বাংলাহাব বিশেষ গল্প-গন্তব্য

হাতের ফাইল ক’টা ডেস্কের উপর রেখে মিসেস রাহানুমা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। চশমা খুলে তাকালেন সামনের দিকে। ডেস্কের অপর পাশে বসে আছে মেয়েটা। তীক্ষ্ণ রাগী চোখে নিজের হাত দেখছে। রাহানুমা বেশ মজা পেলেন। গলা খাঁকারি দিয়ে জানতে চাইলেন,

“তোমার রাগটা আসলে কার উপর বলো তো, শৈল্পী?”

শৈল্পী একটুও দেরী না করে বলল,

“মা!”

“কেন?”

“শরীর খারাপের জন্য কেউ সাইকিয়াট্রিস্ট দেখায়? আমার তো শরীর খারাপ। মাথা খারাপ নয়!”

রাহানুমা, শৈল্পীর দিকে ঝুঁকে বসলেন। মনযোগ দিয়ে মেয়েটাকে দেখলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর হাত দিয়ে ডেস্কের উপর রাখা ফাইলগুলো দেখিয়ে বললেন,

“এই ফাইলগুলো চিনতে পারছো তো? তোমার থরো চেক-আপের রিপোর্ট সব। দেশ-বিদেশের কোন ডাক্তার ই তো বাদ রাখোনি দেখছি! রেজাল্ট? কিচ্ছু হয়নি তোমার! ইউ আর এবসুলিউটলি ফাইন। শুধুমাত এক্সট্রা নার্ভাসনেস। ব্যস।”

শৈল্পী বিড়বিড় করে বলল,

“আমার মাথা কিন্তু খারাপ নয়, রাহাপ্পু!”

“ধুর বোকা! মাথা খারাপ হলে তো সাইকিয়াট্রিস্ট নয়, সোজা পাগলের ডাক্তার দেখায়। যারা ইলেক্ট্রিক শক দেয় কন্টিনুয়াস। আমাকে দেখে তোমার শকার মনে হচ্ছে?”

“না.. আসলে…”

শৈল্পী কথা খুঁজে পায় না। অস্বস্তি বোধ করে সে। রাহানুমা সেই অস্বস্তি কাটাতেই প্রশ্ন করেন,

“দুঃস্বপ্ন দেখো?”

মেয়েটা চমকে চোখ তুলে তাকায়। অবাক হয়েছে খুব। তারপর অনেকটা আনমনেই বলে,

“হুঁ..  অদ্ভুত একটা দুঃস্বপ্ন। প্রায় প্রতিদিন।”

“যেমন?”

“আমি একটা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছি। অপেক্ষা করছি কারো জন্য। কিংবা কিছু একটা ঘটার জন্য। কিংবা কোথাও ফেরার জন্য! কিন্তু আমার অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে না। মানে সেই কেউ একজন আসছে না। কিংবা কোন ঘটনা ঘটছে না। আমার চারপাশের মানুষজন, যানবাহন সব চলে যাচ্ছে। দ্রুত। চোখের পলক ফেলার আগেই। কিন্তু আমি কাউকে ছুঁতে পারছি না। স্পষ্ট দেখতে পারছি না। আমি প্রাণপণে চাচ্ছি কোন একটা গাড়িতে উঠতে। কোথাও যাওয়ার যেন অদ্ভুত একটা তাড়া কাজ করছে আমার ভেতর। যেন সময় ফুরিয়ে আসছে! এক্ষুনি যেতে হবে! কিন্ত যেতে পারছি না। কোন গাড়ি থামছে না আমার জন্য। চলে যাচ্ছে… যাচ্ছে… দৌড়েও যেতে পারছি না আমি। নড়তেই যে পারছি না! চাচ্ছি অন্তত আশপাশের একটা মানুষকে ছুঁয়ে দিই। কিন্তু তাও পারছি না। আমি নড়তেই পারছি না। কোন অনুভূতি কাজ করছে না আমার। কিছুই ঘটছে না। কেউ আসছে না। আমাকে আমার জায়গায় পৌঁছে দিচ্ছে না। সবাই ব্যস্ত। নিজের পথে হাঁটছে! আমি পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছি। চেঁচাতে চাইছি গলা ছেড়ে। কিন্তু কোন শব্দই বেরুচ্ছে না…”

“তারপর?”

“তারপর আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ভীষণ ঘামাতে থাকি। আর বুকের ঠিক বাঁ দিকটায় অদ্ভুত চিনচিনে একটা ব্যাথা হতে থাকে। তীক্ষ্ণ, কিন্তু হাহাকার জাগানো ব্যাথা। মনে হতে থাকে কী যেন একটা নেই.. কী যেন একটা হারিয়ে বসেছি আমি! কিংবা ভুলে গেছি। ভেতরে তখন সেই তাড়াটা আবার ফিরে আসে! কোথাও যেতে হবে। পেতে হবে কিছু একটা, যেটা নেই। আর সেই অভাব আমাকে ভোগাচ্ছে।”

“তোমার হার্ট কিন্তু একদম সুস্থ।”

“জানি, রাহাপ্পু! আমি জানি আমার ফিজিক্যাল কোন ত্রুটি নেই। তবু হঠাৎ হঠাৎ সেই হাহাকার জাগানো ব্যাথা টের পাই। বুক ভেঙ্গে আসে আমার। শূণ্যতা সবকিছুতে। কিন্তু কী নেই, কেন নেই, বুঝি না!”

রাহানুমা বেশ কিছুক্ষন চুপচাপ কী যেন ভাবলেন। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন এরপর। তার ঠোঁটে মৃদু হাসি।

“ছেলেটার সাথে পরিচয় কীভাবে?”

শৈল্পী থতমত খেয়ে বলল,

“মানে?”

রাহানুমা সবজান্তার ভঙ্গীতে হাসলেন।

“ইউ মাই ডীয়ার আর ইন লাভ! ডীপ ডীইইপ লাভ ….. আহাহ অস্বীকার করার চেষ্টা না করে বলো, কে সে?”

শৈল্পী এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা শ্বাস ছাড়ল। বেশ শব্দ করেই। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো এরপর। দিনের আলো নিভে এসেছে। সূর্যের শেষ আলোটুকু জানালার কাচে সুন্দর একটা প্রতিফলন ফেলেছে।

“ওর নাম.. শুভ্র। আর্কির স্টুডেন্ট। ফেসবুকে এক ফ্রেন্ডের পোস্টে প্রথম কথা। তারপর আমি আর কথা বলিনি। দরকার হয়নি আসলে। কিন্তু বেশ ক’দিন পর হঠাৎ ইনবক্সের আদারবক্স চেক করতে গিয়ে দেখি, তার অনেক মেসেজ! বিদঘুটে সব প্রশ্নভর্তি তাতে! “আপনি রং ভালবাসেন?” “আপনি তো টিপিক্যাল মেয়ে নন। বয়স কত যেন?” “আইসক্রিমের মিন্ট আর চকলেট ফ্লেভার কি একসাথে ম্যাচ করে?” কিংবা “বেগুনী রং এর শাড়ির সাথে লাল লিপিস্টিক পরেছেন কখনও?”

আমি অনেকটা রেগেই রিপ্লাই দিলাম,

“উদ্ভট প্রশ্ন করছেন কেন অত?”

সাথে সাথেই ফিরতি রিপ্লাই,

“আচ্ছা, আপনি নাক ডাকেন না তো?”….”

শৈল্পী হাসল। অবিশ্বাসের ভঙ্গীতে মাথা নাড়ছে।  রাহানুমার দিকে তাকিয়ে কথা শুরু করলো আবার।

“এভাবে আমাদের কথার শুরু। দিন-রাত। ফোন, ফেসবুক, হোয়াটস এপ, ভাইবার, ইমো কোন সোশাল নেটওয়ার্ক বাদ দিইনি আমরা। ও অনেক হাসাতে পারত। মুহূর্তেই মন ভালো করে দিতে পারত আমার। দুনিয়ার হেন কোন বিষয় নেই যেটা ও জানত না। অনেক পড়ুয়া ছিলো তো! জানতে চাইতাম, এত সময় কোথায় পাও! সে হাসত। তার বাবার নাকী অনেক টাকা। তাছাড়া সে ছিল ফ্রী ল্যান্সার। স্পেসিফিক কোন জব করত না। শুধু অর্ডার অনুযায়ী আর্কিটেকচার মডেল বানাতো। বাকী সময় ফ্রী। বই পড়ত। আর আমাকে সময় দিতো।

আমাদের রিলেশনটা ডীপ হচ্ছিল দিন দিন। ডিপেন্ডেন্ট হচ্ছিলাম আমি ওর উপর। ওকে মনে হত আমার ব্যক্তিগত খুঁটি। যেটা আঁকড়ে ধরে নিশ্চিন্তে বাঁচা যায়। কিছু না ভেবেই জীবন পার করা যায়। প্রতিটা অনুভূতি, ঘটনা তার সাথে শেয়ার না করলে কেমন যেন সাফোকেটেড ফীল করতাম আমি। মনে হত শ্বাস আটকে আসছে। আমি স্বাভাবিক বোধ করছি না!

তবে একটা সমস্যা ছিলো। এই আট নয় মাসের রিলেশনে একবারও সামনাসামনি দেখা হয়নি আমাদের। যা হয়েছে সব ভিডিও কলে। অথচ দু’জনই ঢাকায় থাকি! অদ্ভুত, তাই না? কেন যেন দেখা করার কথা বললেই ও এড়িয়ে যেতো। এটা ওটা বলে কথা ঘুরিয়ে ফেলতো!

কিন্তু সেদিন ওকে চেপে ধরলাম। জানালাম, দেখা করতেই হবে। আমি কিচ্ছু জানি না। সে বলল, তুমি হতাশ হবে। খুব হতাশ। আমি শুনতে চাইলাম না। তর্ক করলাম। ঝগড়া করলাম অনেকক্ষণ। তারপর পুরো এক দিন কথা বন্ধ। সে জানত রাগ হলে আমার খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তাই দ্বিতীয় দিন কল করে জানালো, সে দেখা করবে। আমি যাতে খাওয়া দাওয়া নিয়ে ঝামেলা না করি।

তারপর.. সেদিন এলো। আগেরদিন রাত থেকেই আমি ভয়াবহ নার্ভাস, এক্সাইটেড! এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করিনি। ঘুমোনো তো অনেক দূরের কথা! প্রিয় মানুষটার সাথে প্রথমবার দেখা হবে! লোকে শুনলে হয়ত হাসবে, বলবে ভিডিও কলগুলোর কথা ভুলে গেছে মেয়ে!

কিন্তু রাহাপ্পু… অনলাইন আর অফলাইনের অনুভূতি কি এক? পর্দার ওপাশ থেকে ছোঁয়া যায় কাউকে? আর প্রিয় মানুষকে একবার অন্তত ছুঁয়ে দেয়ার যে তীব্র একটা আকাঙ্ক্ষা, সেটা ঠিক বলে বুঝানো যাবে না কাউকে। আমার মনে হতো ভার্চুয়ালিটির বাইরে ওকে যদি একবার না দেখি, আমার অনুভূতি সব মরে যাবে! মিথ্যে হয়ে যাবে। আমি এলোমেলো হয়ে যাবো। তাই ও যখন রাজী হয়েছিল.. আমার মনে হয়েছিল অনুভূতিগুলো সত্যতা পেতে যাচ্ছে। বাস্তবতার স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে!

খুব মনযোগ দিয়ে যত্ন করে সাজলাম। নীল শাড়ি, নীল চুড়ি, নীল কাজল, নীল টিপ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই দেখা করার জায়গায় পৌঁছালাম। নিজেকে মনে হচ্ছিলো সদ্য প্রেমে পড়া ষোড়শী এক কিশোরী! কিন্তু… তারপর সব কেমন যেন উল্টেপাল্টে গেলো! একদম হঠাৎ!”

শৈল্পী তার কোলের উপর রাখা হাতজোড়ার দিকে তাকালো আবার। তবে এখন তার চোখে রাগ নেই। অদ্ভুত একটা দুঃখভাব আছে। আর আছে যন্ত্রণা। রাহানুমা নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন। শৈল্পীর পাশের চেয়ারটায় বসে, তার হাতের উপর আলতো করে নিজের হাত রাখলেন। নরম গলায় জানতে চাইলেন,

“উল্টেপাল্টে গেলো কেন?”

“আমি দেখলাম… ওহ রাহাপ্পু! আমি দেখলাম.. যে মানুষটাকে শক্ত খুঁটি ভেবে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলাম দাঁড়িয়ে থাকতে চেয়েছিলাম, সে নিজেই হুইল চেয়ারের উপর ভর করে জীবন কাটায়! আমি.. এতটাই শকড হয়েছিলাম যে, কিচ্ছু বলতে পারিনি। বলিনি। ছুটে চলে এসেছি! না এসে উপায় ছিলো না আমার। ওখানে থাকা প্রতিটা মুহূর্ত দম আটকে দিচ্ছিলো আমার। এছাড়া আর কোন অনুভুতি হচ্ছিল না তখন। কোন অনুভূতিই না!

জানো রাহাপ্পু.. আজও নিজেকে প্রশ্ন করি, কেন পালিয়ে এসেছিলাম সেদিন? হতাশায়? না! ঘেণ্ণায়? না! পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে? না! লজ্জায়? না! ওকে বোঝা ভেবে? না! ভয়ে? না! তাহলে কেন পালিয়ে এসেছি? জানি না! পরে যোগাযোগ করিনি কেন? তাও জানি না! নিজের সাথে প্রতিদিন এই দীর্ঘ তর্কটা হয় আমার। একই প্রশ্ন। একই উত্তর। তারপর অদ্ভুত সব হাহাকার জাগে। শূণ্যতা বোধ হয়। সেই বিদঘুটে দুঃস্বপ্ন দেখি আর বুকের বাঁ দিকটার ব্যাথা নিয়ে রাতের পর রাত জেগে বসে থাকি!”

“সিচুয়েশনটা নিয়ে কি তুমি নিজেকে গিল্টি ফীল করো?”

“তাতো জানি না! শুধু জানি, নিজের অবস্থান ভাবতে গেলেই সাফোকেটেড লাগে। দমবন্ধ হয়ে আসে আমার। একটাই প্রশ্ন ঘুরিফিরে আসে মাথায়। “কেন?”! “কেন আমি পালিয়ে আসলাম?” জানি না! শুধু জানি কেন ফেরার চেষ্টা করছি না। ভয়ে! আমি খুব ভীতু, রাহাপ্পু! চাই না কেউ আমাকে জাজ করুক।”

“হুম.. আর যোগাযোগ হয়নি? কোনভাবে?”

“নাহ। নাম্বার বদলেছি। অনলাইনে যাই না আজ পুরো তিন মাস। আমি আসলেই ভীতু। বড্ড ভীতু।”

“কী চাও, তুমি এখন?”

প্রশ্নটা শুনে শৈল্পী তিক্ততার হাসি হাসলো।

“কোন ধারনা নেই।”

“ওয়েল.. তোমার সিচুয়েশনের একটাই সলুশন আছে।”

শৈল্পী আগ্রহ নিয়ে তাকালো। দেখলো রাহানুমা তার সেলফোন নিয়ে কী যেন করছে। খুঁজছে কিছু একটা। তারপর সেটা হঠাৎ কানের কাছে ধরে বলল,

“নাও। কথা বলো। ফেস ইট।”

****

রমনা পার্ক। আশেপাশে জোড়ায় জোড়ায় মানুষজন হাঁটছে। বসে আড্ডা দিচ্ছে। বাদামওলা পিচ্চিরা ছোটাছুটি করছে এদিক ওদিক।

আজ থেকে প্রায় তিন মাস আগেও এমন ছিলো এই পার্কটা। শৈল্পীর এখনও স্পষ্ট মনে আছে সেদিনের কথা! তাড়াহুড়োয় রিকশাওলার সাথে ভাড়া নিয়ে দরদামও করেনি সেদিন। যা চেয়েছিলো, দিয়ে দিয়েছে! তারপর ঠিক এইখানটায় এসে দাঁড়িয়েছিল। আর সামনে তাকাতেই…

“এতদিন পর শক কেটেছে তোমার?”

পেছন থেকে কারো পরিচিত কন্ঠস্বরে শৈল্পীর ভাবনা আর এগোয় না। তবে তক্ষুনিই ঘুরে দাঁড়ায় না সে। চোখবন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষন। এই কন্ঠস্বরের মানুষটার সাথে কতসব স্মৃতি! হাসির, কান্নার, মন খারাপের! এলোমেলো স্বপ্নের। বিদঘুটে সব শখের!

“কি, আবার শকড?”

শৈল্পী নিজেকে সামলে এবার পেছনে ফিরে তাকায়। শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে! সে অবাক হয়।

“তোমার পা..”

“অপারেশন হয়েছিলো। নকল পা লাগিয়ে দিয়েছে! বাট আয়্যাম সিউর, তিন মাস পর এটা নিয়ে কথা বলতে তুমি ডাকোনি।”

“আমি তোমাকে ডাকিনি।”

শুভ্র হাসে। সেই হাসিতে প্রাণ নেই।

“কল রেকর্ড এখনও আছে কিন্তু!”

“আমি ফিরে এসেছি।”

“কোথায়?”

“গন্তব্যে।”

“রমনা পার্ক তোমার..”

“শুভ্র, আমি কথা শেষ করি? প্লিজ?”

শুভ্র খুব ধীরে মাথা ঝাঁকায়। বলে,

“হুম। বসবে?”

“নাহ। গত তিন মাসই তো ডাক্তারের চেম্বারে চেম্বারে বসে কাটিয়েছি। আর বসতে চাই না।”

শুভ্রকে হঠাৎ খুব উদ্বিগ্ন দেখায়। সে ব্যস্ত হয়ে জানতে চায়,

“কেন?? কী হয়েছিল তোমার?”

“অসুখ… অদ্ভুত একটা অসুখ। সেই অসুখের আমি নাম জানতাম না। শুধু সারাক্ষণ নিজের ভেতর একটা তাড়া টের পেতাম। মনে হতো কী যেন একটা নেই। কী যেন একটা হারিয়ে গেছে! সেটা খুঁজে পেতে হবে আমার। কোথাও যেন ফিরতে হবে! জানো ঘুমোলেও দেখতাম, আমার চারপাশের সব কিছু চলছে। নড়ছে। কিন্তু আমি নড়তে পারছি না। অথচ কোথাও পৌঁছানো খুব দরকার! আমি দৌড়াতে চাইছি। ছুটতে চাইছি। বুঝতে চাইছি কী মিসিং! কিন্তু কিচ্ছু করতে পারছি না! ভেতরের তাড়াটা তখন আকাশ ছোঁয়। টের পাই অক্ষমতা। আর সেটা যখন সীমা ছাড়ায়, ঠিক তখনই ঘুম ভাঙ্গে আমার। তারপর বুকের ঠিক বাঁ দিকটায় তীক্ষ্ণ একটা ব্যাথা হয়। অসহ্য হাহাকার! কোথাও যেতে হবে আমার! কিছু একটা পেতে হবে! কিন্তু কোথায় যেতে হবে, কী পেতে হবে, কোন ধারণা ই নেই! অন্তত গতকাল পর্যন্ত ছিলো না। অদ্ভুত অসুখ, তাই না শুভ্র?”

শুভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। সে শৈল্পীর কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করছে এক মনে। শৈল্পী শুভ্রর চোখের দিকে তাকালো। তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। আটকে রাখা দম ছাড়লো সে। বললো,

“গতকাল আমার সাইকিয়াট্রিস্ট রাহাপ্পুর সাথে কথা হয়েছিল অনেকক্ষণ। জানো আমি আগে ভাবতাম, মাথা খারাপ হলে লোকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখায়। আসলে তা নয়। শরীরের অসুখে যেমন আমরা ডাক্তার দেখাই, তেমনই সাইকিয়াট্রিস্টরা মনের অসুখ সারায়। আমার মনের অসুখটা সেরে গেছে, শুভ্র। তারপরই আমি আমার প্রশ্নের উত্তরও পেয়ে গেছি। জানো আমার কোথায় পৌঁছাতে হবে? গন্তব্যে! যেখানে অস্তিত্বের বড় একটা অংশ ফেলে গেছি আজ থেকে প্রায় তিন মাস আগে! সেটা ফিরে পেতে হবে আমার। আমার তোমার কাছে ফিরতে হবে শুভ্র! আমার গন্তব্য তো তুমি। দেখো না, তুমি না থাকায় কীসব অদ্ভুত মনের অসুখে ভুগেছি! এদিক সেদিক এলোমেলো ঘুরে বেড়িয়েছি। স্বপ্নে। বাস্তবে। তবু স্থিতি হয়নি আমার। কারণ স্থিতি তো গন্তব্যে হয়। আর সেটা তোমার কাছে।”

শৈল্পী শুভ্রের বুকের বাঁদিকটায় আলতো করে আঙুল রাখে।

“ঠিক এখানটায়।”

শুভ্র হাত বাড়িয়ে শৈল্পীর চোখ মুছে দেয়। তারপর হঠাৎ ই জড়িয়ে ধরে তাকে। চুলে নাক ডুবিয়ে বিড়বিড় করে বলে,

“নাও, গন্তব্যে স্বাগতম জানালাম!”

(সমাপ্ত)