এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

আমাদের পতাকার চূড়ান্ত নকশা করেছিলেন যিনি

আজীবন যিনি এঁকে গেছেন বাংলার চিত্রপট

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষার্ধে কামরুল হাসানের শিল্পী জীবনের এক অন্যতম কাজ হচ্ছে- বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার চূড়ান্ত নকশা অঙ্কন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে সংগ্রামী ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের যে জাতীয় পতাকা ওড়ানো হয়েছিল তার প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় পতাকার রূপ দেন।

কামরুল হাসান
572

বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত কিংবদন্তী চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান। তবে শিল্পীর চাইতে ‘পটুয়া’ নামে পরিচিত হতে পারাটাই তার বেশি পছন্দের ছিল।

১৯২১ সালের ২ ডিসেম্বর বর্ধমান জেলার (বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি রাজ্য) কালনা থানার নারেঙ্গা গ্রামে তার জন্ম। পুরো নাম এ.এস.এম কামরুল হাসান অর্থাৎ আবু শরাফ (শার্ফ) মোহাম্মদ কামরুল হাসান। তার বাবার নাম মোহাম্মদ হাশিম ও মায়ের নাম মোসাম্মৎ আলিয়া খাতুন।

১৯৩০ সালে কলকাতার তালতলায় এসাইলাম লেনে অবস্থিত এম. ই. স্কুলের ইনফ্যান্ট ক্লাসে বালক কামরুলের বিদ্যেশিক্ষার যাত্রা। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পরিকল্পিত এই মডেল স্কুলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বাল্যবয়সে কিছুকাল পড়েছেন। কামরুল হাসানের এখানে পড়ার কাল ষষ্ঠ শ্রেণী অব্দি। এরপর বাবার কথামতো ১৯৩৭ সালে ভর্তি হন কলকাতা মাদ্রাসার অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগের সপ্তম শ্রেণীতে। কামরুল হাসান স্কুলে পড়ার সময় থেকেই প্রচুর ছবি আঁকতেন। তবে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে তার ছবি আঁকার নেশা এমন চড়া হলো যে তিনি অষ্টম শ্রেণীতে পরীক্ষা দিয়ে ওঠার পরিবর্তে আর্ট স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দেন। এরপর তার বাবাকে অনুরোধ করে স্কুলে ভর্তির লক্ষ্যে একটি পরিচয়পত্র আনার জন্য খান বাহাদুর ওয়ালিউল ইসলাম সাহেবের কাছে যান। তিনি বালক কামরুলের আঁকা দেখে মুগ্ধ হয়ে তার নিজস্ব প্যাডে দু’লাইন লিখে দেন। আর কামরুল হাসান তার ভিত্তিতে ভর্তি হয়ে যান ‘গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস’ এ ১৯৩৮ সালের জুলাই মাসে।

বাবা ধার্মিক হওয়ায় কামরুলকে তার পড়াশুনার খরচ নিজে চালানোর শর্তে আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে হয়। তবে বাংলা ১৩৫০ তথা ইংরেজি ১৯৪৩ সালে মন্বন্তরের সময় গেজেট পত্রিকায় জয়নুল আবেদিনের স্কেচ দেখে কামরুলের বাবার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয় এবং তিনি কামরুলকে কবরের নকশা আঁকার কাজ যোগাড় করে দেন। তবে কামরুল নিয়মিত আয়ের জন্য একটি পুতুল কারখানায় পুতুলের চোখ আঁকার কাজ নেন। প্রখর সেলুলয়েডের আলোয় চোখ আঁকতে গিয়ে কার নিজেরই দৃষ্টিশক্তি কিছুটা কমে গিয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর ‘ফরোয়ার্ড ব্লকে’ যোগ দেন। ‘মণিমেলা’ ও ‘মুকুল ফৌজ’ নামক দুইটি শিশু কিশোর সংগঠনের সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। এরমধ্যে ‘মুকুল ফৌজের’ অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি।

এসব নানাবিধ কাজে জড়িত থাকায় কামরুলের আর্ট স্কুলের ছয় বছরের কোর্স শেষ করতে নয় বছর লেগেছিল। বিভিন্ন সমস্যায় তাকে ভর্তি হতে হয় ড্রাফটম্যানশিপ বিভাগে, কারণ এই বিভাগ থেকে চাকরি পাওয়া বেশ সহজ ছিল। পরে অবশ্য তিনি চারুকলা বিভাগে ভর্তি হয়ে যান এবং সেখান থেকেই ১৯৪৭ সালে ডিপ্লোমা অর্জন করেন।

ভারত বিভাগের পরে, কামরুল হাসান ঢাকাতে চলে আসেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকার প্রথম আর্ট স্কুল ‘গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস’ (বর্তমান চারুকলা বিভাগ) প্রতিষ্ঠার পেছনে তিনি বেশ সক্রিয় ছিলেন। এছাড়াও রাজনৈতিকভাবে বাম মতাদর্শের অনুসারী কামরুল স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বহু আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।

তৎকালীন পরিস্থিতিতে শিল্পচর্চা করাটা ছিল বেশ দূরুহ, কারণ তখন ঢাকায় ছিল রক্ষণশীল সর্দারদের প্রবল আধিপত্য। শুধু চারুকলাই নয়, বরং সংস্কৃতি চর্চামাত্রই এসব মহল থেকে বাধা আসতো। ১৯৫০ সালে মুসলীম লীগের ষড়যন্ত্রে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেঁধে যায়। এমতাবস্থায় ঐ বছরই আর্ট ইনস্টিটিউটের বাইরে শিল্প আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ’ গঠিত হয়, যার সভাপতি ছিলেন জয়নুল আবেদিন এবং কামরুল হাসান ছিলেন সাধারণ সম্পাদক।

‘গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অফ আর্টস’ (বর্তমান চারুকলা ইনস্টিটিউট) -এ এগারো বছরেরও বেশি সময় শিক্ষকতায় নিয়োজিত থেকেও কামরুল হাসান এ দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ১৯৫২ সালে এদেশে প্রথম রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনে আর্টস ইনস্টিটিউটের ছাত্র আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর, ইমদাদ হোসেন, রশীদ চৌধুরীসহ অনেকেই সক্রিয় ছিলেন। ছাত্র-শিল্পীদের সঙ্গে শিল্পী কামরুল হাসানও সেদিন এসব কাজে সক্রিয় ছিলেন।

১৯৬০ সালে ঢাকার একটি শিল্প প্রদর্শনীতে অংশহগ্রহণ, ১৯৬৪ সালে ঢাকায় একক শিল্পকলা প্রদর্শনী, ১৯৬৯ সালে রাওয়ালপিন্ডি সোসাইটি অব কনটেমপোরারি আর্ট গ্যালারিতে একক শিল্প প্রদর্শনী, স্বাধীনতা-উত্তর বেশকিছু একক ও যৌথ শিল্প প্রদর্শনী তার শিল্পকে সাধারণের আরো নিকটবর্তী এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন করতে সহায়তা করে।

১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমীতে কামরুল হাসানের একটি একক শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় যেখানে স্থান পেয়েছিল ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তাঁর আঁকা ১৫৬টি শিল্পকর্ম।

তার একক প্রদর্শনীগুলো হলো : ১৯৫৪ এবং ১৯৫৫ ঢাকা; ১৯৫৭ রেঙ্গুন, মিয়ানমার; ১৯৬৯ পাকিস্তান; ১৯৭৫ ঢাকা; ১৯৭৯ লন্ডন; ১৯৯১ ঢাকা। এছাড়া উল্লেখযোগ্য যৌথ প্রদর্শনীসমূহ হলো : ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৯ ঢাকা, করাচি, লাহোর এবং রাওয়ালপিন্ডি; ১৯৭৫-৮৮ বাংলাদেশে ৬টি জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী; ১৯৭৮ জিডিআর; ১৯৮০ ফুকুওকা, জাপান; ১৯৮১ হংকং; ১৯৮৫ মালয়েশিয়া; ১৯৮৭ ভারত; ১৯৮১, ১৯৮৩ ও ১৯৮৬ দ্বি-বার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী, বাংলাদেশ।

১৯৬৫ সালে কামরুল হাসান প্রেসিডেন্ট পুরস্কারে (তমঘা-ই-পাকিস্তান) ভূষিত হন। ১৯৭৭ সালে কুমিল্লা ফাউন্ডেশন শিল্পী কামরুল হাসানকে তাঁর শিল্পকর্মের জন্য প্রদান করে স্বর্ণপদক। এছাড়াও, ১৯৭৯ সালে ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার’, ১৯৮৪ সালে ‘বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মান’, ১৯৮৫ সালে কাজী মাহবুবউল্লাহ ফাউন্ডেশন পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৫ সালেই তাঁর বিখ্যাত তৈলচিত্র ‘তিনকন্যা’ অবলম্বনে একটি সুদৃশ্য ডাকটিকেট প্রকাশ করে তৎকালীন যুগোশ্লাভ সরকারের ডাক, তার ও টেলিফোন বিভাগ (২ ডিসেম্বর ১৯৮৫)। এটিই ছিলো কোনো বিদেশী সরকার কর্তৃক বাংলাদেশি কোনো শিল্পীর শিল্পকর্ম সম্বলিত ডাকটিকেট প্রকাশের প্রথম ঘটনা। ১৯৮৫ সালে তিনি মনোনীত হন বাংলা একাডেমীর ফেলো হিসেবে। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ সরকারের ডাকবিভাগ কর্তৃক তৃতীয় দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী উপলক্ষে কামরুল হাসানের ‘নাইওর’ চিত্রকর্মটি অবলম্বনে ৫ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশিত হয়।

জোটনিরপেক্ষ দেশসমূহের জন্য টিটোগ্রাদে স্থাপিত চিত্রশালা, লন্ডনের কমনওয়েলথ ইনস্টিটিউট, জাপানের ফূকুওকা মিউজিয়াম, ঢাকার শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর এবং পৃথিবীর বহুদেশের শিল্পরসিকদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে কামরুল হাসানের বহু চিত্রকলা সংরক্ষিত রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি (প্রায় দেড় হাজার) সংগ্রহ রয়েছে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষার্ধে কামরুল হাসানের শিল্পী জীবনের এক অন্যতম কাজ হচ্ছে- বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার চূড়ান্ত নকশা অঙ্কন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে সংগ্রামী ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের যে জাতীয় পতাকা ওড়ানো হয়েছিল তার প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় পতাকার রূপ দেন। এর পাশাপাশি তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারি প্রতীক, বাংলাদেশ বিমান, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতীক অঙ্কন করেন। এছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানের কভার ডিজাইনেরও রূপকার তিনি। ১৯৭১ সালে কামরুল হাসানের আঁকা ইয়াহিয়ার দানবমূর্তি বিষয়ক কার্টুন সম্বলিত পোস্টারটির ভাষা ছিল এইরূপ : (বাংলায়) এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে। সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এই পোস্টারটি সম্পৃক্ত হয়ে আছে।

ঢাকা শহরে বৈশাখী মেলা আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন কামরুল হাসান। বাঙালিত্বের চেতনা ও জাতীয়তাবাদের প্রসারের লক্ষ্যেই তিনি ঢাকায় বৈশাখী মেলা আয়োজনের পরিকল্পনা করেন।

১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কামরুল হাসান একটি কবিতা উৎসবে যোগ দেন। সেখানে স্বরচিত কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতিত্ব করছিলেন। তখনই কবি রবীন্দ্র গোপের ডায়রির পাতায় আঁকেন সেসময়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সামরিক স্বৈরাচারকে নিয়ে কার্টুনচিত্র ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’।

সে উৎসবেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৮৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ চত্বরে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পাশে সমাহিত করা হয়।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট

80%
Awesome
  • Design
মন্তব্য
লোডিং...