এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

এই পৃথিবী শুধু আমাদের জন্যে নয়! মুভি রিভিউঃ ২.০

237

“PAKSHI NAHI TOH

MANUSHYA NAHI!!”

 

এই বছরের সবথেকে বহুল আকাঙ্ক্ষিত বলিউড মুভির কথা বলা হলে সবার আগে যার নাম আসবে সেটি হল, সাউথের ঈশ্বর তুল্য রজনী স্যার এবং অক্ষয় কুমার অভিনীত ‘২.০’ মুভিটির কথা। সেই ২০১৫ সালে শুটিং শুরু হয়েছিল এই মুভির। সেই থেকে দিন গুনছিল বলিউড-সাউথ এবং আমার মতন নিউট্রাল ফ্যানরা “শঙ্কর-রজনী” কম্বো আবারো দেখার জন্যে। বহু প্রতীক্ষিত এই মুভির রিলিজ ডেট বার বার পিছানোতে হতাশ হতে হয়েছিল বার বারই। তাই এই মুভি হল প্রিন্ট আসায় আর দেরি না করে দেখেই ফেললাম দ্রুত। যেহেতু হল প্রিন্ট ছিল, তাই ভিএফএক্স এবং বিজিএম কোনটারই স্বাদ ঠিক মতন পাইনি।

 “২.০” একটি সাই-ফাই ঘরানার তামিল মুভি যা ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া একই ডিরেক্টরের রোবটের সেকেন্ড সিক্যুয়াল। এই মুভির রিভিউতে যাওয়ার আগে কিছু আজাইরা প্যাঁচাল পেড়ে নেই। ২০১৫ সাল থেকে কাজ শুরু হওয়া এই মুভি এ যাবত কালের সবথেকে ব্যয়বহুল মুভি, যার বাজেট আনুমানিক প্রায় ৫০০+ কোটি। এত বাজেট দেওয়া কারণ পরিচালক শঙ্কর এর আগেও বিগ-বাজেটের মুভিকে ব্যবসা সফল করতে পেরেছেন(আই,রোবট এসব বিগ-বাজেটের মুভি)। সেই হিসেবে প্রিবিজনেসও অনেক ভালো করেছে ‘২.০’। প্রি-বিজনেসের একটা ফলোআপ-

➡টিভি+মিউজিক+স্যাটেলাইট রাইট=১৮০ কোটি।

➡হিন্দি ভার্শন কপিরাইট:- ৮০ কোটি

➡তেলেগু ভার্শন কপিরাইট:- ৭২ কোটি

➡কান্নাডা ভার্শন কপিরাইট:- ২৫ কোটি

➡কেরালা ভার্শন কপিরাইট:- ১০ কোটি

প্রায় ৩৭২ কোটি খরচ উঠে গিয়েছে এই সিনেমা মুক্তির আগেই। অপরদিকে প্রায় দশ হাজার হলে মুক্তি পেয়েছে ২.০ যা যেকোনো ভারতীয় সিনেমার জন্য রেকর্ড পরিমাণ।  ওভার-সিসে অস্ট্রেলিয়ায় ১৮১ হল, শ্রীলংকায় ৮১ হল সহ অনেক যায়গায় ইন্ডিয়ান সিনেমার ইতিহাসে হাইস্ট হল পেয়েছে মুভিটি। সেই হিসেবে মুভিটি যে ব্যবসা সফল হবে সেই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

এবার আসি মুভিটা কেমন হল সেই বিষয়ে।

মুঠোফোন বা সেলফোন যাই বলি না কেন, এই ছোট্ট বস্তু ছাড়া আমরা বলতে গেলে একদমই অচল। সেজন্যে দিনকে দিন বাড়ছে মোবাইল ফোনের ব্যাবহার। সেলফোনের ব্যাবহারের কারণে যে রেডিয়েশন সৃষ্টি হচ্ছে তাতে মারা যাচ্ছে লক্ষাধিক পাখি। আর এই বিষয় নিয়ে মূলত দাঁড়ায় ‘২.০’র কাহিনী। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ভাসিকরন (যার চরিত্রে করছেন রজনীকান্ত) যাকে আমরা যারা রবো মুভিতে মুখ্য চরিত্র রূপে দেখেছি, তিনি তাঁর যুগান্তকারী আবিষ্কার “চিট্টি-দ্যা রবো”কে রেখে দিয়েছিলেন। এর পিছনের কারণ রোবট মুভিটি দেখা থাকলে হয়তো কারো অজানা থাকার কথা না। কিন্তু তিনি এখন বাধ্য হয়েছেন সেই চিট্টিকে আবার ফেরত নিয়ে আসতে। এর পিছনের কারণ হিসেবে রয়েছেন এক পক্ষী মানব (অক্ষয় কুমার)। যে তাঁর তাণ্ডব চালাচ্ছে পুরো শহর জুড়ে। তাঁকে রুখতেই মূলত চিট্টির আবির্ভাব এবং পরবর্তীতে ২.০ ভার্শনে আপডেট হওয়া। এই হল মোটামুটি ‘২.০’র প্লট।

মুভির কাহিনী মোটামুটি ডেভলপড হয়েছে ভাল মতই। অভিনয়ের ক্ষেত্রে অক্ষয়ের মধ্যে বেস্টটাই দেখা গেছে। আর রজনীকান্ত স্যারের ব্যাপারে কি বলব, তাঁকে দেখেও বোঝার সাধ্য নেই ইনার বয়স প্রায় ৬০+। অসাধারণ অভিনয় আর মেকআপ পুরো বয়সটাকেই কাভার দিতে সক্ষম হয়েছে। মুভির অন্যতম এট্রাকশন হিসেবে এমি জ্যাকসনের অভিনয় আমার এতটা ভালো না লাগলেও, মাঝে মাঝে স্ক্রিনে তাঁর কিউটনেস দেখতে ভালোই লাগে। প্রথম হাফ আমার এভারেজ লেগেছে, যার জন্যে একটু হতাশ হলেও, লাস্ট হাফে অক্ষয়ের ব্যাক স্টোরি আমার সম্পূর্ণ হতাশা ঘুচিয়ে দিয়েছে। প্রতিটা অভিনেতা-অভিনেত্রী যে শ্রমটা দিয়েছেন এই মুভির পিছনে সেটা মুভিটি দেখলেই বুঝতে পারবেন। মুভিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে সম্প্রতি অক্ষয় কুমার এক ইন্টার্ভিউতে নিজের কিছু অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আপনাদের জন্যে সেটা তুলে ধরা হল-

“প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় লাগতো আমার মেকআপ করতে। থার্ড ডিগ্রীর মেকআপ যাকে বলে। রবারের মোটা কস্টিউম পড়তে হতো প্রতিটা শর্টের জন্যে। তার উপর পালক লাগানো সেগুলোর সাথে। চোখে মোটা লেন্স পড়ানো হতো, চোখের মণির চেয়েও মোটা সেই লেন্স। ২৪ ঘণ্টা চোখের ডাক্তার থাকতেন পাশে, তবুও একবার চোখে ইনফেকশন হয়েও গেছিলো আমার। শীততাপনিয়ন্ত্রিত খাঁচায় বন্দী করে রাখা হত আমাকে, কোন যায়গায় যাওয়ার অনুমতি ছিল না। কারণ মেকআপ গলে যেত নাহলে। শুট করে আবার এসে খাঁচায় ঢুকতাম। খাঁচার মধ্যেই আমার জন্য একটা বিছানা ছিলো। ৩৮ দিন এই মেক আপে টানা শুট করা আমার জন্য খুব কষ্টকর ছিল। টানা তিন দিন শুট করে একদিন বিশ্রাম পেতাম শুধু। তবে এত শত কষ্টের মাঝে প্রাপ্তির ঝুলিটাই বড়। এই প্রজেক্টের সাথে যুক্ত হওয়ার আমার একমাত্র কারণ ছিল, “থালাইভা-রজনীকান্ত” স্যার। রজনীকান্ত এমন ব্যক্তি যার ঘুষি খাওয়াও সম্মানের। সাউথের ইন্ড্রাস্টি থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। সাউথে অনেক দ্রুত শ্যুট সম্পন্ন হয়। ওনারা সময় নষ্ট করেনা এবং সবাই সময়মত উপস্থিত হয় সেটে। সাউথের সিনেমা আমাদের(বলিউড) থেকে প্রযুক্তির দিক দিয়েও এগিয়ে। ওখানকার টেকনিশিয়ানরা হলিউডের সাথে রীতিমত পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করেন। যেটা আসলেই গর্ব করার মতন একটা বিষয়।”

মুভিতে রজনীকান্তের মেকাপ করার বিহাইন্ড সীন দেখার জন্য ক্লিক করুন এখানে

মুভিতে অক্ষয় কুমারের মেকাপ করার বিহাইন্ড সীন দেখার জন্য ক্লিক করুন এখানে

‘২.০’ এর সকল কলাকুশলী

মুভির মিউজিকের দায়িত্বে ছিলেন এই উপমহাদেশের অন্যতম সেরা কম্পোজার অস্কার জয়ী এ.আর রহমান স্যার। এজন্যে মুভির সাউন্ডের এবং বিজিএমের উপস্থিতি ছিল।

এখন আসি মুভির কোন কোন অংশ আমার ভালো লাগেনি-

প্রথমেই বলে নেই এটা সাইফাই মুভি।তাই বহুত ইললজিক্যাল জিনিশ হজম করে নিতে হবে। তাই স্পয়লার দিকে খেয়াল রেখে পড়বেন।

এই মুভির বাজেটের সিংহভাগ খরচ হয়েছে এর ভিএফএক্স এর পিছনে, যার দায়িত্বে ছিল ‘লাইকা প্রোডাকশন’। যেহেতু আমি হল প্রিন্ট দিয়ে দেখেছি তাই ভিএফেক্সের কাজ নিয়ে কিছু বলা গাধামি ছাড়া আর কিছু হবে না। আশায় থাকব এইচডি রিলিজের যাতে ভিএফএক্সের মজা ভালোভাবে নিতে পারি। তবুও গ্রাফিক্সের কাজ যথেষ্টই ভাল এবং লজিক্যাল লেগেছে। তবে যেটা খারাপ লেগেছে সেটা মুভির প্লট হোল।

এমন এমন প্লট হোল আমার চোখে পড়ছে যেটা শঙ্করের এত বাজেটের একটা মুভির সাথে একদম বেমানান। অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক ভুল ছিলো মুভিতে। আপনি দাড়িয়ে দড়িয়ে ভুলগুলি ধরতে পারবেন।

  • শুরু হওয়ার পর দেখা যায় হঠাত করেই সবার ফোন আকাশে উড়ে যেতে থাকে। কিন্তু তাই বলে ভাসিকরনের রিসার্চ সেন্টারের ছাদ ফুটা করে রজনীকান্তের ফোনও আকাশে উড়ে যাবে। এই সিন দেখে নিজের হাতের ফোনটা উপরে ছাদের দিকে মেরে দেখার ইচ্ছা জেগেছিল কয় টুকরা হয়ে ফিরে আসে সেটা। সেইখানে তার ফোন দেখা যায় রিসার্চ সেন্টারের ছাদের মত এত শক্তিশালী বিল্ডিংও ফুটা করে চলে যায় সিরিয়াসলি ম্যান!!?
  • অন্যদিকে ‘২.০’রবো যখন পক্ষীরাজের উপরে বলের মত গোল হয়ে গুলি চালাচ্ছিল, সেই গুলি সেই গুলি স্টেডিয়ামে থাকা কারো গায়ে লাগছে না। কেউ আহতই হচ্ছে না। ব্যাপারটা হজম হলো না।
  • আবার ফিরে আসি মোবাইল উড়ে যাওয়ার সিনে। মোবাইল উড়তে দেখেও অনেকের মুখের ভাব ছিল একদম নরমাল। যেন তাদের সাথে এমন হরহামেশাই হয়। কয়েকজন বাদে কারো মুখেই এক্সপ্রেশনের ছিটে-ফোটা নেই। মানলাম শুটিং এর সময় হয়তো আসলেই মোবাইল উড়ে যায়নি, সবই টেকনোলজির কারসাজি। তাতে কি তাঁরা তো কো-আর্টিস্ট, পরিচালকের এই দিকে নজর দেওয়া উচিত ছিল।
  • সত্যি বলতে মাঝে মাঝে কার্টুন কার্টুন লেগেছে, তবে খুব বেশি দৃশ্যে না।
প্রখ্যাত বলিউঠ ক্রিটক্স তরন আদর্শের “one word review”

এই মুভির প্রশংসা করেছেন অনেক ক্রিটিক্স এবং মুভি রিলেটেড সাইট। দেখে নিন কিছু রেটিং:-

  • তরণ আদর্শ:- ৫/৫
  • রমেশ বালা:- ৪/৫
  • তামিল সেন্সর:- ৫/৫
  • বিহাইন্ডউডঃ- ৩.৭৫/৫
  • কলিউড আপডেটসঃ- ৫/৫
  • টাইমস অফ ইন্ডিয়াঃ- ৩/৫
  • তেলেগু ফিল্মনগরঃ- ৫/৫
  • ভিটু সিনেমাঃ- ৪.৫/৫
  • কলিউড সিনেমাঃ- ৪.৫/৫
  • দ্যা হ্যান্স ইন্ডিয়াঃ- ৩.২৫/৫
  • কইমইঃ- ৪/৫
  • ফিল্মিবিটঃ- ৪/৫
  • তেলেগুমিরচিঃ- ৩.৫/৫

আমি যেহেতু রেটিং সবসময় দশের ভেত্র দেই তাই আমার রেটিং হবে এই মুভির জন্যে ৭.৫/১০।

মুভিটি নিয়ে কিছু ফ্যাক্ট-

  • ছবিটির অবৈধ সংস্করণ যাতে ইন্টারনেটে ছড়াতে না পারে, সে জন্য ভারতের ঝুঁকিপূর্ণ ১২ হাজার ওয়েবসাইট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন মাদ্রাজের উচ্চ আদালত। ওই অঞ্চলের ৩৭টি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। ‘২.০’ চলচ্চিত্রের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান লাইকা প্রডাকশন প্রাইভেট লিমিটেডের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক এম সুন্দর গতকাল বুধবার এ আদেশ দেন। মামলার আগে প্রযোজনা সংস্থাটির পক্ষ থেকে ১২ হাজার ৫৬৪টি ওয়েবসাইটের একটি তালিকা করা হয়। এগুলোর মধ্যে দুই হাজার সাইটই পরিচালনা করে তামিল রকার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এমন পদক্ষেপ নেওয়া অযৌক্তিক নয়।বিশাল বাজেটে তৈরি করা হয়েছে ‘২.০’ ছবিটি। ম্যান্ডারিন, চীনাসহ পাঁচটি ভাষায় ডাবিং করা হয়েছে ‘২.০’। ছবিটির টেলিভিশন, ইন্টারনেট, ডিজিটাল এবং হোম ভিডিও স্বত্ব বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় মুক্তির পরই কোনও ওয়েবসাইটে যাতে ছবিটির অবৈধ সংস্করণ পাওয়া না যায়, সে ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ( তাতেও লাভ হয়নি, হল প্রিন্ট এসে পড়েছে)।
  • অপরদিকে ভারতের মুঠোফোন অপারেটরদের সংস্থা ‘সেলুলার অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া’ (সিওএআই) অভিযোগ এনেছে, এ ছবি মুঠোফোন ব্যবসার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের অভিযোগ, ‘২.০’ ছবিতে মুঠোফোন এবং মুঠোফোন টাওয়ারগুলোকে মানুষ ও পশুপাখিদের জন্য ক্ষতিকারক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত ছবির প্রদর্শনী বন্ধ রাখার দাবি করেছে সংস্থাটি।

মুভিটির ট্রেইলার লিংকঃ 2.0 movie trailer

মন্তব্য
লোডিং...