এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

বিটিভির ৭টি কার্টুন- যা আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই ছোট্টবেলায়!

৯০-এর দশকের কথা। তখনো স্যাটেলাইট চ্যানেলের প্রচলন এদিকটায় শুরু হয়নি। বিটিভি-ই ছিল আমাদের চিত্ত বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। এই বিটিভিতেই আমাদের কার্টুন দেখার শুরু, জাপানি ম্যাঙ্গা অ্যানিম দেখার শুরু, বিদেশী সিরিজ দেখা শুরু। এই বিটিভিই আমাদের দিয়েছে এক টুকরো রঙিন শৈশব। কালের বিবর্তনে এখন আমাদের হয়ত আর এই চ্যানেল দেখা হয় না, কিন্তু শৈশবের বিটিভিময় সেই বর্ণিল স্মৃতি কি আদৌ কখনো ভোলা সম্ভব? আমাদের নব্বই-এর দশকের বাচ্চাদের পক্ষে অন্তত না! এই ২০১৭-তে এসেও বিটিভিতে প্রচার হওয়া সেই সব কার্টুন আমাদের নস্টালজিক করে দেয়। চলুন না… শৈশবের সেই বর্ণিল দিনগুলো থেকে একটা ট্যুর দিয়ে আসি!

৭। গডজিলা- দ্য সিরিজ

https://www.youtube.com/watch?v=1b2CtgkwJQA

আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে প্রতি মঙ্গলবার স্কুলের শেষের ক্লাসগুলোতে আমার বিরামহীন ছটপটানির কথা! তারপর স্কুল ছুটি হলেই এক দৌড়ে বাড়ি এসে টিভির সামনে গডজিলা দেখতে বসে পড়ার কথা, নাওয়া-খাওয়ার খবর কে রাখে! গডজিলা দেখা ছাড়া মঙ্গলবারটা যেন পূর্ণই হত না, আর কোনক্রমে এক সপ্তাহ মিস করে গেলে পরের এক সপ্তাহ মুখ বেজার করে রাখতাম! গডজিলা- দ্য সিরিজের মাধ্যমেই আমার Kingog Kaiju-র সাথে প্রথম পরিচয়। জাপানের তোউহো স্টুডিও সিরিজটি বানিয়েছিল। গডজিলা জুনিয়র ছিল এই সিরিজের মূল চরিত্র।

৬। জুমানজি

বুধবারের বিকেলটা অসাধারণ কাটত অ্যালেন, জুডি আর পিটারের সাথে! প্রতি পর্বেই থাকত তাদের নিত্য নতুন অ্যাডভেঞ্চারের গল্প। জুমানজির মুভি অ্যাডাপ্টেশানের চেয়েও আমার কাছে অ্যানিমেশান সিরিজটাই বেশি ভালো লেগেছে। ভিলেনরাও ছিল মারাত্মক। ভ্যান পেল্ট, ট্রেডার স্লিক, প্রফেসর ইবসেন– তাদের কথা কি কেউ কখনো ভুলতে পারবে? অন্য বাকি সব কার্টুন সিরিজের চেয়ে জুমানজির সিজন ফিনেলেটা ছিল ঢের ভাল যেখানে অ্যালেন শেষ পর্যন্ত তার সমস্ত ক্লু সমাধান করে জুমানজির জাদুর দুনিয়া থেকে বাস্তবের দুনিয়ায় ফিরে আসে।

৫। উডি উডপেকার

এত বছর পরেও আমাদের দেখা কোন ফানি কার্টুন সিরিজের কথা বলতে গেলে প্রথমেই নাম আসবে উডি উডপেকারের। যদি বহিঃবিশ্বে উডি মিকি মাউজ কিংবা বাগস বানির মত এতটা জনপ্রিয় ছিল না, কিন্তু আমার উডিই সবচেয়ে ফেবারেট অ্যানিমেল কার্টুন। কারো কারো কাছে অবশ্য উডির ‘হেহেহে হেহ’ বিখ্যাত আইকনিক হাসিটি অস্বস্তিকর লাগতে পারে, কিন্তু জানিয়ে রাখি এই হাসিটিই আমার শৈশবকে রঙিন করেছিল!

৪। ক্যাপ্টেন প্লানেট

“Captain Planet, he’s our hero, gonna take pollution down to zero!”- সত্যি করে বলুন তো, ক্যাপ্টেন প্লানেট নামটি চোখে পড়ার পর পরই কার্টুনের থিমটি সংটি কি আপনার মাথায় বেজে উঠে নি? কিম (আর্থ), হুইলার (ফায়ার), লিংকা (উইন্ড), জি (ওয়াটার), মা-তি (হার্ট) আর এদের পাঁচজনের মিলিত শক্তির সমষ্টি ক্যাপ্টেন প্লানেটকে নিয়েই সিরিজটি, প্রকৃতি মাতার (মাদার নেচার) যেকোন বিপদেই যারা জীবন বাজি রেখে লড়ে। সুপারম্যান, ব্যাটম্যান, আইরনম্যান, স্পাইডারম্যানদের মত সুপারহিরোদের ভীড়ে ক্যাপ্টেন প্লানেটের নাম এখন আর শোনা যায় না হয়ত, কিন্তু আমার দেখা প্রথম সুপার হিরো কিন্তু ক্যাপ্টেন প্লানেটই! সত্যি বলতে কি, এখনকার চোখ ধাঁধানো ভিএফএক্সের যুগে যদি আগের সাদামাটা ক্যাপ্টেন প্লানেট দেখতে বসি খুব একটা হয়ত ভালো লাগবে না, কিন্তু শৈশবে দেখা পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে ক্যাপ্টেন প্লানেটের সেই সংগ্রাম আমাদের অনেক বেশিই প্রভাবিত করেছিল।

৩। সামুরাই এক্স

আজ ড্রাগন বল হয়ত বিশ্ব কাঁপাচ্ছে কিন্তু নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে দেখানো সামুরাই এক্সের মাধ্যমেই জাপানি ম্যাঙ্গা অ্যানিমে আমার প্রথম হাতেখড়ি, প্রথম অ্যানিমের প্রেমে পড়া। মেইজি যুগের এক জাপানি তলোয়ার যোদ্ধার জীবন নিয়েই সামুরাই এক্সের (অরিজিনাল নেম- রুরোনি ক্যানসিন) কাহিনী। অবশ্য বিটিভিতে কেবল প্রথম দিকের অল্প কয়েকটি এপিসোডই দেখানো হয়েছিল। যদি ম্যাঙ্গা ভালোবাসেন আর বিটিভির বাইরে সামুরাই এক্সের আর কোন এপিসোড না দেখে থাকেন, তবে আপনার জন্য সুখবর- সব কাজ পেলে এখনই পুরো সিরিজটি দেখে ফেলুন! সিরিজের বাইরে তিনটি আলাদা মুভিও আছে সামুরাই এক্সের। প্রথম মুভি সামুরাই এক্সঃ বিশ্বাস আর বিশ্বাসঘাতকতা (Samurai X: Trust and Betrayal) মূল সিরিজের প্রিক্যুয়েল যেখানে হিরো ক্যানসিনের সারাদিন মুখ বেজার করে রাখার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে! বাকি মুভিগুলোও বেশ ভাল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, হিমুরা ক্যানসিন (সামুরাই এক্স) চরিত্রটি কিন্তু জাপানের এক বিখ্যাত সামুরাই যোদ্ধা কাউকামি গেনসাই এর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নেয়া হয়েছে, যাকে ১৮৭২ সালে জাপান সরকার মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল।  

২। টম এন্ড জেরি

https://www.youtube.com/watch?v=j4JCvWhTVLw

যদি প্রশ্ন করা হয় গত অর্ধশতাব্দিতে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি দেখা কার্টুন সিরিজ কোনটি তবে নিশ্চিতভাবেই উত্তরটি হবে টম এন্ড জেরি! জি, অন্য অনেকের মত আমিও এই সিরিজটি প্রথম দেখি বিটিভিতে। আর প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে যাই হাবাগোবা টম আর দুরন্ত জেরির। সেই প্রেম এতই গভীর যে আমার মনে হয়না আমি যখন বুড়ো হবো তখনও এই সিরিজ দেখা থামাতে পারবো! হয়ত দেখা যাবে নাতি/নাতনীর সাথে আমিও বসে বসে টম এন্ড জেরি দেখছি!

১। মীনা

মীনা (Meena) কে ছাড়া বিটিভির কার্টুন লিস্ট কখনোই পূর্ণ হবে না। মীনাই আমাদের শিখিয়েছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার গুরত্ব, নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, শিশুশ্রমের বিরুদ্ধাচরণ, পরিবারে ছেলে-মেয়েকে সমান গুরত্ব দেয়া, যৌতুকের কুফলসহ জীবনের নানা গুরত্বপূর্ণ দিক যা আমাদের আরো সভ্য হতে সাহায্য করেছে। ইউনিসেফের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত হওয়া মীনা শুধু বাংলাদেশেই নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতেই গুরত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে। অন্যান্য কার্টুন গুলোর সাথে মীনার পার্থক্য হল- বাকিগুলো আমাদের শুধু আনন্দই দিয়েছে, কিন্তু মীনা আনন্দ দানের পাশাপাশি আমাদেরকে শিখিয়েছে মূল্যবান সব জীবনবোধ, বদলে দিয়েছে লাখো শিশুর জীবন। বয়স যতই বাড়ুক আমাদের, শৈশবে মীনা, রাজু আর মিঠুর গল্পচ্ছ্বলে শেখানো সেইসব শিক্ষা আজীবন আমাদের সাথেই থাকবে।

মন্তব্য
লোডিং...