এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

অরুনাচলাম মুরুগানাথম- অক্ষয়ের “প্যাড ম্যান” মুভির সত্যিকারের হিরো

432

কিছুদিন আগেই সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে স্যানিটারি ন্যাপকিন হাতে নিয়ে তারকাদের ছবি বেশ শোরগোল তুলেছিলো।বলিউড নায়ক অক্ষয় কুমার নায়িকাদের চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এমনটি করতে। কেননা ঋতুস্রাব বিষয়টি এখনো একটি ট্যাবু। এইটি যে অত্যন্ত একটি স্বাভাবিক বিষয়, এতে লজ্জার কিছু নেই, সেটি প্রমাণ করার জন্য এই আয়োজন ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই কেন জরায়ু স্বাস্থ্য নিয়ে এত তোড়জোড়? এর পেছনের কারণ হচ্ছে অক্ষয় কুমার অভিনীত “প্যাডম্যান” চলচ্চিত্রটি। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, প্যাডম্যান কে?

প্যাডম্যান চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য

আর বালকি পরিচালিত বলিউড বায়োপিক প্যাডম্যানে অক্ষয় কুমার নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। এটি একটি সামাজিক সচেতনতামূলক ছবি। ভারতের গ্রামাঞ্চলে ঋতুকালীন সময়ে নোংরা কাপড়, চট, পাট্‌, গাছের ছাল এমনকি ছাই বা বালুও ব্যবহার করা হয়। এটি যে কতটা অস্বাস্থ্যকর সেই সমন্ধে তাদের কোন ধারণা নেই। স্যানিটারি ন্যাপকিনের নাম তারা শুনেছে কিনা সন্দেহ। এই অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের কারণে কতশত নারীরা জরায়ুর ভয়ানক সব অসুখে ভুগছে।নারীদের এই অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন অরুনাচলাম মুরুগানাথম; যার জীবন থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে তৈরী করা হয়েছে প্যাডম্যান চলচ্চিত্রটি।

অরুণাচলাম মুরুগানথম ছিলেন তামিল নাড়ুর একজন সাধারণ ওয়েল্ডিং অর্থাৎ ঝালাই মেশিনের কারিগর। তিনি ভারতের প্রথম উদ্যোক্তা যিনি সাশ্রয়ী মূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরী এবং বাজারজাত করেছেন যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরাও স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে পারেন।এবং তার এই উদ্যোগের পেছনে অনুপ্রেরণা ছিলো শান্তি, মুরুগানথমের স্ত্রী।

অরুণাচলাম মুরুগানথম

এটি তখনকার কথা যখন মুরুগানথমের সবেমাত্র বিয়ে হয়েছে তার স্ত্রী শান্তির সঙ্গে। মুরুগানথমের ভাষ্যমতে, “এক সকালে দেখলাম শান্তি বাড়ির লাগোয়া বাথরুমে যাচ্ছে। কিন্ত একটা হাত তার পেছনে, সে হাতে শান্তি কিছু একটা ধরে রেখেছে। ওর চোখে মুখে লজ্জা আর আতঙ্ক মেশানো একটা ভাব। আমি ওর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম যে ও কি লুকোচ্ছে। আমার প্রশ্ন শুনে ওর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আমি জোরাজুরি করাতে ওর হাত থেকে এক টুকরো নোংরা কাপড় মাটিতে পড়ে গেলো। আমি বুঝতে পারলাম যে শান্তির ঋতুকাল চলছে। কিন্তু যে কাপড়ের টুকরো নিয়ে ও বাথরুমে যাচ্ছিলো সেই কাপড়টি এত নোংরা যে সেটি দিয়ে আমার সাইকেলের চাকা পরিষ্কার করতেও আমার ঘেন্না হবে! আমি শান্তিকে বললাম, ‘তুমি স্যানিটারি ন্যাপকিন কেন ব্যবহার করছোনা?’ শান্তি আমাকে ধমক দিয়ে বললো, স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে যে টাকা খরচ হবে, সেই টাকা দিয়ে আমাদের পরিবারের পুরো মাসের সকালের দুধের খরচ হয়ে যাবে। এই কথা বলে সে মাটি থেকে কাপড় নিয়ে বাথরুমে চলে গেল।সেদিনই আমি শান্তিকে উপহার দেয়ার জন্য দোকান থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে গেলাম। দোকানদার এমনভাবে প্যাকেট আমাকে দিলো যেন আমি স্যানিটারি প্যাড স্মাগল করছি। বাড়িতে প্যাড নিয়ে এসে দেখলাম শুধু কয়েকটা তুলোর প্যাড, তারই দাম এত বেশি! প্যাডগুলোতে ১০ গ্রাম তুলোও নেই, কিন্তু দাম রাখছে ৪০ গুণ বেশি! তখনই বুঝলাম, কেন গ্রামের মহিলারা প্যাড চাইলেও ব্যবহার করতে পারেনা”

ঋতুস্রাব নিয়ে রাখঢাক যুগযুগ ধরে চলে আসছে। ভারতীয় উপমহাদেশের ৮০ ভাগ নারীর কাছে ঋতুস্রাব অত্যন্ত লজ্জার বিষয় এবং একে যতই লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখা যায় ততই মঙ্গলজনক বলে ধরে নেয়া হয়। আমাদের দেশেও ঠিক এমনটাই চলে আসছে। নারীরা পুরনো কাপড়ের টুকরো, চটের টুকরো, পাটের আঁশ, এমনকি ছাই বালু এসব ও তারা ব্যবহার করতো।লজ্জার কারণে তারা তাদের ব্যবহৃত কাপড়গুলোও ঠিকমতো রোদে শুকোতে দেয়না, অন্ধকার স্যাঁতস্যঁতে জায়গায় শুকোতে দেয়া হয় যার কারণে কাপড়গুলো জীবাণুমুক্ত হয়না। তার উপর ঋতুমতী নারীদের উপর রয়েছে নানান নিষেধাজ্ঞা। রান্নাঘরে যাওয়া যাবে না, মসলাযুক্ত খাবার খাও্য়া যাবেনা, ভোরবেলা গোসল সেরে নিতে হবে, গাছে পানি দেয়া যাবে না কারণ এতে নাকি গাছ মারা যাবে! আমাদের সমাজে এখনো ঋতুমতী নারীদের অস্পৃশ্য বলে ধরে নেয়া হয়। এই কুসংস্কারগুলো এখনো কিছু মানুষ মেনে চলে এবং এই কারণে মেয়েরা ঋতুস্রাবের বিষয়টা নিয়ে মরমে মরে যায়।

ঋতুস্রাব চলাকালীন সময়ে নোংরা কাপড় বা কাগজ বা অন্যকিছু ব্যবহার করা অবশ্যই বর্জনীয়। এগুলো ব্যবহার করলে জ্বর, তলপেটে ব্যথা, যৌনাঙ্গ-মূত্রনালী-জরায়ুতে ইনফেকশন হতে পারে।জরায়ুর ইনফেকশন দীর্ঘদিন থাকলে সেটি ক্যান্সারে রুপান্তরিত হতে পারে।

মুরুগানথম এবং তার স্ত্রী শান্তি

মুরুগানথম আরো বলেন, “আমি চিন্তা করলাম, যেহেতু প্যাডের এত দাম, আমি বাড়িতেই প্যাড কেন বানাই না? তাই তুলা দিয়ে নিজেই প্যাড বানালাম।কিন্তু আমার স্ত্রী শান্তি আমাকে জানিয়ে দিলো যে সে আমার তৈরী প্যাড পরবে না। এমনকি দোকান থেকে কিনে আনা প্যাডও সে পরেনি। আমার বোনও একই কাজ করলো। তাই আমি আমার বানানো প্যাডগুলো নিয়ে আমাদের গ্রামের কাছাকাছি এক মেডিকেল কলেজের মেয়েদের কাছে নিয়ে গেলাম।আমি জানতে চেয়েছিলাম আমার বানানো প্যাডগুলো কাজ করছে কিনা, আর যদি নাই করে, তাহলে সেই প্যাডগুলোতে কি কমতি ছিলো তা জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আশানুরুপ ফল পাইনি। পরবর্তীতে আমি নিজেই একটি কৃত্রিম ব্লাডার বানিয়ে নেই এবং একটি প্লাস্টিক পাউচে ছাগলের রক্ত ভরে নেই। মহিলারা যেভাবে প্যাড পরে আমিও সেভাবে প্যাড পরলাম। কৃত্রিম ব্লাডারের কাজ ছিলো আমার প্যাডে রক্ত পাম্প করে পাঠানো। সেই প্যাডগুলো পরে আমি কাজ করতাম। কিন্তু তুলোর প্যাডগুলো রক্তে ভিজে ফুলে উঠতো, দুর্গন্ধ বেরোতো। আমি জানিনা, মহিলারা কিভাবে এই কষ্ট বছরের পর বছর সহ্য করে আসছে। এর মধ্যে আমার স্ত্রী শান্তি আমাকে ফেলে চলে গেল। শান্তির ধারণা ছিলো আমি মেয়েদের পেছনে পেছনে ঘোরার জন্য ফন্দি বের করেছি। গ্রামের কিছু মানুষও তাল দেয়া শুরু করলো তার সাথে। শান্তি আমাকে ডিভোর্স লেটার পাঠালো”

স্ত্রীর সাথে মনোমালিন্য থাকার কারণে প্রচন্ড মানসিক চাপে ছিলেন মুরুগানথম। তবু তিনি হাল ছাড়েননি। নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন।তিনি তার রক্তাক্ত প্যান্ট সকলের সামনে কুয়োর পারে ধুতেন, মানুষ ভাবতো তিনি বুঝি কোন যৌন্ রোগে ভুগছেন। তিনি গ্রামের মেয়েদের বলতেন প্যাড ব্যবহার করতে। এতে তিনি আরো বেশি করে গ্রামের লোকেদের কাছে অপমানিত হতে লাগলেন। মুরুগানথমের দুই বছর লেগেছিলো এইটুকু জানতে যে মেয়েদের স্যানিটারি প্যাডে পাইন উড পাল্প ব্যবহার করা হয় রক্ত শোষন করার জন্য।এই তথ্য জানার পর তিনি মুম্বাইয়ের এক উড সাপ্লায়ারের কাছ থেকে ৭৫হাজার টাকায় প্রসেসড পাইন উড পাল্প কিনে নেন। কিন্তু পাইন উড পাল্প থেকে প্রাপ্ত সেলুলোজ ফাইবার এবং তুলার সমন্বয়ে প্যাড তৈরি করার মেশিন কেনার সামর্থ্য মুরুগানথমের ছিলো না। তাই তিনি নিজের স্যানিটারি টাওয়াল বানানোর মেশিন আবিষ্কার করলেন এবং আঠারো মাস ধরে ২৫০টি মেশিন বানালেন। এই মেশিনগুলো নিয়ে তিনি উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং বিহারের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়ে গেলেন।

মুরুগানথমের আবিষ্কৃত প্যাড তৈরির মেশিন

এখন ভারতের ২৪টি স্টেটে মুরুগানথমের প্যাড তৈরীর মেশিন ব্যবহার করে হাজারো নারী প্যাড তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে।শুধু তাই নয়, এই নারীরা অন্যদের জরায়ুর স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন করে তোলছে।মুরুগানথমের এই মেশিন ২০০-২৫০ টি প্যাড তৈরি করতে পারে। প্রত্যেকটি প্যাডের মূল্য গড়ে আড়াই টাকা। এনজিও এবং বিভিন্ন সেলফহেল্প গ্রুপগুলো মুরুগানথমের তৈরি প্যাড দিয়ে পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতার সচেতেনতা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

১৪ বছর বয়সে লেখাপড়া ছেড়ে দেয়া সেই অরুণাচলম মুরুগানথম টাইম ম্যাগাজিনের জরিপ অনুযায়ী সফল ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন। তাকে নিয়ে লেখা হয়েছে বই, তৈরী করা হচ্ছে চলচ্চিত্র।তাকে ভূষিত করা হয়েছে নানান সম্মাননায়। গোটা বিশ্বে এই “প্যাডম্যান” পরিণত হয়েছেন কিংবদন্তীতে। তিনি যা করেছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আর হ্যাঁ, মুরুগানথমের স্ত্রী শান্তিও কিন্তু ফিরে এসেছিলেন। তারা এখন সুখে শান্তিতে বসবাস করছেন!

Photo Source:

1. hindustantimes

2. indiatoday

মন্তব্য
লোডিং...