এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

বাংলা বাগধারা ও প্রবাদ-প্রবচনের গল্প (২য় পর্ব)

আগের পর্বে বলেছিলাম আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত কিছু বাগধারা ও প্রবাদ-প্রবচনের পেছনের গল্পগুলো। তারই ধারাবাহিকতায় এই পর্বে যুক্ত হচ্ছে আরো কিছু বাগধারা ও প্রবাদ-প্রবচনের উৎপত্তির পেছনকার গল্প। এতে করে খটমটে বাগধারাগুলো উপভোগ্য হয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।

সতীর দেহত্যাগের পর

দক্ষযজ্ঞ 

হট্টগোল বা বিপর্যস্ত অবস্থা বোঝাতে আমরা সাধারণত দক্ষযজ্ঞ বাগধারাটি ব্যবহার করে থাকি। এই বাগধারাটি আপনাআপনি আমাদের ভাষায় ঠাই পায়নি । বরং এর পেছনে রয়েছে একটি গল্প রয়েছে। এক করুণ গল্প।

হিন্দু ধর্মের দেবতা শিব তথা দেবাদিদেব মহাদেবের স্ত্রী ছিলেন সতী। তার আরেক পরিচয় দক্ষকন্যা। আর দক্ষ ছিলেন ব্রহ্মার দশ মানসপুত্রের একজন, যাদের প্রজাপতি বলে সম্বোধন করা হয়। কথিত আছে, একবার এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করা হয়। তাতে উপস্থিত ছিলেন স্বর্গের সব দেবদেবী। যজ্ঞে যোগ দিতে দক্ষও এসেছিলেন। তাকে দেখে সব দেবদেবী আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ঠিকই, কিন্তু শিব দাঁড়াল না। এতে ভীষণ ক্ষিপ্ত হলে দক্ষ৷ শিবকে এই বলে অভিশাপ দিলে যে, ইন্দ্রসহ অন্যান্য দেবতা যজ্ঞের যে ফল ভোগ করেন তা থেকে শিব বঞ্চিত হবে।
এর কিছুকাল পর ব্রহ্মা দক্ষের ওপর খুশি হয়ে সব প্রজাপতির ওপর আধিপত্য করার অধিকার প্রদান করে। সেই খুশিতে দক্ষ আয়োজন করলো এক মহাযজ্ঞের। সেই যজ্ঞে নিমন্ত্রণ করা হলো ত্রিলোকের সবাইকে। বাদ গেল শুধু শিব আর সতী।
বাবার কাছ থেকে নিমন্ত্রণ না পাওয়া সত্ত্বেও সতী ঠিক করে যজ্ঞের অনুষ্ঠানে সে যাবে। কিন্তু শিব তাকে যজ্ঞে যাওয়ার অনুমতি দেয় না। শেষে সতী দশমূর্তি–কালী, তারা, রাজ-রাজেশ্বরী, ভুবনেশ্বরী, ধুমাবতী, ছিন্নমস্তা, ভৈরবী, বগলামুখী, মহালক্ষী ও মাতঙ্গী রূপ ধারণ করে এবং শিবকে ঘিরে ধরে। শঙ্কিত হয় শিব। স্ত্রীকে সে যজ্ঞে যাওয়ার অনুমতি দিতে বাধ্য হলেন।

এদিকে সতী যখন দক্ষের আয়োজিত যজ্ঞানুষ্ঠানে উপস্থিত হলো, তাকে দেখে শিবকে ভৎসনা করতে শুরু করলো দক্ষ। বাবার মুখে স্বামীর অপমান সইতে পারলো না সতী। তার কাছে স্বামীর নিন্দা শোনার চেয়ে দেহত্যাগ করা শ্রেয় বলে মনে হলো। সে সেটাই করলো–যজ্ঞস্থলেই প্রাণত্যাগ করলো।
যজ্ঞস্থলে সতীর দেহত্যাগের কথা যখন শিবের কানে গেল, সে ভীষণ ক্রোধান্বিত হলো। মাথাভরা জটা থেকে একটা জটা ছিড়ে মাটিতে ছুুুঁড়ে মারলে সেই জটা থেকে উদ্ভব হলো বীরভদ্রের। শিবের অনুচর নন্দী-ভৃঙ্গিকে সাথে নিয়ে বীর বেরিয়ে পড়লো যজ্ঞের উদ্দেশ্যে। দক্ষ কর্তৃক আয়োজিত যজ্ঞ তান্ডব শুরু করে তারা। তাদের তান্ডবে যজ্ঞের দফারফা হয়ে যায়। বীরভদ্র ভৃগুর দাড়ি কেটে নেয়, পূষণের দাঁত উপড়ে ফেলে। শুধু তাই নয়, দক্ষের মাথা কেটে যজ্ঞের হোমাগ্নিতে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।

এভাবেই বিশাল আয়োজন লণ্ডভণ্ড করে দেয় তারা। পরে অবশ্য দক্ষের স্ত্রী প্রসূতির স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে শিব দক্ষের প্রাণ ফিরিয়ে দেয়, কিন্তু মাথার স্থলে মানুষের পরিবর্তে লাগিয়ে দেয় ছাগলের মাথা।
মূলত কোনো বিশাল আয়োজন যখন সুচারুরূপে সম্পাদন করতে গিয়ে হট্টগোল বা জট পাকায়, সৃষ্টি হয় বিপর্যস্ত অবস্থার, তখন তাকে বলা হয় “দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার”।

কাক ভূষণ্ডি

কাক ভূষণ্ডি 

কাক ভূষণ্ডি বাগধারাটির অর্থ হলো দীর্ঘজীবি। মূলত ভূষণ্ডি নিজেই একটি কাক। কথিত আছে, কাকটি দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিল। কয়েক যুগ অবধি দিব্যি বেঁচে ছিল। এজন্য পৃথিবীর কয়েক কালের খবর তার জানা ছিল।

একবার নাকি কৃষ্ণ ভূষণ্ডী, মানে কাক ভূষণ্ডীকে জিজ্ঞেস করেছিল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে। কৃষ্ণের প্রশ্নের জবাবে ভূষণ্ডি যা বলেছিল, তা অনেকটা এরকম–সত্যযুগের শুম্ভ-নিশুম্ভ মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধের সময়ও সে ছিল। সেই যুদ্ধের সময়ও নিহত দৈত্যদের রক্তমাংস খেয়েছিল। তার একদমই কষ্ট হয়নি খেয়ে শেষ করতে। পরবর্তীকালে ত্রেতাযুগে এসে যখন লঙ্কাযুদ্ধ বাঁধে, সেই যুদ্ধে নিহতদের মৃতদেহ খেয়ে শেষ করতে তার একটু কষ্ট হয়েছিল। তবু শেষ পর্যন্ত সে তা সামলে নিতে পেরেছিল। কিন্তু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তার কষ্টের সীমা ছিল না। হতাহতের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে তারপক্ষে খেয়ে শেষ করে ওঠাটা কষ্টকর হয়ে উঠেছিল।

মান্ধাতার আমল 

মান্ধাতা ছিল একজন প্রাচীন রাজা। সূর্য বংশের রাজা যুবনাশ্বের পুত্র ছিল এই রাজা মান্ধাতা। রামায়ণের নায়ক ‘রাম’ও এই সূর্য বংশের রাজা ছিল। আমরা রামের গল্পের দিকে যাবো না। মান্ধাতাকে নিয়েই কথা বলবো। মান্ধাতার আমল বলতে আক্ষরিকার্থে তার শাসনকালকে নির্দেশ করে। তবে মূলত এই বাগধারাটির অর্থ “অনেক পূরোনো সময়”। মান্ধাতার জন্ম কাহিনি নিয়ে একটি গল্প রয়েছে। তার বাবা যুবনাশ্বের কোনো পুত্রসন্তান হচ্ছিল না। তখন সে মুনিদের আশ্রমে গিয়ে যোগসাধনা করতে শুরু করলো, যেন তার একটি ছেলে হয়। এক সময় মুনিরা তার সাধনায় সন্তুষ্ট হলো। তখন তার ছেলের জন্য তারা এক যজ্ঞ আরম্ভ করলো। সেই যজ্ঞ শেষ হলো মাঝরাতে। তখন কলসি ভর্তি মন্ত্রপূত জল বেদিতে রেখে তারা ঘুমাতে গেলেন। কথা থাকল, এই কলসির জল যুবনাশ্বের স্ত্রী খেলে তার ছেলে হবে। কিন্তু রাতে যুবনাশ্বের খুব তৃষ্ণা পেল। সে আর না পেরে নিজেই সে কলসির জল পান করে ফেলল। সকালে উঠে মুনিরা পুরো ঘটনা শুনে মুচকি হেসে বলল, “সন্তান তাহলে তোমার পেট থেকেই হবে। এভাবেই পিতার থেকেই জন্ম লাভ করে মান্ধাতা।

পরবর্তীকালে রাজা হয়ে মান্ধাতা পৃথিবী জয়ে করার উদ্দেশ্যে বের হয়। যুদ্ধ করতে করতে মান্ধাতা সারা পৃথিবীই জয় করে ফেলে। শেষ পর্যন্ত পৃথিবী জয় করা হয়ে গেলে স্বর্গে জয়ের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হয়। তখন দেবতা ইন্দ্র তাকে বলে, “তুমি তো এখনো পুরো পৃথিবী জয় করতে পারোনি। মধুর পুত্র লবণাসুর এখনো তোমার অধীনতা স্বীকার করেনি। আগে তার কাছ থেকে নিজের বশ্যতা আদায় করে এসো, তারপর না হয় স্বর্গ জয়ের কথা ভাববে।

”কিন্তু লবণাসুরের সঙ্গে যুদ্ধে মান্ধাতা নিহত হয়। উল্লেখ্য, মান্ধাতা অনেক কাল আগে রাজত্ব করেছিল বিধায় “মান্ধাতার আমল” বাগধারাটি দিয়ে অনেক আগের কোনো সময় কে নির্দেশ করা হয়।

 

ফিচার ইমেজ : jcrt.org

মন্তব্য
লোডিং...