এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

রেবালা : পাঁচ হাজার বছরের মানব ইতিহাসের ইতিকথা

172

এস্তেনিয়ায় অবস্থিত রেবালা হেরিটেজ রিজার্ভ পৃথিবীর বৃহত্তম হেরিটেজ সাইট, যেখানে বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে প্রস্তরযুগ থেকে ভাইকিং যুগ পর্যন্ত সব চমকপ্রদ প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ সংরক্ষণ করা আছে। এই স্থান আমাদেরকে এস্তোনিয়ার দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের সম্পর্কে ধারণা  দেয়। এছাড়াও প্রাচীন মানব বসতির বিবর্তন এবং প্রাগৈতিহাসিক অসাধারণ সব স্মৃতিসৌধ ও ধ্বংসাবশেষ আমাদের ফেলে আসা অতীত সম্পর্কে একটি অনন্য অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেবে।

এক পলকে রেবালা হেরিটেজ রিজার্ভের ইতিহাস (Source: wikimedia.org)

রেবালা হেরিটেজ রিজার্ভের ঐতিহাসিক ঝলক

হেরিটেজ রিজার্ভের পার্ক সাইটগুলো এস্তোনিয়া এবং বাল্টিক অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাসের অনেক কিছুই প্রকাশ করে। বরফ যুগের (Ice age) শেষ দিকে এখনকার আধুনিক এস্তোনিয়া ছিল হিমবাহ দ্বারা আচ্ছন্ন।

রেবালা হেরিটেজ রিজার্ভের সামগ্রিক ম্যাপিং (Source: go.gale.com)

বরফ কমে গেলে নারভা সংস্কৃতির অংশ হিসাবে পরিচিত “শিকারী-সংগ্রাহক”-রা (Hunter-Gatherers) এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করে এবং ধীরে ধীরে কৃষিকাজ ও পশুপালনে অংশগ্রহণ করে।

 

লৌহ যুগে (Iron Age) এই অঞ্চলটির ইতিহাস সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। তবে খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০-১৭০০ সালের দিকে শুরু হওয়া ব্রোঞ্জ যুগে (Bronze Age) এই অঞ্চলে পাহাড়ি দুর্গগুলো নির্মিত হয়েছিল। ৮ম শতাব্দীর আশেপাশে ভাইকিংরা (Viking) এস্তোনিয়ান উপকূলে আক্রমণ চালিয়ে দখল নিয়ে দুর্গ এবং বসতি স্থাপন করেছিল এবং এই সময়েই উত্তর এস্তোনিয়ার বেশিরভাগ অংশই সাংস্কৃতিকভাবে, পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে, ভাইকিং রাজ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যানটি মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ অঞ্চল হিসাবে ১৯৮৭ সালে গঠিত হয়েছিল। এস্তোনিয়ার সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় এই উদ্যানটি রক্ষায় প্রচুর বিনিয়োগ ও সহায়তা করেছে।

রেবালা হেরিটেজ রিজার্ভের বিবরণ

এই রিজার্ভটি উত্তর এস্তোনিয়ার হার্জু কাউন্টির রেবালা গ্রামের আশেপাশে অবস্থিত। এটি মোট ৪৫ বর্গমাইল (৭৪ বর্গকিলোমিটার) আয়তন এবং রিজার্ভে মোট ৩০০ টিরও বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই লৌহ যুগের শেষ ভাগের ও ব্রোঞ্জ যুগ প্রথম দিকের ছোট ছোট পাথরের কবর (Stone cist graves)।

স্টোন সিস্ট গ্রেভ এর উদাহরন (Source: archaeologs.com)

এই কবরগুলোতে মৃতদেহ বা মৃতদেহের হাড়কে পাথর দিয়ে তৈরি ছোট কফিনগুলোতে রাখা হত এবং বৃত্তাকার আকারে অনেকগুলো কফিনকে এক জায়গায় মাটিচাপা দেওয়া হত। একবার কিছু চুনাপাথরের আবৃত ফলক সংবলিত কবরও পাওয়া গিয়েছিল।

এখানে প্রচুর পরিমাণে প্রস্তর যুগের এবং তার পরবর্তি সময়কার কাপের মত দাগ দেওয়া পাথর (Cup stones) পাওয়া গেছে। এই খোদাইকৃত পাথরের চাই বা পেট্রোগ্লাইফগুলোতে (Petroglyph) পাথরের খোদাই করা অবতল বা সর্পিল প্রকৃতির চিহ্ন রয়েছে যা প্রাগৈতিহাসিক শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই যুগে এগুলো সীমানা প্রাচীর বা আনুষ্ঠানিক স্থান চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হতে পারে বলে ধারনা করা হয়। এগুলো প্রায়শই পাথরের সমাধির নিকটে দেখতে পাওয়া যায়। এই রিজার্ভে প্রাপ্ত নমুনাগুলো ইউরোপের আশেপাশে প্রাপ্ত কাপ এবং রিং স্টোনগুলোর থেকে বেশ বড় এবং স্বতন্ত্র প্রকৃতির।

আকাশ থেকে রেবালা হেরিটেজ সাইট (📸 Autor: @valopet)

প্রস্তর যুগ থেকে নর্স পিরিয়ড পর্যন্ত প্রচুর বসতি এবং খামারের সন্ধান এখানে পাওয়া গেছে। ধারনা করা হয় এগুলো ছিল মূলত ব্যক্তিগত বাসস্থান। তবে দুর্গগুলি পাশাপাশি বেশ কয়েকটি প্রাচীন খামার ক্ষেত ছিল। এমনকি এখানে অনেকগুলো ভাইকিংদের গ্রামও (Viking village) পাওয়া গেছে।

সম্ভবত রেবালার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো সুবিশাল Jõelähtme Burial Field যেখানে ৩৫টি সিষ্টের কবর প্রদর্শিত করা আছে। এগুলি ১৯৮৫ সালে একটি নির্মাণ প্রকল্পের সময় আবিষ্কার হয়েছিল। ১৯৯০ এর দশকে নতুন রাস্তায় যাওয়ার জন্য সমাধিস্থলটি ৬০ ফুট (১৮ মিটার) সরানো হয়েছিল।

রেবালায় ক্রমাগত নতুন অনুসন্ধান করা হচ্ছে। যেমন ২০১৩ সালে খনন করা বেশ কয়েকটি নতুন অলংকৃত কাপ স্টোন। এত বিস্তৃত রিজার্ভ সংরক্ষণের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ এই অঞ্চলে বহু জনবসতি এবং রাস্তা।

রেবালা হেরিটেজ রিজার্ভ পরিদর্শন

রেবালা হেরিটেজ রিজার্ভটি টালিন (Tallinn) শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলির নিকটে প্রচুর আবাসন ব্যবস্থাও রয়েছে। Jõelähtme মিউজিয়ামটি রেবালা হেরিটেজ রিজার্ভের একদম কেন্দ্রস্থলে রয়েছে। অতীতে এই অঞ্চলে বসবাসকারীদের সংস্কৃতি এবং প্রচুর নিদর্শন এখানে প্রদর্শিত করা হচ্ছে।

একটি গাড়িতে করেই এই অঞ্চলটি ভ্রমণ করা সম্ভব। কারণ পাথরের সিষ্টের কবর ও এর মতো অনেক আকর্ষণ হাইওয়ে থেকে খুব বেশি দূরে নয়। যদিও হেরিটেজ রিজার্ভের গভীরে ভ্রমণের জন্য আপনাকে একজন গাইড নিতেই হবে।

Source: ancient-origins; wikipedia

Feature Image source: folklore.ee

উৎস ancient-origins
মন্তব্য
লোডিং...