একুশের কথামালা

আমাদের মফস্বলে একুশ নামতো খুব চুপটি করে।বয়েস কতো আর হবে তখন… ৭বা ৮।২০ ফেব্রুয়ারির সন্ধেতে আমাদের আর পড়তে বসা হতো না… শুরু হতো একুশের তোড়জোড়।আশেপাশের বাচ্চাকাচ্চা সব মিলে বড়সড কচু গাছের ডগা খুঁজে নিয়ে আসতাম।

এরপর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে গড়ে উঠতো শহীদ মিনার। নদী থেকে কিছু ভেজা কাঁদামাটি নিয়ে উঠোন করে দিতাম শহীদ মিনারের।তারপর শুরু হতো ফুলচুরির কাজ। এর বাড়ির জবা… ওর বাড়ির গাঁদাটা দিয়ে কেমন সুন্দর ভরে উঠতো আমাদের ছোট্ট মিনার।আমরা সারবেঁধে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতাম।সাদাকালো বইয়ের পাতা আমাদের চোখের সামনে কেমন রঙিন হয়ে উঠতো তখন! আর কখনো গলা মেলাতাম ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…!! তখনো জানা হয়নি সুরকার কে আর গীতিকার কে! কিন্তু ছোট্ট বুকটাতে আকাশ সমান আবেগ।

আমরা তো একুশ চিনেছি স্কুলের ছাপা বইটার প্ল্যাকার্ড থেকে… ‘ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।একটু বড় হয়ে উঠতেই কিভাবে যেন হারিয়ে গেল আমাদের হাতে বানানো শহীদ মিনার।

তারপর তো শুধু স্কুলের প্রভাতফেরি।কিন্তু কিছুতেই যেন মনে ভরতো না… সকাল হয়ে যেত কি না! ওখানে প্রভাতফেরির গান’ হতো না… হয়তো মেয়েরা তখনো রাস্তায় গান করার আড় ভেঙে উঠতে পারে নি বলে!
আমার শুধু মন ভরতো না।

এরপর আর প্রভাতফেরিতেও যাওয়া হতো না।

২০ তারিখ রাত থেকে বিটিভি’র সামনে বসে বসে চারুকলার ছেলেমেয়েদের দেখতাম শহীদ মিনারকে রাঙিয়ে দিচ্ছে।আমার ভীষন ইচ্ছে হতো ওদের সাথে গিয়ে হাত লাগাই… কিন্তু আর হয়ে উঠে নি কখনো।পরদিন সকালে উঠেই আবার চোখ বিটিভি’র পর্দায়.. পেছনে ভরাট কন্ঠে আবৃত্তি আর স্ক্রিনে দলে দলে মানুষের ঢল।ভাবতাম একদিন আমিও থাকবো ওদের দলে।

কলেজে সেইবার দায়িত্ব পড়লো ফুলের ডালি কিনতে হবে একুশের জন্য।ভাবলাম এরচেয়ে নিজহাতে বানাই বরং। যেইভাবা সেই ছুটলাম চেরাগীর মোড়ে।একটা ককশিট আর সামান্য কিছু ফুল কিনে কাজ শুরু করে দিলাম।কি ভীষন আনন্দ তখন!ভাঙ্গা ভাঙ্গা হাতে লিখলাম ‘অমর ২১ এর শ্রদ্ধাঞ্জলী’।সব কাজ শেষ করে দেখি একজায়গায় বানান ভুল করে বসে আছি।এতো মন খারাপ হলো… ইচ্ছে হচ্ছিলো তক্ষুনি মরে যাই!

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ কটি বছরেও রুমে বসে বসে নিজ হাতে ডালি বানিয়েছি।প্রত্যেকটি গাঁদায় যে পরিমান মমতা মাখানো থাকে.. মনে হয় একজনমে শেষ করা যাবে না!

সকালে ফুল দিতে যাওয়ার চেয়ে এই কাজে আমি কি ভীষণ আনন্দ পেতাম!এই তো দু’বছর আগের কথা..
আমার প্রথমবারের মতো একুশের প্রথম প্রহর কেটেছে শাহবাগ মোড়ে।ছেলেমেয়েগুলো কি সুন্দর পথনাটক করছিলো! দেশের অন্য কোন জায়গায় আমি এটা কল্পনাও করতে পারি না।

ঢাকার প্রতি টান সেবার আরো একটুখানি বেড়েছিলো।

প্রথম যেবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার দেখলাম তখনো মাথায় ঢুকেনি… এটা কোন আড্ডার জায়গা হতে পারে!
আমি এখন চাইলেই যেতে পারি এখনো।কিন্তু এতো ভীড় ঠেলে লৌকিকতা করতে মন সায় দেয় না।

আমার কাছে একুশ মানে তো কাদামাটির গন্ধ…
কঁচুগাছের কষ… ইস্কুলের বইয়ের প্ল্যাকার্ড আর ভুল বানানের কষ্ট।

এই পোড়া শহরে আমি আজো কচি হাতে গড়া একটা শহীদ মিনারের খোঁজে আছি… কিছু পলাশ ফুল দিব বলে।
“আমি জনম জনম রাখবো ধরে ভাই হারানোর জ্বালা…”

অনু-কথা
৯ ফাল্গুন, ১৪২৪