এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

এল চ্যাপো, একবিংশ শতাব্দীর ড্রাগ লর্ড

ড্রাগস চোরাচালানের ম্যাক্সিকো-আমেরিকা সীমান্তে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত সুড়ঙ্গ যার নেতৃত্বে খোড়া হয়েছিল।

351

জ্যাকুইন গুজম্যান। পুরো নাম জ্যাকুইন আর্কিভাল্ডো গুজম্যান লোয়েরা। বর্তমান বিশ্বে সংক্ষেপে যিনি ‘এল চ্যাপো‘ নামেই পরিচিত। ইনি ম্যাক্সিকোর সিনালোয়া রাজ্যের বাদিরাগুয়াতো মিউনিসিপ্যালিটিতে অবস্থিত লা টুনা নামের ছোট্ট একটি গ্রামে ১৯৫৪ বা মতান্তরে ১৯৫৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি হচ্ছেন সিনালোয়া ড্রাগ কার্টেলের প্রধান, যেটি হচ্ছে একবিংশ

ছবিঃ এল চ্যাপোশতাব্দীর  সবচেয়ে শক্তিশালী মেক্সিকান ক্রিমিন্যাল সংস্থার একটি। এছাড়াও তিনি মাটির নিচে টানেল বা সুড়ঙ্গ খোড়াকে মোটামুটি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।

গুজম্যানের জন্মস্থানটি আসলে মেক্সিকোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দুরবর্তী পাহাড়ী সিনালোয়া রাজ্যের একটি দরিদ্র এলাকা, যা অনেক আগে থেকেই কুখ্যাত বহু মাদক পাচারকারীদের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। আশির দশকেই তিনি মূলত গুয়াডালজারা ড্রাগ কার্টেলের সদস্য হিসেবে তার ক্রিমিন্যাল জীবনের কর্মসূচী শুরু করেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল ফেলিক্স গালার্ডোর মত গডফাদার। গুজম্যান তার বেপরোয়া কর্মকান্ডের মাধ্যমে ড্রাগ কার্টলে দ্রুত নিজের অবস্থানের উন্নতি ঘটান। আশির দশকের শেষ দিকে যখন গুয়াডালজারা ভেঙ্গে যায়, তখন তিনি সিনালোয়া কার্টেলের নেতা হন। তাঁর নেতৃত্বেই পরবর্তীতে সিনালোয়া কার্টেল মেক্সিকো-ইউএস বর্ডারের নিচ দিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত টানেল নির্মাণ সহ নিত্য নতুন বিভিন্ন ধরনের চোরাচালান কৌশল রপ্ত করেছিল। কৌশলগুলোর মধ্যে চিলি পিপার ক্যান (লাল মরিচের ক্যান) এর মধ্যে, অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রাদির মধ্যে, ওষুধসামগ্রীর মধ্যে লুকিয়ে ড্রাগসের চোরাচালান আমেরিকায় পাঠানো ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তাঁর সংগঠনটি মারিজুয়ানা (গাঁজা), হেরোইন, কোকেইন এবং মেথামফেটামাইনসহ বিভিন্ন ধরনের অবৈধ ওষুধের উৎপাদন ও চোরাচালানের সাথে যুক্ত ছিল।

ছবিঃ তার ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি প্রিজন সেলের বাথরুমে কাটা সুড়ঙ্গমুখ

১৯৯৩ সালে গুয়েতেমালায় একজনকে খুন করতে গিয়ে গুজম্যান গ্রেফতার হন এবং তাকে মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানো হয়। পরবর্তিতে তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ এনে বিচারের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সে যাত্রায় হত্যার অভিযোগ থেকে ছাড়া পেয়ে গেলেও উল্টো মাদক পাচার ও আগ্নেয়াস্ত্র রাখার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল এবং তাকে সর্বাধিক নিরাপত্তা কারাগার বা ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি প্রিজনে ২০ বছরেরও বেশি শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন ধরনের ঘুষ ও জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি কারাগার কর্তৃপক্ষের থেকে ব্যাপক স্বাধীনতা আদায় করে নিয়েছিলেন এবং তখন কারাগারে বসেই তার ড্রাগ কার্টল পরিচালনা করতেন। ২০০১ সালে তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত কারারক্ষীর সহায়তা নিয়ে কারাগার থেকে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে এই কেসের তদন্তে সেই কারাগারের ওয়ার্ডেন সহ অন্যান্য অনেক কর্মচারীর দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হয়।

একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, কলম্বিয়া ও মেক্সিকো থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হওয়া মারিজুয়ানা এবং কোকেইনের অধিকাংশই গুজম্যানের হাত দিয়ে আসত বলে ধারণা করা হত। আর তাকে অনেক আগেই এশিয়া-মেক্সিকো-ইউএস ট্রাই-অ্যাঙ্গেলে মেথামফেটামাইনের বৃহত্তম চোরাচালানকারী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তিনি এশিয়ান ক্যামিকেলের মাধ্যমে মেক্সিকোতে ম্যাথামফেটামিন তৈরি করতেন এবং তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চোরাচালান করতেন। ২০০৯ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি আর্টিকেলে তার মোট সম্পত্তির মুল্য বলা হয় এক বিলিয়ন ডলারের মত। এছাড়াও অন্যান্য কিছু সোর্স থেকে তার কার্টেলের বার্ষিক আয় মোটামুটি তিন বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি দাবী করা হয়েছিল। মেক্সিকোতে গুজম্যানের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি কিছু মানুষ তাকে নায়ক হিসেবে গৌরবান্বিত করে তাকে জনপ্রিয়তার শিখরে তুলেছিল। অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে অনেক জনপ্রিয় নরকোকোরিদোস বা ড্রাগ ব্যাল্যাডে তার তার জীবনকাহিনী থেকে গানও রচনা করা হয়েছিল।

ছবিঃ সুড়ঙ্গের মাটি টানার মোটরসাইকেল; যেটি সামনে-পিছনে দুদিকেই যেতে পারে

এমন অবস্থার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র সরকার মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য হিসাবে গুজম্যানকে দাঁড় করায়। ২০০৪ সালে মার্কিন সরকার ফেডারেল ড্রাগ চার্জ নেভিগেশন তাকে গ্রেফতারের লক্ষ্যে শুধু তথ্য প্রদানের জন্য ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে। ২০১২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট গুজম্যানকে “বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মাদক পাচারকারী” হিসেবে ঘোষণা দেয় এবং একই সাথে ফরেইন নারকোটিক কিংপিন ডিজাইন অ্যাক্ট জারী করে তার পরিবারের সদস্যদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদগুলি ফ্রিজ করার জন্য নির্দেশ দেয়।

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে, সিনিলোয়া কার্টেল প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য একটি কার্টেলের সাথে রক্তক্ষয়ী দন্দে লিপ্ত হয় এবং মেক্সিকান প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের প্রদানকৃত তথ্য অনুযায়ী সে যাত্রায় তারা প্রায় দশ হাজার মানুষ হত্যা করেছিল। ২০০৬ সালে মেক্সিকান সেনাবাহিনী ড্রাগ কার্টেলগুলির বিরুদ্ধে পূর্ণ আকারের তৎপরতা চালায়। এর ফলে অনেক ট্র্যাফিকারের গ্রেফতার হয় বটে, তবে তারা প্রধান কার্টেলগুলি ধ্বংস করতে বা গুজম্যানকে ধরতে ব্যর্থ হয়। এর কয়েক বছর পর ২০১৪ সালে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় ফেব্রুয়ারী মাসে মেক্সিকোর মাজাৎলান শহরে গুজম্যানকে আটক করা হয়। এই গ্রেফতারের সফলতা ছিল ইউএস ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন  এবং মেক্সিকোর মেরিনদের দ্বারা পরিচালিত এক সপ্তাহের দীর্ঘ এক অভিযানের ফসল।

এরপর ১১ই জুলাই, ২০১৫ এর রাতে গুজম্যান আবারো অ্যাল্টিপানো ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি প্রিজন থেকে পালিয়ে যান। এটি ছিল মানব ইতিহাসের সবথেকে সুপরিকল্পিত জেলব্রেকের ঘটনা। তার দলের লোকেরা প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে একটি কন্সট্রাকশন সাইট থেকে শুরু করে একটি লম্বা সুড়ঙ্গ খূড়ে, যার শেষ মাথা ঠিক সুপরিকল্পিতভাবেই তার নির্ধারিত সেলের বাথরুমের নীচে এসে শেষ হয়। প্রায় ৫.৬ ফুট বা ১.৭ মিটার) উচ্চতার কাঠের-সুরক্ষিত টানেল ব্যাবহার করে সেবার গুজম্যান পালিয়ে যায়। এই সুড়ঙ্গ মাত্র একটি শাবল ও হাতুড়ি দ্বারা আট মাসের মধ্যেই খোড়া হয়েছিল যেখানে আলো এবং বায়ুচলাচল এর জন্য জেনারেটর ও পাথুরে মাটি টানার জন্য মোটরসাইকেলের পিছনে একটি ট্রাকের ভগ্নাংশ ব্যাবহার করা হয়েছিল। এই ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে, কেননা তাকে প্রিজনে আনার পরে থেকেই তার প্রতিটি পদক্ষেপ, ইমেইল, ফোন কল ও গেস্ট ভিজিট সকল কিছুই নিশ্ছিদ্র ব্যাবস্থায় লক্ষ্য করা হচ্ছিল। কিন্তু এমন ঘটনা ঘটবে তার কোন ক্লু কেউ কোথাও পায় নি। পরবর্তীতে আবার ৮ই জানুয়ারী ২০১৬ সালে মারাত্মক এক শ্যুটআউটের পরে সিনালোয়ার লোস মুচিসে গুজম্যানকে বন্দী করা হয়। পরের বছর তাকে বিভিন্ন অপরাধ, মাদক পাচার, অর্থ লন্ডারিং এবং হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এবং তীব্র নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে ২০১৮ সালের নভেম্বরে তার বিচার শুরু হয়।

উৎস Britannica Wikipedia ABC News
মন্তব্য
লোডিং...