টে স্টল নিয়েছিলাম। প্রায় ২০ টা মেহেদির স্টল ছিলো সেখানে। তবুও আমাদের স্টলে এত ভীড় ছিলো যে কেউ খাওয়ার সময়টুকুও পাচ্ছিলাম না। আমার বর বাসা থেকে ডিম ভাজি আর ভাত মাখায় নিয়ে গিয়েছিলো যেন আমি কাজের ফাঁকে চামচ দিয়ে খেতে পারি।

মাদিহা : মেহেদির আলপনা করার মার্কেট কেমন?

রীতু : খুলনাতে মার্কেট কিছুটা কম। এরা ৫০০ টাকায় ৫০০০ টাকার কাজ চায়। খুলনায় ২-৩ জন আর্টিস্ট আছে যারা আসলেই ভালো কাজ করে। তবে সেইসব আর্টিস্ট এর সংখ্যা বেশি, যারা ১০০০-১৫০০ টাকায় দুই হাতের উপর নিচে ব্রাইডাল পরায় দেয়। এজন্য যারা ভালো কাজ করে তাদের কিছুটা ক্ষতি হয়।

মাদিহা : এবার ডিজাইনের প্রকারভেদ নিয়ে বলুন।

রীতু : সিম্পল ডিজাইন, সেমি গর্জিয়াস, সেমি ব্রাইডাল, ব্রাইডাল। এগুলো হাতের জন্য। কেউ পায়ে পরলে পায়ের জন্য ও আলাদা চার্জ নেওয়া হয়। ক্লায়েন্ট এর চাহিদা অনুযায়ী মেহেদি পরিয়ে দিই আমি। দেখা যায়, একেক জনের একেক চাহিদা এরোবিক, মান্ডালা, ময়ূর, ফ্লোরাল, লোটাস এই সব।

মাদিহা : এই পেশায় নিয়মিত থাকার ইচ্ছে আছে?

রীতু : আমার কাছে মনে হয়েছে, চাকরির থেকে এই কাজটা বেশি সিকিউর। আর আল্লাহর রহমতে যেখানে কাজ করি তারাই আমাকে পরবর্তীতে ডাকে। আর আমি নিজেও যেহেতু করতে পছন্দ করি। তাই ইচ্ছে আছে, নিয়মিতভাবেই ক্রাফটিং আর মেহেদি ডিজাইনিং নিয়ে কাজ করবো।

নাসরীন জাহান রীতুকে ধন্যবাদ, আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য। বাংলাহাব টিম থেকে তার জন্য শুভ কামনা।

সবশেষে মেহেদি সংক্রান্ত কিছু টিপস

১. মেহেদির রংকে আরো বেশি লাল করার জন্য হাতের মেহেদি ওঠানোর পর চিনি ও লেবুর রসকে একসঙ্গে মিশিয়ে হাতে মেখে বাতাসে শুকিয়ে নিন।

২. মেহেদির রংকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য সাবান ও পানি যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করবেন।

৩. যাদের টিউব মেহেদিতে অ্যালার্জি হতে দেখা যায়, টিউব মেহেদিতে অ্যালার্জি হলে আপনি ল্যাকটোক্যালামাইন ব্র্যান্ডের লোশন ব্যবহার করে তার ওপর মেহেদি লাগাতে পারেন।

মেহেদি নিয়ে অনেক ধরণের নকশা, টিপস ও মেহেদি আর্টিস্টের সাক্ষাতকার সমেত ফিচারটি পড়ে নিলেন তো? এবার নিজের মনের মতো করে যেভাবে খুশি মেহেদি দিয়ে রাঙ্গিয়ে নিন।

ফিচার ইমেইজ সহ সবগুলো ছবির ক্রেডিট :
নাসরীন জাহান রীতু

মন্তব্য
লোডিং...