এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

সুখ খুঁজি বেঁচে থাকাতে-রৌদ্রছায়ার সাথে

ছবি- মাহফুজ ও শারমিন
ছবি কৃতজ্ঞতা- মাহফুজ ও শারমিন। ফটো ক্লিক- শাহ মোহাম্মদ কামরুল হাসান রানা

 

সোনালী ব্যাংকের এক্সাম দিতে গিয়েছিলাম ঢাকায়। পরীক্ষার পর বন্ধুরা মিলে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম টিএসসিতে। হঠাৎ আমার নাম ধরে কেউ একজন ডাক দিলো।

ফিরে দেখি চশমা পড়া শ্যামলা একটা মেয়ে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ব্যাচমেট। আমি ফিজিক্সের, সে মার্কেটিংয়ের। তবে আমাদের ২০০৬-০৭ ব্যাচের ফেসবুক গ্রুপটার এডমিন হওয়ায় অনেকেই আমাকে চেনে। এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয় আর ফ্রেন্ডলিস্টে ছিলো।

কাছে গিয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললাম, ‘কী অবস্থা? এক্সাম দিতে আসছো?’

‘হুম।’

‘একলা কেন? বয়ফ্রেন্ড কই?’

‘বয়ফ্রেন্ড থাকে লম্বা,ফর্সা আর সুন্দরীদের। আমিতো এর একটাও নই। তাই বয়ফ্রেন্ড নাই।’

দাড়ানো আমি তার পাশে বসে পড়লাম। তাকে বললাম,

‘সব ছেলেই লম্বা, ফর্সা, সুন্দরী খুঁজে কে বললো তোমাকে?’

‘দেখলাম তো অনেক। তুমিও চাইবা নিজের বেলায়।’

‘সবাই এক না বুঝলা।’

‘তুমি তাইলে কেমন মেয়ে চাও?’

‘আমার হবু বউয়ের তিনটি গুণ থাকলেই চলবে :

১. তাকে বইপ্রেমী মানে পড়ুয়া হতে হবে;

২. তাকে মিশুক হতে হবে;

৩. তাকে ভালো চা বানাতে পারতে হবে।’

আমার কথা শুনে সে হেসে উঠলো। বললো, দেখবো বিয়ের সময় তুমি তোমার কথায় থাকো কিনা। দাওয়াত দিবা কিন্তু!

সেদিনের পর থেকে কেন যেন তার সাথে ফেসবুকে চ্যাটিং বাড়লো। যদিও প্রায়ই কথা থাকতো ক্যারিয়ার নিয়ে। গ্রেজুয়েশন শেষ করা দু’জন প্রায়ই টেনশন করতাম। তখন আমি ধীরে ধীরে চাকরির পরীক্ষাগুলো টিকতে শুরু করেছি। ভাইভার জন্য ডাক পাচ্ছিলাম। কিন্তু ভুলেও তার কাছে ফোন নাম্বার চাইতাম না। এভাবে কেন যেন হৃদ্যতা বেড়ে গেলো। চ্যাটে প্রতিদিন খবর নেওয়াটা এক সময় অলিখিত নিয়মে পরিণত হলো।

একদিন সে বললো,

‘তুমি কি তোমার নাম্বারটা দিবা? নাকি ভাব নিবা?’

‘এসব মেয়েদেরই মানায়।’

নাম্বার দিলাম। এরপর নিয়মিতই কথা হতো। কখন যে দু’জন কাছে চলে এসেছি টেরও পাইনি। হৃদয় খুলে নিজের সব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কথা তাকে বলতাম। নতুন লেখা গান তাকে শোনানোটাই ছিলো তার রেগুলার আবদার। তাকে নাম দিলাম রৌদ্রছায়া। তাকে শোনালাম –

এই মেঘ এই রোদ্দুর দেখি

বিভ্রমে আটকে পড়া তাই,

বুঝি না সহজে সমীরণ

বসে আছি রৌদ্রছায়ায়…..

এক চন্দ্রাহত রাতে চ্যাটে তাকে মজা করেই বললাম,

‘প্রেম করবা?’

‘তোমার সাথে?’

‘আর কারো সাথে বললে খুশি হতে?’

‘না। তুমি হলে ভাবা যায়।’

মুহুর্তেই রাজ্যের সব সিরিয়াসনেস ভর করলো আমার মনে। ভাবতে লাগলাম, এমন কাউকেই ভালোবাসা যায়, মজা করা যায় না। এদিকে সে নক করেই যাচ্ছে। রিপ্লাই দিচ্ছি না কেন?

একটু পর তাকে বললাম,

‘তোমাকে আমি শুধু ভালোবাসতে চাই না, তোমার দায়িত্বও নিতে চাই।’

‘মানে?’

‘মানে আমি চাই আমরা দুইজন কিছুদিন সময় নিই। এই ধরো এক মাস। তুমিও ভাবো আমি তোমার জন্য পারফেক্ট কিনা। আমি চাই আমরা একটা ম্যাচিউরড রিলেশনে জড়াই।’

‘তুমি তোমারটা জানিয়ো। আমি এখনই বললাম শ্যামল বরণ ছেলেটা আমাকে প্রতিদিন কবিতাকে সুর দিয়ে শোনানোর দায়িত্ব নিক আজীবনের জন্য।’

আমি তবুও এক মাস সময় নিলাম। সে প্রতিদিন ফোন করতো আর বলতো আর কয়দিন বাকি?

এর মধ্যে ২৬ এপ্রিল, ২০১৫ ছিলো তার জন্মদিন। সে ভেবেছিলো আমি তাকে উইশ করবো দ্রুতই। আমি কল না দেওয়ায় বিকেলে কল দিয়ে সেই লেভেলের ঝাড়ি দিলো। আর বললো, ‘তুমি কেক আনো নাই কী হইছে? আমি ক্যান্ডি থেকে ৬ টাকা দিয়ে জিলাপি কিনে এনেছি। নিজে কেটে খেয়েছি। সেই মজা। তোমাকে দেই নাই।’

আমি শুনে হাসতে শুরু করায় মেজাজ খারাপ করে ফোন রেখে দিলো।

রাত ১২টা বাজার কিছুক্ষণ আগে তাকে কল দিলাম। বললাম,

‘রৌদ্রছায়াকে দায়িত্ব নিয়েই বলছি- ভালোবাসি। ভালোবাসি। ভালোবাসি।।।।’

সে চুপ। কিছুক্ষণ পর কান্না শুরু করলো। অনেকক্ষণ পর বললো,

‘তুমি শুধু আমায় কখনো অবহেলা করো না। আমি এটাকেই ভালোবাসা ভেবে নেবো।’

এরপর থেকে দু’জনার ক্যারিয়ার গড়ার সংগ্রাম আলাদা থাকেনি আর। একসাথে পড়া শুরু করলাম। যে মেয়ে টিউশনি করার সুবাধে চট্টগ্রাম শহরের অলিগলি সব চেনে, সে আমার কাছে বাচ্চা হয়ে গেলো। তাকে কখনো একলা ছাড়তাম না। আমিও টিউশনি করতাম আর কোচিং শেষে তাকে বাসায় পৌঁছে দিতাম। আর পরীক্ষা দেবার জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম ছুটোছুটি চলছিলোই।

একটু ফুসরত পেলে দু’জন রিকশায় ঘুরে বেড়াতাম পুরো চট্টলা শহর। একই ব্যাচের হয়েও ভার্সিটি লাইফে না করা প্রেমের পুরোটাই যেন করে ফেলার তাড়া। এমনিই এক রিকশা ভ্রমণের মুহূর্তে তাকে বলেছিলাম আগামী ছয় মাসের মধ্যেই বিয়ে করবো। মিরাকল ঘটলো একদিন পরেই। এপয়েন্টমেন্ট লেটার চলে আসলো হাতে। নিজের ডিপার্টমেন্টে আমার ব্যাচে সবার চেয়ে বাজে রেজাল্ট করা আমি পেয়ে গেলাম সবার আগে সবার চেয়ে ভালো জব। হয়ে গেলাম ব্যাংকার। তার আনন্দ দেখে কে?

এরমধ্যে তার বাবার ক্যান্সার ধরা পড়লো। তিনি তার মেয়েকে নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। একদিন আমার বাবা তাঁকে গিয়ে বললেন,’আপনার মেয়েটাকে আমাকে দিয়ে দিন।আমার একটা মেয়ে চাই।’ অসুস্থ মানুষটা নির্ভার হলেন। কিন্তু বিয়ের এক সপ্তাহ আগে তিনি মারা গেলেন।

২০মে, ২০১৫। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মেয়েটার দায়িত্ব নিলাম। বন্ধুমহলে সবার গর্বের শেষ নেই। তারা বলে, আমার বন্ধু একটা সুতোও যৌতুক না নিয়ে বিয়ে করেছে। আমাদের বন্ধু বলে কথা।

আমার বউটা এখন জোরেশোরে পড়ছে। তার বাবার স্বপ্ন তাকে পূরণ করতেই হবে। আমি অফিস থেকে এলেই সে আমার জন্য নাস্তা হিসেবে ম্যাথ দাগিয়ে রাখে। আর আমি করে দেই। আর আব্বু পাশের রুম থেকে মজা করে বলেন,’পরের মেয়েকে পড়ানোর জন্য ছেলেকে পড়িয়েছিলাম?’ আম্মু জবাব দেন,’পরের মেয়ে বলছেন কেন? ছেলের বউ চাকরি করলে কার সম্মান বাড়বে? আপনারইতো। চাকরির বেতন পেলে একটা ফতুয়া হলেও কিনে দিবে আপনাকে। তাই না?’

আব্বু হাসিমুখে হ্যাঁসূচক মাথা নাড়েন। আম্মুও হাসেন।

এভাবেই চলছে সংসার রৌদ্রছায়ার সাথে।

লেখকঃ মুহাম্মদ মাহফুজুল আলম পদার্থবিদ্যায় এমএস করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পেশায় একজন ব্যাংকার। ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। সবুজ ক্যাম্পাসের আবহ লেখালেখিকে বানিয়েছে তার নেশা। গল্প, কবিতা লেখায় তার সমান বিচরণ।

মন্তব্য
লোডিং...