টাইপ টু ডায়বেটিস : লক্ষণ, কারণ ও নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায়…

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে। এবং তাদের মধ্যে টাইপ 2 ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা খুবই বেশি। WHO, The World Health Organization এর মতে পৃথিবীতে 90% ডায়াবেটিস রোগী টাইপ 2 ডায়াবেটিসে ভুগছেন।

ডায়াবেটিসের কারণে মানবদেহে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। একে হাইপারগ্লাইসেমিয়া ও বলা হয়। সাধারণত মানবদেহের অগ্ন্যাশয় নামক অঙ্গটি ইনসুলিন নামে একটি হরমোন উৎপাদন করে। আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন খাবারের সাথে যেসব চিনি খাই সেগুলোকে এনার্জিতে পরিণত করে এই ইনসুলিন। টাইপ টু ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে শরীরের অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন উৎপন্ন করে ঠিকই তবে সেগুলো ঠিক মত কাজ করতে পারেনা। তারা শরীরের গ্লুকোজগুলোকে এনার্জীতে রূপান্তর করতে পারে না। যার ফলে শরীরে গ্লুকোজের পরিমাণ দিন দিন বাড়তে থাকে। একে বলা হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। প্রথমদিকে অগ্ন্যাশয় পরিমাণমতো ইনসুলিন তৈরি করার চেষ্টা করে কিন্তু একটি পর্যায়ে যেয়ে এই কাজটি করা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। ধীরে ধীরে অগ্ন্যাশয় তার ইনসুলিন তৈরি করার ক্ষমতাটি হারিয়ে ফেলে। এবং মানবদেহটি আক্রান্ত হয় টাইপ টু ডায়বেটিসে।

টাইপ টু ডায়াবেটিসের লক্ষণসমূহ :

টাইপ টু ডায়াবেটিসের লক্ষণসমুহ খুব ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। লক্ষণগুলো প্রথমদিকে খুব প্রকটভাবে বুঝা যায় না তাই বেশিরভাগ মানুষ প্রথমদিকে এ লক্ষণগুলোকে উপেক্ষা করে থাকে। প্রথম থেকেই যদি এই লক্ষণগুলো বুঝে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তবে টাইপ 2 ডায়বেটিস এর হাত থেকে নিজেকে কিছুটা হলেও রক্ষা করা যেতে পারে।

– ঘন ঘন ক্ষুধা পাওয়া
– অল্প কাজ করেই ক্লান্ত হয়ে যাওয়া
– শরীরে এনার্জীর অভাব বোধ করা
– প্রচুর পরিমাণে এবং ঘন ঘন পানির পিপাসা পাওয়া
– ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া
– হঠাৎ করে ওজন খুব বেড়ে যাওয়া বা খুব কমে যাওয়া
– চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া
– জিভ শুকিয়ে যাওয়া
– গা চুলকানো

সময়ের সাথে সাথে অন্যান্য যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:

– শরীরে কালো কালো দাগ
– ঘন ঘন ইস্ট (Yeast) ইনফেকশন
– পা ব্যথা
– কেটে যাওয়া ক্ষত শুকোতে বেশি সময় নেয়া।

টাইপ টু ডায়বেটিসের কারণসমূহ:

– বয়স ৪৫ এর বেশি হলে এই রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
– শরীরের অতিরিক্ত ওজনের কারণে।
– উচ্চ রক্তচাপের কারণে।
– শরীরে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি থাকলে।
– পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোমের কারণে।
– শরীরের উপকারী HDL কোলেস্টরলের মাত্রা কম থাকলে।
– ৯ পাউন্ডের বেশি ওজনের সন্তানের জন্মদান করলে
– ডিপ্রেশনের কারণে।
– অধিক পরিমাণে জাঙ্ক ফুড খেলে।
– অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করলে।
– ধুমপান করলে অথবা কোন ধুমপায়ীর সাথে বসবাস করলে।

যেহেতু আমরা এখন জেনে গেছি যে কোন কারণে টাইপ টু ডায়বেটিস হয়, আমরা চেষ্টা করবো সেগুলো থেকে দূরে থাকার। দুই একটি কারণ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হলেও যে কারণগুলো আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সেগুলো থেকে এড়িয়ে চলার যথাসম্ভব চেষ্টা আমরা করতে পারি।

টাইপ টু ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায়:

আপনি যদি ইতিমধ্যে টাইপ 2 ডায়াবেটিসের রোগী হয়ে থাকেন তাহলে নিম্নোক্ত উপদেশগুলো মেনে চলতে পারেন। এতে আপনার টাইপ টু ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

স্বাস্থ্যকর এবং ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া:

স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া টাইপ টু ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ। আপনার খাবারে যেন প্রচুর পরিমানে ফাইবার থাকে। যেসব ফলমূল সবজি শস্য জাতীয় খাবার ও বাদামে ফাইবারের পরিমাণ বেশি সেগুলো বেশি করে খেতে হবে। চেষ্টা করবেন স্বাস্থ্যকর আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি খাবার খাওয়ার।

আপনি কি খাবার খাচ্ছেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আপনি কতটুকু পরিমাণে খাবার খাচ্ছেন। খেয়াল রাখবেন, যেন একবারে অধিক খাবার না খেয়ে ফেলেন। চেষ্টা করবেন অল্প অল্প করে ৫/৬ বারে সেই খাবার খাওয়ার। প্রতিদিন একই সময়ে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করবেন। পেট ভরে সকালের নাস্তা খাবেন এবং রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে ফেলার চেষ্টা করবেন।

অতিরিক্ত ওজন কমানো:

শরীরের অতিরিক্ত ওজন টাইপ টু ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। তাই চেষ্টা করবেন অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে ফেলার। কিন্তু কখনোই নিজে নিজে অস্বাস্থ্যকরভাবে খাবারের মাত্রা কমিয়ে দিয়ে ডায়েট কন্ট্রোল করার চেষ্টা করবেন না। একজন পুষ্টিবিদের সাহায্য নিন। তার সাহায্য নিয়ে উচ্চতা এবং বয়স অনুযায়ী খাবার তালিকা তৈরি করে ফেলুন। এভাবে সহজে আপনার ওজন কমবে এবং তা হবে স্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে।blank

প্রতিদিন সকালে পেট ভরে স্বাস্থ্যকর নাস্তা গ্রহণ করবেন। অতিরিক্ত চিনি দেয়া সফট ড্রিংকস অথবা carbonated water পরিহার করুন। এর বদলে সাধারণ খাবার পানি এবং বিভিন্ন ফলের রস খেতে পারেন। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। চেষ্টা করুন নিজেকে কর্মক্ষম রাখার। প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম করুন

কর্মক্ষম থাকুন:

সারাদিন এক জায়গায় বসে না থেকে অথবা একনাগাড়ে অনেকক্ষণ বিশ্রাম না করে নিজেকে কর্মক্ষম রাখার চেষ্টা করুন। নিজেকে ঘরের কাজকর্মের মধ্যে ব্যস্ত রাখুন। প্রতিদিন নিয়মমাফিক হাটাহাটি এবং ব্যায়াম আপনার ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে। যদি পূর্বে কখনোই ব্যায়াম না করে থাকেন এবার চেষ্টা করুন ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলার।

ধূমপান ত্যাগ করা:

দেখা যায় যে ৭০% ধূমপায়ী টাইপ 2 ডায়াবেটিসে ভোগেন। যাদের ইতিমধ্যে টাইপ টু ডায়াবেটিস হয়ে গেছে তাদের অতি অবশ্যই উচিত ধূমপান ছেড়ে দেওয়া। এটি টাইপ টু ডায়াবেটিসকে আরো ভয়ংকর করে তুলবে। ধূমপান ইনসুলিন রেজিস্টেন্স এর সমস্যাকে আরো প্রকট করে তোলে। যার কারণে শরীরের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

blank

তাছাড়া ধূমপান সুস্থ শরীরের গ্লুকোজ মেটাবলিজমকে ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয় এবং এগিয়ে নিয়ে যায় টাইপ টু ডায়বেটিসের ক্ষেত্রে। এ ছাড়া ধূমপান শুধু টাইপ 2 ডায়বেটিস নয়, হার্টের অসুখ, কিডনির অসুখ, আলসার, রক্তের নানা অসুখ, চোখের সমস্যা এমনকি নার্ভ ড্যামেজে ও ঘটিয়ে ফেলতে পারে।

অবশ্যই নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন এবং সেই অনুযায়ী চলার চেষ্টা করবেন। জীবন একটাই। চলুন, একে সুস্থ ও সুন্দরভাবে কাটানোর চেষ্টা করি।