শারমিন সেতু’র গল্প- মেঘলার আজ মন ভাল নেই, আকাশ জুড়ে মেঘ

আকাশ ঢেকে দিয়ে ছাই রঙা কালো মেঘগুলো ছুটে আসছে, ঝড়ো হাওয়া বইছে ।  শোঁ শোঁ শব্দে মাতাল হাওয়া গাছগুলো ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিতে চাইছে যেন । মাতাল হাওয়ায় ঝরে পড়া গাছের পাতাগুলো মাতাল হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে নেচেই চলেছে । ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে । নীড় হারানোর ভয়ে পাখিগুলো এদিক সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য । অপেক্ষা ঘরে ফিরে যাবার ।

আচ্ছা পাখিরাও কি তাদের প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে? নাকি তাদের শুধুই ঘরে ফেরার তাড়া বিশ্রাম নেয়ার জন্য? ঝড়ে এলোমেলো পাখিগুলোকে দেখে হঠাৎ মেঘলার মনে হল, পাখিগুলো কি শুধুই নিজেদের জন্য বাঁচে নাকি তাদেরও প্রিয়জন আছে, তারাও কি তাদের প্রিয়জনদের কথা ভেবে বেঁচে থাকে? এ কথা মনে হতেই মেঘলার মনে হল, আচ্ছা তার কি কোন প্রিয়জন আছে? হয়ত আছে বা হয়ত নেই । কি এসে যায় তাতে?

এসব চিন্তা করতে করতে কখন যে মেঘলা আনমনা হয়ে গিয়েছে বুঝতেই পারেনি। হঠাৎ প্রচন্ড এক দমকা হাওয়া এসে মেঘলার চুলগুলো এলোমেলো করে দিল, সে বারান্দা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁয়ে দিচ্ছিল; এক শীতল অনুভূতিতে সে চিন্তার জগত থেকে বাস্তবতায় ফিরে এলো । ছোট ছোট শিলা পড়ছে । অবাক হয়ে মেঘলা দেখছে, কি অদ্ভুত সুন্দর সাদা শুভ্রতায় ধীরে ধীরে চারিদিক ছেয়ে যাচ্ছে! আনমনেই মেঘলা বলে উঠল, আহ কি সুন্দর! এক জীবনে বেঁচে থাকতে এর চেয়ে বেশী আর কি ই বা দরকার ?

হঠাৎ একটা মিষ্টি সুবাস এসে মেঘলাকে ছুঁয়ে দিল, মেঘলা চোখ বন্ধ করে ফেলল; বেলী ফুলের সুবাস ভেসে আসছে বাতাসে। তার বারান্দায় ঝাঁকে ঝাঁকে দেশী বেলী ফুটেছে । দেশী বেলী ছাড়া হাইব্রিড বেলীতে এত সুবাস নেই । এই দেশী বেলী ফুলের গাছটা কিনতে তাকে অনেক নার্সারী ঘুরতে হয়েছে। অনেক ঘোরাঘুরির পর সে এই দেশী বেলী ফুলের গাছটা পেয়েছে । যখন গাছ ভর্তি বেলী ফোটে আর চারপাশ সুবাস ভরে যায় তখন সেই চড়া রোদ্রে ঘুরে ঘুরে দেশী বেলী ফুলের গাছ কেনার পাগলামিটা সার্থক মনে হয় ।

বেলী ফুলের কথা মনে পড়তেই মেঘলার মনে হল, সে আকাশের কাছে একবার খুব আবদার করেছিল বেলী ফুলের মালা কিনে দিতে। কিন্তু তার আবদার আকাশ রাখেনি, বলেছিল তুই ই তো কিনে নিতে পারিস ; আমার কিনে দিতে হবে কেন? এরপর অনেকবার মেঘলা রাস্তায়, ফুলের দোকানে বেলী ফুলের মালা দেখেছে, দাম করেছে কিন্তু কেনা হয়নি; মাঝে মাঝে শুধু বাসের জানালা দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে মালাগুলোর দিকে চেয়ে থেকেছে । কোথাও থেকে একটা গানের সুর ভেসে আসছে, খুব চেনা কিন্তু খুব অস্পষ্ট । মেঘলা কিছুক্ষণ খুঁজে বের করার চেস্টা করল, কি গানের সুর হতে পারে? আবার এরপরেই মনে হল থাক না, কেন জানতেই হবে যে কি গানের সুর এটা! কিছু অজানা ভাল লাগা থাক, কিছু অচেনা সুর থাক; জীবন চলুক না তার রহস্যময় গতিতে ।

এসব ভাবতে ভাবতে কতটা সময় এমন কেটে গেছে মেঘলা জানে না, তার সৎবিৎ ফিরে এলো বিকটভাবে বাজ পড়ার শব্দে । খুব ঝড় উঠেছে প্রকৃতিতে। মেঘলার মনেও ঝড় চলছে । আকাশে বৃষ্টি ঝরছে, আর নিরবে নিঃশব্দে মেঘলার চোখে ঝরছে কান্না । সকাল থেকে তার আকাশকে খুব মনে পড়ছে । মেঘলার খুব ইচ্ছা এরকম ঝুম বৃষ্টিতে আকাশের হাত ধরে অনেকদূর হেঁটে যাবে । শন শন করে মাতাল হাওয়া বইবে, তাদের দুজনেরই চুল উড়বে দমকা হাওয়ায়; হাতে থাকে গরম কফির পেয়ালা । দুজনের দুহাত দুজনে আবদ্ধ আর অন্য দুহাতে কফির পেয়ালা। তারা দুজন হেঁটে যাচ্ছে, গন্তব্য অজানা । কফির কাপে টুপটাপ করে বৃষ্টির পানি পড়ে কফির স্বাদ পানি হয়ে যাচ্ছে তবু দুজনে সমান আনন্দে সেই জলমিশ্রিত কফি পান করে যাচ্ছে । হেঁটে যাচ্ছে তারা অনেকদূর । ব্যাকগ্রাঊন্ড মিউজিক হিসেবে বেজে যাচ্ছে, “ তুমি চেয়ে আছো তাই, আমি পথে হেঁটে যাই; হেঁটে হেঁটে বহুদূর বহুদূর যেতে চাই”।

blank

মেঘলার চোখের জল আরো গাঢ় হল । চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে তার । কারণ সে জানে আকাশকে নিয়ে তার এই ইচ্ছা কখনো পূরণ হবে না। কখনো এমন করে তার সাথে বৃষ্টি বিলাস করা হবে না। আচ্ছা আকাশ নামটা এত সিনেমাটিক কেন? ওর এমন সিনেমাটিক নাম কে রেখেছে? নিশ্চয় ওর বাবা মা খুব সিনেমা দেখে, নয়ত এমন সিনেমাটিক নাম কেন রাখবে? আবার এমনও হতে পারে, ওর বাবা মা চেয়েছিল যে, তাদের ছেলে আকাশের মত বিশাল হৃদয়ের অধিকারী হোক তাই এমন নাম রেখেছে। কি জানি, কখনো এক সময় ওকে জিজ্ঞাস করবে বলে ভেবে রাখল মেঘলা।

আকাশ আর মেঘলার সম্পর্ক বলতে কিছুই নেই আবার অনেক কিছুই আছে । এ সম্পর্কের কোন নাম নেই আবার অনেক নাম দেয়া যেতে পারে । এসব ভাবতে ভাবতেই মেঘলা দূর থেকে ভেসে আসা গানের সুরটা চিনতে পেরে গেল এতক্ষনে ।

শ্রীকান্তের “ আমার সারাটাদিন মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি তোমাকে দিলাম”। মেঘলার অনেক পছন্দের একটা গান, হয়ত যে শুনছে তার ও অনেক পছন্দের গান, কারন অনেকক্ষণ ধরেই গানটা এক নাগাড়ে বেজে যাচ্ছে । যদিও এক নাগাড়ে বেজে যাচ্ছে তবু কেন যেন গানটা শুনতে ভাল লাগছে। কেমন যেন আচ্ছন্নের মত লাগছে ।

আচ্ছা আকাশ এখন কি করছে? আচ্ছা এই গানটার সাথে কি কাকতালীয়ভাবেই না মেঘলা আর আকাশের নামটা একসাথে আছে! এটা ভেবেই মেঘলার মন আবার বিষাদে ছেয়ে গেল । চোখ ছলছল করে উঠল, সবকিছু আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে এলো। এক নাগাড়ে বৃষ্টি ঝরেই যাচ্ছে , ঝাপসা দৃষ্টিতে মেঘলা আকাশের দিকে তাকালো। এখনো আকাশে কালো মেঘ, এখনো পুরো আকাশের বুক জুড়ে রয়েছে মেঘেদের আনাগোনা । আচ্ছা, আমিও কি আকাশের পুরো মন জুড়ে এমনিভাবে আছি? আমিও তো মেঘ । মেঘলা । আকাশ আমাকে খুনসুটি করে মেঘ নামে ডাকে, বলে তুই তো মেঘ আমি ফুঁ দিলেই উড়ে যাবি । মাঝে মাঝে দুস্টমি করে বলে দেখ মেঘ, তোর সাথে আমার সম্পর্ক সৃষ্টির শুরু থেকেই। দেখ আমি হচ্ছি আকাশ আর তুই হচ্ছিস মেঘ। আমি চাইলেই তোকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারব । বলেই আকাশ অট্ট হাসি শুরু করে আর মেঘলা মুগ্ধ চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে । কি সুন্দর করেই না হাসে আকাশ ছেলেটা!

আকাশের কাছে মেঘলা মাঝেই মাঝেই বায়না ধরে কিন্তু আকাশ মেঘলার বায়নাগুলোকে মেঘের মতই উড়িয়ে দেয় । এ কথা মনে আসতেই মেঘলা নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফোনটার দিকে তাকাল, আকাশকে ফোন করার জন্য নাম্বার ডায়াল করল কিন্তু ফোন দিল না কারন আকাশ তার ফোন ধরবে না । অপলক দৃষ্টিতে মেঘলা ফোনের ডায়াল প্যাডের দিকে তাকিয়ে আছে ।

মেঘলার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে, দমকা হাওয়া এসে চুল উড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির জল, মেঘলার চোখের জল মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে । বেলী ফুল তার সুবাস ছড়িয়েই যাচ্ছে । দূরে কোথাও গান বেজেই যাচ্ছে, “আমার সারাটাদিন মেঘলা আকাশ বৃষ্টি তোমাকে দিলাম” ।