এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

অটোম্যান সাম্রাজ্য এবং তার অভ্যুদয়কালীন সুলতানগণ…

2,906

- Advertisement -

অটোম্যান সাম্রাজ্যের অভ্যুদয়ের সময়কে মোটামুটি ১২৯৯ সালে এর প্রতিষ্ঠা লাভ থেকে শুরু করে ১৪৫৩ সালে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল জয় পর্যন্ত বিস্তৃত বলে ধরে নেয়া যায়। এ সময়েই পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সুলতানের শাসনামলে বিকশিত হতে থাকে অটোম্যান সাম্রাজ্য। শুরুতে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য রাজ্যের মতো অটোম্যান সাম্রাজ্যও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মূলত স্থানীয় নানা সেনাপতি ও সামন্ত রাজ্যের শাসনের উপর নির্ভরশীল ছিলো। ধীরে ধীরে সময় যেতে থাকে, পরিবর্তিত হতে থাকে অটোম্যান সাম্রাজ্যের অবস্থাও। সামরিক-অর্থনৈতিক উন্নতি তাদের রাজ্য বিস্তারের পক্ষে আরো সহায়ক ভূমিকা পালন করতে থাকে।এ সময়ে অটোম্যানদের সফলতার পেছনে একক কোনো কারণকে মূল নিয়ামক হিসেবে দাঁড় করাতে নারাজ ঐতিহাসিকেরা। বরং তাদের মতে পরিবর্তিত নানা পরিবেশের সাথে দ্রুত নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারাই ছিলো নবগঠিত রাজ্যের সফলতার মূল কারণ।

অটোম্যান সাম্রাজ্যের অভ্যুদয়কালীন সুলতানদের মাঝে একে একে সিংহাসনে এসেছেন ওসমান গাজী, ওরহান গাজী, প্রথম মুরাদ ও প্রথম বায়েজিদ,প্রথম সুলাইমান । আজকের মূলত উসমানীয় যুগের সবচেয়ে ক্ষমতাশীল সুলতানদের  ঘিরেই সাজানো হয়েছে আমাদের পুরো লেখা।

ওসমান গাজী

ওসমান গাজী

অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ওসমান গাজী। ১২৯৯ সালে তার হাত ধরে যাত্রা শুরু করা অটোম্যান সাম্রাজ্যের সূর্য ১৯২২ সালে সুলতানি শাসনের বিলোপ সাধনের মধ্য দিয়ে অস্ত যায়। কারো কারো মতে ১৯২৩ সালে রিপাবলিক অফ টার্কির অভ্যুদয়ের মাঝ দিয়ে, আবার কারো মতে ১৯২৪ সালে খেলাফতের পতনের মাঝ দিয়ে পতন ঘটে ওসমান গাজীর প্রতিষ্ঠিত অটোম্যান সাম্রাজ্যের।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো- ওসমান গাজীর শাসনামল সম্পর্কে খুব কমই জানা গিয়েছে। তার মৃত্যুর প্রায় এক শতাব্দী পর ঐতিহাসিকেরা তার জীবনী রচনায় হাত দিয়েছিলেন।ওসমান গাজী কবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই বিষয়েও রয়েছে বিতর্ক। ১২৫৪, ১২৫৫ কিংবা ১২৫৯- এ তিন বছরের যেকোনো একটিতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি।

ওরহান গাজী

দ্বিতীয় সুলতান ওরহান গাজী

অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ওসমান গাজীর প্রথম সন্তানের নাম ছিলো ওরহান গাজী। ১২৮১ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়কালে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দাদা আর্তুগ্রুল শখ করে নাতির নাম রেখেছিলেন ওরহান।

বাবা-মায়ের আদর-শাসনে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন ওরহান গাজী। তার শৈশব ও কৈশোর সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় নি। সুঠাম দেহের অধিকারী ওরহান বাবা ওসমান গাজীর বেশ প্রিয় ছিলেন। ভবিষ্যতের কথা ভেবেই হয়তো তিনি ছেলেকে সবসময় নিজের সাথে সাথে রাখতেন, হাতে-কলমে শেখাতে চাইতেন একজন সুলতানের নানা দায়িত্ব-কর্তব্য। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, বিশ বছর বয়সী ওরহানকে একবার ওসমান গাজী ছোট প্রদেশ নাকিহিরের দেখাশোনা করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ১৩০৯ সালে তিনি সেখান থেকে রাজধানী সগুতে ফিরে আসেন।১৩২৬ সালে সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জমান ওসমান গাজী। এরপরই তার স্থলাভিষিক্ত হন ওরহান গাজী, নাম লেখান উদীয়মান অটোম্যান সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সুলতান হিসেবে। অত্যন্ত সহৃদয়, ক্ষমাশীল, ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন ওরহান গাজী। ধর্মশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞগণ ছিলেন তার বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র। চারিত্রিক দৃঢ়তা, ধৈর্যশীলতা, আশেপাশের লোকজনের নিয়মিত খোঁজখবর রাখার মতো গুণাবলী অল্প সময়ের মাঝেই ওরহানকে জনতার হৃদয়ে পাকাপোক্ত আসন তৈরি করে দিয়েছিলো।

দ্বিতীয় বায়েজীদ

দ্বিতীয় বায়েজীদ

দ্বিতীয় বায়েজীদ (৩ ডিসেম্বর ১৪৪৭ – ২৬ মে ১৫১২)  ছিলেন উসমানীয় সুলতান। ১৪৮১ থেকে ১৫১২ সাল পর্যন্ত তিনি রাজত্ব করেছেন। বায়েজীদ সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদের জ্যেষ্ঠ পুত্র। বায়েজীদ তার শাসনামলে উসমানীয় সাম্রাজ্যের শক্তি বৃদ্ধি করেন। আলহাম্বরা ডিক্রি ঘোষণার পর উসমানীয় সাম্রাজ্যে স্পেনের ইহুদিদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জন্য তিনি খ্যাত।সিংহাসন নিয়ে বায়েজীদের সাথে তার ভাই জেমের প্রতিদ্বন্দ্বীতা তৈরী হয়। জেম সিংহাসন দাবি করে মিশরের মামলুকদের কাছ থেকে সহায়তা চান। জেম বায়েজীদের কাছে পরাজিত হন এবং এরপর রোডসের নাইটদেরকাছে আশ্রয় নেন। নাইটরা তাকে পোপ অষ্টম ইনোসেন্টের কাছে সোপর্দ করে। পোপ ইউরোপ থেকে তুর্কিদের তাড়ানোর জন্য জেমকে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পোপের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।বায়েজীদ ১৪৮১ সালে উসমানীয় সিংহাসনে বসেন।বায়েজীদ তার পিতার মত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্বাভাবিক গতি নিশ্চিত করেছিলেন বলে তিনি “ন্যায়পরায়ণ” নামে পরিচিত হয়েছিলেন। তিনি মোরিয়ার ভেনিসিয়ানদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছেন। ১৫০১ সালে ভেনিসিয়ানদের সাথে যুদ্ধ সমাপ্ত হয় এবং বায়েজীদ সমগ্র পেলোপোনিসের নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন। পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহ বায়েজীদের শাসনামলে অস্থিরতা তৈরী করেছিল। এতে অনেক সময় ইরানের শাহ প্রথম ইসমাইল মদদ দিয়েছেন।

প্রথম সেলিম

প্রথম সেলিম

প্রথম সেলিম ডাকনাম ইয়াভুজ (১০ অক্টোবর ১৪৬৫/১৪৬৬/১৪৭০ – ২২ সেপ্টেম্বর ১৫২০) ছিলেন প্রথম উসমানীয় খলিফা এবং নবম উসমানীয় সুলতান। ১৫১২ থেকে ১৫২০ সাল পর্যন্ত উসমানীয় সুলতান ছিলেন।সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃতির জন্য তার শাসনামল পরিচিত। ১৫১৬ থেকে ১৫১৭ সাল পর্যন্ত চলমান যুদ্ধে উসমানীয়রা মিশরের মামলুক সালতানাত জয় করে নেয়। এর ফলে লেভান্ট, হেজাজ, তিহামাহ ও মিশর উসমানীয়দের অধিকারে আসে। তিনি ১৫১৭ সালে খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন উপাধি ধারণ করেন। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল জয় এবং একীভূত করার মাধ্যমে সেলিম মক্কা ও মদিনার রক্ষক হয়ে উঠেন।

সুলতান দ্বিতীয় বায়েজীদের সন্তান শাহজাদা সেলিম ১৪৭০ সালে আমাসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। সেলিমের মা গুলবাহার খাতুন ছিলেন মারাশের দুলকাদির বাইলিকের শাহজাদী।সেলিমের পিতা সুলতান দ্বিতীয় বায়েজীদ তার পুত্র শাহজাদা আহমেদকে যুবরাজ মনোনীত করেছিলেন। সেলিম এতে অসন্তুষ্ট হয়ে বিদ্রোহ করেন। সেলিম তার পিতাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হন এবং ১৫১২ সালে মসনদে বসেন। তার নির্দেশে ভাইদের হত্যা করা হয়েছিল।১৪৯৪ সালে সেলিম প্রথম মেনিল গিরাইয়ের কন্যা আয়েশা হাফসা সুলতানকে বিয়ে করেন।

সেলিম ১৫২০ সালে ৫৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। দীর্ঘকাল ঘোড়ায় চেপে অভিযানের ফলে সিরপেন্স নামক চামড়ার ইনফেকশনে তার মৃত্যু হয় এমনটা আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হলেও কিছু ইতিহাসবিদের মতে তিনি ক্যান্সার বা তার চিকিৎসকের দ্বারা বিষপ্রয়োগে মারা যান। কিছু ইতিহাসবিদের মতে সেলিমের মৃত্যুর সময় সাম্রাজ্যে যে প্লেগ দেখা দিয়েছিল তিনি তাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

অনেক মতানুযায়ী সেলিম উগ্র মেজাজের ব্যক্তি ছিলেন। লর্ড কিনরোস তার রচিত উসমানীয় ইতিহাসে লিখেছেন যে সুলতান সেলিমের দরবারে প্রচুর সুযোগ ছিল এবং উচ্চপদস্থ অফিসে সবসময় অসংখ্য আবেদন জমা হত।

- Advertisement -

সেলিম কঠোর পরিশ্রমী এবং অন্যতম সফল ও সম্মানিত উসমানীয় সুলতান ছিলেন। স্বল্প সময়ের শাসনকালে তিনি ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছিলেন। অনেক ইতিহাসের মতে তিনি তার পুত্র সুলাইমানের অধীনে সাম্রাজ্যের সর্বো‌চ্চ সমৃদ্ধির জন্য সাম্রাজ্যকে প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন।

প্রথম সুলাইমান

প্রথম সুলাইমান

প্রথম সুলাইমান সুলায়মান দ্য ম্যাগ্নিফিসেন্ট”, তুর্কি ভাষায় মুহতেশিম সুলাইমান বা মহৎ সুলায়মান নামে পশ্চিমা বিশ্বে পরিচিত, তুরস্কে কানুনি সুলতান সুলাইমান নামে পরিচিত।তিনি ছিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের দশম এবং সবচেয়ে দীর্ঘকালব্যাপী শাসনরত সুলতান, যিনি ১৫২০ সাল থেকে ১৫৬৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উসমানীয় সাম্রাজ্য শাসন করেন।পাশ্চাত্ত্যে তিনি মহৎ সুলাইমান হিসেবেও পরিচিত। তিনি পুর্নবারের জন্য সম্পূর্ণভাবে উসমানীয় সাম্রাজ্যের নীতিমালাগুলো তৈরি করেছিলেন বলে প্রাচ্যে তাঁকে বলা হয় বিধানকর্তা সুলাইমান । প্রথম সুলাইমান ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপে একজন বিশিষ্ঠ রাজা হিসেবে স্থান লাভ করেন, যার শাসনামলে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির বিস্তার ঘটে। সুলতান সুলাইমানের সেনাবাহিনী রোমান সাম্রাজ্য এবং হাঙ্গেরির অনেক শহরের পতন ঘটায়। কিন্তু ১৫২৯ সালে রোমান সম্রাট, পঞ্চম চার্লসের সেনাবাহিনী সুলতান সুলাইমানের সেনাবাহিনীকে ভিয়েনা শহর দখল করতে ব্যর্থ করে। প্রথম সুলাইমান পারস্যের সাফাভিদ সুলতান, প্রথম তাহমাসবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং মধ্য প্রাচ্যের বেশির ভাগ অঞ্চল দখল করে নেন। তিনি উত্তর আফ্রিকায় আলজেরিয়া সহ বড় বড় অঞ্চলগুলো রোমান সাম্রাজ্যের হাত থেকে দখল করে নেয়। তাঁর শাসনামলে উসমানীয় নৌবাহিনী ভূমধ্যসাগর থেকে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর পর্যন্ত তাদের আধিপত্য বজায় রাখে।সুলতান সুলায়মান ছিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের সবেচেয়ে শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান সুলতান।

হুররেম সুলতান

হুররেম সুলতানের সঙ্গে সম্পর্ক

হুররেম সুলতান ( রোক্সেলানা হিসেবেও পরিচিত ) ছিলেন রুথেনিয় বংশোদ্ভূত উসমানীয় সম্রাট প্রথম সুলাইমানের প্রিয়তম প্রমোদ দাসী (উপপত্নী) ও পরবর্তীকালে তার বৈধ স্ত্রী এবং সম্রাটের সন্তান শাহজাদা মুহাম্মদ, মিরহিমাহ সুলতান, শাহজাদা আবদুল্লাহ, সুলতান দ্বিতীয় সেলিম, শাহজাদা বায়েজিদ এবং শাহজাদা জাহাঙ্গীরের মাতা।হুররেম সম্ভবত কোন ইউক্রেনীয় অর্থোডক্স ধর্মযাজক পিতার ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন। তিনি পোল্যান্ড রাজ্যের রুথেনীয় ভয়ভডেশিপের প্রধান শহর ল্বও-এর ৬৮ কিলোমিটার দক্ষিণপূর্বের রুহাটাইন নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন (বর্তমান পশ্চিম ইউক্রেন)। ১৫২০-এর দশকে ক্রিমিয়ার তাতাররা ওই এলাকার একটি তড়িৎ অভিযানের সময় তাকে বন্দী করে একজন দাসী হিসেবে নিয়ে আসে (সম্ভবত প্রথমে ক্রিমিয়ার নগরী কাফফায়, যা দাস ব্যবসার একটি প্রধান কেন্দ্র, এরপর কনস্টান্টিনোপলে) এবং তাকে প্রথম সুলাইমানের হারেমের জন্য বাছাই করে। তিনিই সুলতানের সর্বাধিক সংখ্যক সন্তানের জন্ম দেন, এবং আশ্চর্যজনকভাবে চিরায়ত প্রথা ভঙ্গ করে – তিনি দাসত্ব হতেও মুক্তি লাভ করেন। দুইশত বছরের অটোম্যান ঐতিহ্যকে ভঙ্গ করে, একজন প্রাক্তন উপপত্নী এভাবে অবশেষে সুলতানের বৈধ পত্নী হয়ে ওঠে, যা প্রাসাদ ও নগরীর প্রত্যক্ষদর্শীদের জন্য অত্যন্ত হতবাককারী একটি বিষয় ছিল। এই ঘটনা সুলাইমানকে ওরহান গাজির (১৩২৬- ১৩৬২) পর প্রথম দাসী বিবাহকারী সুলতানের পরিচয় এনে দেয় এবং প্রাসাদে হুররামের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে, যার ফলশ্রুতিতে তার অন্যতম পুত্র দ্বিতীয় সেলিম ১৫৬৬ সালে সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার লাভ করেন।

দ্বিতীয় সেলিম

দ্বিতীয় সেলিম

দ্বিতীয় সেলিম (২৮শে মে ১৫২৪ – ১২ই/১৫ই ডিসেম্বর ১৫৭৪)ছিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতান, যিনি ১৫৬৬ সাল থেকে ১৫৭৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উসমানীয় সাম্রাজ্য শাসন করেন।দ্বিতীয় সেলিম ছিলেন অযোগ্য ও আরামপ্রিয় ব্যক্তি। তিনি ছিলেন কাব্যরসিক। তিনি কবি-সাহিত্যিক এবং চাটুকারদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতেন। প্রাসাদ অভ্যন্তরে অবস্থান করে নারীদের সাহচর্যে থাকা এবং মদ্যপান করা তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। কোন কোন ইতিহাসবিদ তাঁকে ‘মাতাল সেলিম’ নামে আখ্যায়িত করেন। তিনি বিলাসব্যসনে মত্ত ছিলেন। শাসনকার্যের তিনি অবহেলা প্রদর্শন করতেন। দ্বিতীয় সেলিম উসমানী খিলাফাতের পতন যুগের প্রথম খালীফা।

তৃতীয় মুরাদ

তৃতীয় মুরাদ

১৫৭৪ খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয় সলিমের পুত্র তৃতীয় মুরাদ কনস্ট্যান্টিনোপলের মসনদে বসেন। তখন তাঁর বয়স ২৮ বছর।

তৃতীয় মুরাদ একজন বিলাসী ব্যক্তি ছিলেন। রাষ্ট্র পরিচালনার কোন যোগ্যতাই তাঁর ছিলনা। তিনি নারী আর মদ নিয়ে প্রাসাদের অভ্যন্তরে মত্ত থাকতেন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি তাঁর সুযোগ্য উযীরদের ক্ষমতা হ্রাস করে খিলাফাতের বিপুল ক্ষতি সাধন করেন। তৃতীয় মুরাদের আম্মা নূর বানু এবং তাঁর ভেনিসীয় স্ত্রী সোফিয়া তাঁর ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত ছিলেন। এই প্রতিযোগিতায় শেষাবধি সোফিয়াই কৃতকার্য হন।তৃতীয় মুরাদের শাসনকালে প্রশাসনে দুর্নীতিপরায়ণ লোকেরা জেঁকে বসে। স্বজন প্রীতি প্রাধান্য পায়। অনিয়ম সর্বত্র নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।তৃতীয় মুরাদের কোন সামরিক প্রতিভা ছিল না। যুদ্ধ করার মতো নৈতিক বলও ছিলনা তাঁর।উসমানী খিলাফাতের গৌরব রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন উসমান পাশা। ১৫৮৩ খৃষ্টাব্দে ইরানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে তিনি বিজয়ী হন।

১৫৯০ খৃষ্টাব্দে ইরান একট শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির শর্তানুযায়ী জর্জিয়া, তাব্রিজ, আজারবাইজান, শিরওয়ান প্রভৃতি অঞ্চল উসমানী খিলাফাতের অংশ বলে স্বীকৃতি লাভ করে।১৫৯৫ খৃষ্টাব্দে তৃতীয় মুরাদ ইন্তিকাল করেন। তিনি একুশ বছর ক্ষমতায় ছিলেন।

প্রথম আহমেদ

প্রথম আহমেদ

১৬০৩ খৃষ্টাব্দে তৃতীয় মুহাম্মাদের পুত্র প্রথম আহমাদ কনস্ট্যান্টিনোপলের মসনদে বসেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র চৌদ্দ বছর।প্রথম আহমাদ তাঁর পূর্বসূরী দুইজন সুলতানের মতো অতো অযোগ্য ছিলেন না। বয়সে নবীন হলেও তিনি সাহসী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি প্রশাসনের ওপর মহিলাদের প্রভাব খর্ব করার পদক্ষেপ নেন।

১৬০৫ খৃষ্টাব্দে হাংগেরীর শত্রুতার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সেনাপতি লালা মুহাম্মাদ পাশাকে হাংগেরীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে প্রেরণ করেন এবং সফলতা লাভ করেন।অতঃপর তিনি অষ্ট্রিয়ার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। ১৬০৬ খৃষ্টাব্দে সিটভাটোরক সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে যুদ্ধের অবসান ঘটে। এই সন্ধির শর্তানুযায়ী ট্রান্সিলভানিয়া উসমানী খিলাফাত থেকে স্বায়ত্বশাসন হাছিল করে। এতোকাল অষ্ট্রিয়া উসমানী খিলাফাতকে বার্ষিক ত্রিশ হাজার মুদ্রা কর দিতো। চুক্তি অনুযায়ী অষ্ট্রিয়া তা থেকে অব্যাহতি লাভ করে। তবে যুদ্ধের ক্ষতিপূরন হিসেবে এককালীন দুই লাখ মুদ্রা প্রদান করতে বাধ্য হয়।উসমানী খিলাফাতের সাথে ইরানের সংঘর্ষ চলছিলো। ১৬১১ খৃষ্টাব্দে সুলতান প্রথম আহমাদ ইরানের শসাহ আব্বাসের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির শর্তানুযায়ী তিনি দিয়ারবেকির এবং কুর্দিস্তান ছাড়া ইরানের অন্যান্য অঞ্চল শাহ আব্বাসকে ফিরিয়ে দেন।

প্রথম আহমাদের শাসনকালে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ভেনিস এবং নেদারল্যান্ড উসমানী খিলাফাতের সাথে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করে।১৬১৭ খৃষ্টাব্দে প্রথম আহমাদ ইন্তিকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো উনত্রিশ বছর। তিনি ১৬ বছর খলিফা ছিলেন।

 

মন্তব্য
লোডিং...