পৃথিবীর অনেক মানুষের কাছে “সময়” জিনিসটি খুবই নিয়মিত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও বাস্তবিক পক্ষে সময়ের সংগাটা অনেক বিভ্রান্তিকর এবং চিরন্তন বিতর্কের অধ্যায়। সময় এমনি একটি অসমাধানযোগ্য রহস্য যে কোনো সংখ্যার সাহায্য ছাড়া আক্ষরিক নামের মাধ্যমে এটাকে প্রকাশ করা খুবই কষ্টসাধ্য। সংখ্যার যোগ বিয়োগ ছাড়া সময় অস্তিত্বহীন ।

টাইম ছবি
Via: narayanganjbarta24

পৃথিবী গ্রহের হিসাব অনুযায়ী আমাদের কাছে নতুন বছর মানে ২০১৮ সাল, একটি আগমনী বছর । আপাতত নতুন বছর ডাকলেও একটি নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হবার পর এই নতুন বছরটিকে সবাই ২০১৮ নামে ডাকবে । সময়কে হিসেবের ফ্রেমে আবদ্ধ করার জন্য মানুষ কতই না একক ঠিক করেছে, কয়েকটির নাম বলি- এই যেমন, ট্রপিক্যাল ইয়ার (১ বছর সময়কাল), ফিসক্যাল ইয়ার (৩ মাস সময়কাল), লাসট্রাম (৫ বছর সময়কাল), ইন্ডিকশন (১৫ বছর সময়কাল) ইত্যাদি । এসবের বাংলা নামও আমার জানা নেই । অন্য কিছু গ্রহ আছে যেমন মার্কিউরি (বুধগ্রহ), যেটা সূর্যকে প্রতি ৮৮ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করে, অথচ পৃথিবীর  দরকার ৩৬৫ দিন এবং কয়েকঘন্টা । পৃথিবীর হিসাব অনুযায়ী কারো বয়স এখন ৫০ বছর হলে বুধের হিসাব অনুযায়ী তার বয়স এখন ২০০ বছরের বেশি (ঠিক করে বললে ২০৭ বছর)। এ জন্যেই বলেছিলাম সময় আসলে অনেক বিভ্রান্তিকর এবং ভুতুড়ে । শুধু তাই নয়, সময় অনেক ধ্বংসাত্মকও বটে । যেমন আজকে তৈরী করা একটি সুন্দর এবং মজবুত ঘরের দেয়ালও একটি নির্দিষ্ট সময় পর আপনা আপনি ক্ষয়ে যাবে, কিন্তু আপনা আপনি পুনর্গঠিত হবে না । সময়ের সাথে সব বস্তুর স্বভাবিক গঠনই বিপর্যস্ত হয় । পদার্থবিজ্ঞানে সময়ের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় এনট্রপি (Entropy) ।

যাই হোক, এবার মূল প্রসঙ্গে আসি, ২০১৮ বিষয়ক প্রসঙ্গ ।

বয়সের হিসাব এবং অন্যান্য জাগতিক কাজকর্মের হিসাব রাখার জন্য আমাকেও ট্রপিকাল ইয়ার-এর নিয়ম অনুযায়ী চলতে হয় । কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে আমার কাছে একেকটি বছরকে একেকটি গল্পের মতো মনে হয় । কেউ যদি প্রতিদিন এক পাতা করে দিনের ঘটে যাওয়া বিষয়য়গুলো লিখে রাখতো তাহলে প্রতি বছর ৩৬৫ পাতার একেকটি গল্পের বই হয়ে যেত, আর গল্পগুলো ইতিহাস হয়ে থাকতো । সূর্যের চারপাশ দিয়ে একবার ঘুরে আসতে আসতে একেকটি নতুন ইতিহাসের জন্ম হওয়া কমই বা কিসের ।  মানুষ প্রতিদিন যেটুকুই অর্জন করুক না কেন, প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির উর্দ্ধে দিনের শেষে শুধু গল্পটাই অবশিষ্ট থাকে ।

বাস্তবিক পক্ষে প্রকৃত সময়ের ব্যাপ্তিকে শুধু আমার পূর্বে উল্লেখকৃত সময় একক দিয়ে পরিমাপ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে কখনো কখনো । যদি কোনোদিন কারো  হাজার বছর পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছে করবে, বেছে বেছে আকাশের সবচেয়ে অপূর্ব এবং উজ্জ্বল তারার দিকে তাকালেই হবে । একেকটি তারাকে মন ভরে দেখা মানে শুধু কয়েক হাজার বছর না, বরং কয়েক কোটি আলোকবর্ষ অতীতে ফিরে দেখা । একেকটি উজ্জ্বল, কখনোবা চলমান তারা, তাদের কোটি কোটি বছরের জমানো গল্পের ইতিহাস নিয়ে আলোর বেগে আমাদের দিকে ধাবিত হয়ে আসছে । অধিকাংশ তারাদেরই হয়তো বিরতিহীন গন্তব্যের কোন এক পর্যায়ে মৃত্য ঘটে, আমাদের কারো চোখে আলো পৌঁছানোর আগেই ওরা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে এবং শূন্যে ধুলো হয়ে মিলিয়ে যায়, যেমনটি মিলিয়ে যাই আমরা একদিন ।গল্প এবং স্বপ্নগুলো অসুম্পূর্ণ থাকা কোনো ব্যর্থতা নয়, বরং এগুলোর কোনটা শুরু না করাই ব্যর্থতা । নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অথবা বিফলে যাওয়া কোনো পরাজয় নয়, বরং সত্য এবং প্রকৃতির নিয়মের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা ।

অল্প কিছুদিন পর নতুন আরেকটি বছরের সূচনা । পাল্লা দিয়ে সবাই হিসাব নিকাশ শুরু করবে- কি অর্জন হলো অথবা কোনটা খোয়া গেলো সেটার । কেউ হয়তো আগামী বছরগুলোকে আরো অর্থবহ করে তুলতে নতুন সংগ্রামের নকশা আঁকবে । আমার কাছে “জীবন অর্থবহ” হওয়ার সংগাটা একটু ভিন্ন । আমি মনে করি সবার হাতে তালি পাওয়ার যোগ্য হওয়া মানেই সার্থকতা না, বরঞ্চ এ পর্যন্ত নিজেকে কতটুকু চেনা হলো অথবা আবিষ্কার করতে পারলাম সেটাই মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত । নিজের পদমর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এবং অভিষ্ঠ লক্ষে পোঁছানোর বিপক্ষে আমি নই, আমার বক্তব্য শুধু এটাই যে আমরা সচরাচর জীবনকে শুধু অর্জন এবং ব্যর্থতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেও বাস্তবে জীবনের পরিধি আরো বেশি বিসতৃত । আর যদি কোনো অর্জনের প্রত্যাশা থেকেই থাকে তাহলে সেটার জন্যে শুধু মাত্র আগ্রহ প্রকাশ করাই পর্যাপ্ত নয়,  প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে ।

যে মুহূর্তগুলো এখনো আসেনি সেটাকে অনর্থক ভয় পাওয়াটা বোকামি, কারণ ভবিষ্যতকে বোঝার চেষ্টা করার চেয়ে অতীতকে বুঝলে ভবিষ্যতের পথচলাটা আরো সহজ হয় । পৃথিবীর অন্য সব কিছুর মতো স্মৃতিও বিলীন হয়, এমনকি সবচেয়ে আনন্দায়ক অথবা কষ্টেরটিও । তাই  স্মৃতি মুখস্ত রাখার চেষ্টা না করে শুধুমাত্র সেখান থেকে শিক্ষা নেয়াটাই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ । এই বর্তমান মুহূর্তটিই সব । এটাকেই আমরা জীবন নামে ডাকি, যেটা এখনো আসেনি সেটার নাম জীবন নয় ।  ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবাটা যৌক্তিক, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অথবা দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে থাকা সময়ের অপব্যবহার । মানুষের ভবিষ্যতের কোনো সীমানা নেই, সেটা কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত সেটা অনির্ধারিত এবং অসংজ্ঞায়িত । আমরা মানুষেরা এবং এই সভ্যতার প্রতিটি উপাদান, এমনকি চিন্তা ও বিশ্বাস এসব কিছুই একটি চলমান মহাকালের যাত্রী ।

মহাকালের এই যাত্রার আমরা কি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ঠধারী বিশেষ স্থান দখলকারী কেউ ? অথবা আমাদের উপস্থিতি কি এই অসীম স্থান এবং কালের জন্য বিশেষ কোনো গুরুত্ব বহন করে ?  আমার উত্তর হবে, “একেবারেই না” । তাই আমার বিশ্বাস, যেহেতু সব কিছুই পরিবর্তনের স্রোতে ভাসে এবং ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ আপাতত আমাদের সক্ষমতার বাইরে, সেহেতু শুধুমাত্র বর্তমান মুহূর্তগুলোকে ফলপ্রসূ করার মাধ্যমে ভবিষ্যতের অর্জনকে সমৃদ্ধ করতে পারি । প্রতিটি ক্ষণই যদি হয় স্বতঃস্ফূর্ত, গোছানো, আদর্শবান, চিন্তাশীল এবং সৃজনশীল তাহলে শুধুমাত্র আগামী বছর নয়, আগামী জীবন এবং প্রজন্মও হবে সমৃদ্ধশীল এবং সম্ভাবনাময় । একমাত্র এই উপায়েই আমরা মহাকালের এই বিরতিহীন যাত্রায় নিজেদের অবস্থানকে মর্যাদাশীল এবং সুদৃঢ় করার অবকাশ খুঁজে পেতে পারি ।

আমরা আমাদের ছোট ছোট অর্জনগুলিকে উৎসবময় করতে পারি, কৃতজ্ঞতাবোধে ভরিয়ে দিতে পারি । যেটা আমি পাইনি সেটা পাওয়ার জন্যে আমার জন্ম হয়নি, আমার সেটা অর্জনের কথা ছিল না ।  আর যেটা পেয়েছি, আমার যা কীর্তি সেটার জন্য আমি উৎফুল্ল এবং অনুপ্রাণিত । “অনেকের যা আছে সেটা আমারও থাকতে হবে”- এটি একটি স্ব-বিরোধী এবং অবান্তর উক্তি ! কারণ কেউ হয়তো পৃথিবীতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বেঁচে থাকার সুযোগ পেতে পারে- তার মানে কি এই যে তার ভাগ্য অনুসরণ করে আমাকেও পাঁচ মিনিট পর জগৎ ত্যাগ করতে হবে ? মানুষের জীবনে সীমাবধ্যতা যেমন আছে, সম্ভাবনাও তেমনই আছে । প্রথমটিকে অতিক্রম করতে হবে এবং পরেরটিকে ছুতে হবে । শুধু মেধাবী হওয়ার অদম্য চেষ্টা না করে, কৌতুহলী হতে হবে । মুখস্ত করার ক্ষমতা থাকলেই জ্ঞানী এবং মহান হওয়া যায় না, আত্মস্থ করার প্রবণতা বৃদ্ধি এবং কল্পনাশক্তির প্রসার ঘটাতে হয় । শুধু তর্ক এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সেরা না হয়ে মহানুভবতা এবং পরোপকারিতায় সেরা হতে হবে । ক্লান্ত না হয়ে বিস্মিত হতে হবে । বার্ধক্যকে এড়িয়ে চলার কোনো উপায় নেই, বৃদ্ধ হওয়া মানে সম্পূর্ণ হওয়া । এই স্বাভাবিক সত্যটিকে অনুধাবন করার জন্য যাজক অথবা মহাপুরুষ হতে হয় না ।

অনেক মানুষই উচ্চাভিলাষী, তাদের অভিপ্রায় শুধু মানুষে মানুষে অসামঞ্জস্য এবং অমিল তৈরী করা । কিন্তু তারপরও আমাদের এই মানুষ প্রাণীদের মধ্যে এক জায়গায় ভীষণ মিল রয়েছে- সেটা হলো আমরা সবাই কিছুর সন্ধান করি কিছু একটাকে চিরস্থায়ী ভাবে পেতে- আর সেটা হলো আমরা সবাই সুখী হতে চাই । সেটাও সম্ভব যদি আমরা সমস্ত পৃথিবীকে একটি পরিবার এবং নিজেদেরকে সেই পরিবারের সদস্য মনে করি । আমাদের লক্ষ্য যদি হয় পরিবারের সবার নিরাপত্তা এবং সুখের অবকাঠামো নির্মাণ করা, এবং এই বিশ্বাস যদি আমরা একেবারে মর্মে মর্মে রোপন করি তাহলে আমাদের কাছে এই সংক্ষিপ্ত জীবনও অনেক উৎসবমুখর হয়ে উঠবে । মূলত আমরা সবাই একই প্রাণের উৎস, একই সূর্যের আলোতে একে অপরকে দেখি । একই আকাশের নিচে সবার সকালের ঘুম ভাঙে, একই মাটির ফলানো ফসলে আমাদের ক্ষুধা মেটাই এবং একই মৌলিক উপাদান সবার দেহে বিদ্যমান । সবার প্রাণের গভীরে একই চাহিদা, একই অভিপ্রায় ।

এইতো এই আমি ! বয়সের চাকা ২৫ পেরিয়ে ৩০ এর দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে । প্রতিদিন ভোরে ঘুমের আড়মোড়া ভেঙে নিয়মিত কাজের যাত্রায় যোগ দেই । প্রতি মুহূর্তেই একটু একটু করে সময়ের মহাস্রোতে ভেসে যাচ্ছি । মাথার উপরে বিস্তৃত নীল অসীম আকাশ । দুপাশের গাছ গুলি পেছনে অতীত হয়ে মিলিয়ে যায়, সাথে ভেসে চলা প্রানোচ্ছল মেঘের টুকরোও আকাশের নীলের সাথে মিশে যায় । আমার কাছে অবশিষ্ট থাকে কিছু টুকরো গল্প আর পথচলার অভিজ্ঞতা ।

fatah

শুভ হোক ২০১৮ ।

জাবির আল ফাতাহ

মালমো, সুইডেন

ওয়েবসাইট : http://jabiralfatah.com