এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

রুটির সাতকাহনঃ কোথায় থেকে আসল আমাদের আজকের রুটি

431

- Advertisement -

চিত্র ঃ নব্য প্রস্তর যুগে রান্না আর জাউ তৈরি এর দৃশ্য

সকাল বেলাতে আমাদের সবার যে জিনিসটা না হলে চলেই না সেটা হচ্ছে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা রুটি , এক সময়ে তিন বেলাই ভাত খেলেও আজকে আমাদের অনেকের একবেলা বা দুইবেলা এর নিত্যসঙ্গী এই রুটি , কেউ কেউ তো ডায়াবেটিস এর কারণে রুটি ছাড়া চলতেই পারেন না ,আগে আমাদের শুধুমাত্র উৎসবে আর পালা পার্বণে রুটি হলেও , আমাদের এই ভারতবর্ষে আর পৃথিবীতে রুটির ইতিহাস অনেক অনেক পুরনো । তা ঠিক কতদিন আগে থেকে আমাদের এই গরম গরম রুটি আমাদের মাঝে আছে , আর এর সূচনাই বা কোথায় থেকে হল , দেখা যাক ।

আমাদের মাঝে গম বা গম জাতীয় খাবার এর প্রচলন হয় সম্ভবত আজকে থেকে প্রায় ২০ হাজার বছর আগে , এই সময়ে আমাদের পূর্ব পুরুষ রা রাই এর আকার এর ছোট ছোট বুনো গম ভেঙ্গে আনতেন । সেখান থেকেই গ্রুয়েল বা গম এর জাউ খাবার সূচনা ।

যদিও কোন কোন ইতিহাসবিদ রুটি এর এই ইতিহাস কে প্রায় ৩০ হাজার বছর আগে রাখতে চান , কিন্ত এরপরেও সর্ব গ্রহণযোগ্য মতামত হচ্ছে রুটি এর প্রথম প্রসার ঘটে আজকে থেকে প্রায় ১০ হাজার বছর আগে মিশরে । কেননা ন্যাশনাল একাডেমি অফ হিস্টোরি এর গবেষণা এর ফলে দেখা যায় যে প্রাগৈতিহাসিক সময়কার হামানদিস্তা তে গম আর যব চূর্ণ এর অবশেষ পেয়েছিলেন , এই কারণে এটা আরও আগেরও হতে পারে ।

রুটি, এক রুপে বা অন্য রুপে , মানুষ এর জন সবথেকে প্রাচীন একটি খাবার ছিল সব সময়   পাচক বা রুটি প্রস্তুতকারী , বিশ্বের প্রাচীনতম পেশা এর  একটি। প্রাচীন মিশরীয় সমাধিতে খামির করা   আর  বেলে নেওয়া  রুটি পাওয়া গেছে যেগুলো প্রায়  5000 বছর আগে তৈরি  করা হয়েছিল , সেগুলো এখন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ডিসপ্লেতে রাখা আছে   । এছাড়াও সেখানে আরও আছে ফারাও এর সময়কার চূর্ণ করা গম , যে গুলো সরাসরি ফারাও এর অধীনেই চূর্ণ করা হয়েছিল প্রাচীন গ্রীষ্মের উৎসব এর সময় । রুটি, খামিহীন আর খামির করা  দুই ধরণ এর রুটির কথাই বাইবেলে বহুবার এসেছে । প্রাচীন গ্রীক এবং রোমানদেরও প্রধান খাদ্য ছিল রুটি , এমনকি সেই সময়েও লোকেরা তর্কাতর্কি করত  যে সাদা রুটি সেরা না বাদামী রুটিই সেরা ।

তবে এই রুটি আমাদের ভারতীয় রুটি এর জাতভাই ছিল , এদের কে বলা হত Flat Bread বা হাতের রুটি , এখন বেলনার প্রবর্তন হবার পরেও এই রুটি হাতে বানানো রুটিই থেকে গেছে ।

তবে ৩০০০ খ্রিস্টপূর্ব এর আগ পর্যন্ত ইস্ট আবিষ্কৃত না হবার কারণে পাউরুটি বা খামির  রুটি আমাদের জন্য অধরাই থেকে যায় ।

প্রাচীন মিশরে রুটি বা ব্রেড এর জন্য ছিল আলাদা সিম্বল হায়রোগ্লিফিক্স এ , সেটা কেমন ছিল আমরা একটু দেখি ।

চিত্রঃ হায়ারোগ্লিফিক্স  এ রুটির জন্য বিভিন্ন চিহ্ন ।

অনেক প্রাচীন মিশরীয় কাহিনী তে পর্যন্ত এই রুটি নিয়ে কথকতা আছে ।

এই চিত্রতে লেখা কাহিনীর  মানে , “আমাকে আমার সাদা গমের তৈরি রুটি আর লাল গমের তৈরি এল (বিয়ার) খেয়ে সুখে থাকতে দাও”

যদিও আজ পর্যন্ত আমরা বের করতে পারিনি যে আসলে রুটি এর গম কোন ধরণ এর ঘাস থেকে সর্বপ্রথম তৈরি হত , এত ধরণ এর ঘাস এর মধ্যে থেকে আদিম মানুষ কোন ঘাস থেকে গম এর শীষ সংগ্রহ করত , সেটা আজও অজানা আমাদের কাছে ।

লৌহ যুগে রুটি আর তার বর্ণনা

 লৌহযুগ আমাদের জন্য নিয়ে আসে নতুন সময় , ইজিয়ান মহাপ্রলয় কে দূরে সরিয়ে আমরা আবারও জেগে উঠি মানব হিসেবে , আর এই লৌহ যুগের সবথেকে বড় প্রামাণ্য ছিল আদি পুস্তক বা ওল্ড টেস্টামেন্ট আর স্বভাবতই এতে রুটি এর ইতিহাস ও বর্ণিত ছিল ।

যদিও ওল্ড টেস্টামেন্টের সময়ে, সব ক্ষেত্রেই এটা পাওয়া যায় যে রুটি তৈরি, শস্য প্রস্তুত করে, রুটি বানানো  , এসমস্ত কিছু ছিল নারীর কাজ, কিন্তু রাজাদের, রাজপুত্রদের এবং বড় বড় বাড়ির প্রাসাদের মধ্যে, রুটি কারিগরদের বিশেষ কর্তব্য পালন করতে হত  । এই সময়ে যদিও খামির করা রুটি এর ব্যবহার দেখা যায়  , এই রুটিতে কোন ধরণ এর ইস্ট জাতীয় পদার্থ দেওয়া হত যার ফলে  আমাদের পাউরুটি এর খন্ডের আকারে সেগুলো ফুলে উঠত । মিসর থেকে ইজরায়েলি দের  যাত্রাপুস্তক এর যে  মহাযাত্রা বর্ণিত আছে  তাতে দেখা যায় যে রুটি খামির বিহীন অবস্থাতেই তারা নিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল , এই কারণে জিউ বা ইহুদি রা আজকেও খামির বিহীন রুটি খেয়ে সেই দিবসটি উৎযাপন করে । পম্পেই আর হারকিউলেনিয়াম এর  ধ্বংসাবশেষ থেকে  ঐ ঐতিহাসিক সময়ে  বেকারি গুলো কেমন ছিল সেটা আমরা জানতে পারি । সেখানে পাবলিক বেকারি  ছিল যেখানে দরিদ্র লোকরা তাদের রুটি কিনে নিয়ে বাড়িতে গিয়ে সেঁকে নিতে পারে  করার জন্য নিয়ে আসে, বা সেখান থেকে তারা সেঁকা  রুটি কিনতে পারে।

চিত্র ঃ লৌহ যুগে রুটি এর দৃশ্য , আর রান্না ।

রোমানযুগে রুটি

 প্রাচীন রোমে সর্বপ্রথম রুটি কারিগর দের সংঘ (Bakers Guild) এর সূচনা হয় ১৬৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে , তারা যে কলেজে এটা শিক্ষা দিতেন এই কারিগরি এর তাকে বলা হত Collegium Pistorum সেই সময়ে রুটি বা ব্রেড এর কারিগর দের আলাদা মর্যাদা ছিল , কেননা তারাই ছিলেন একমাত্র স্বাধীন কারিগর সমগ্র রোম সাম্রাজ্যে বাকি সমস্ত কাজ আর ছোট পেশা , দাস দের মাধ্যমে চালানো হত । এই সংঘের সদস্যরা গ্ল্যাডিয়েটর দের খেলাধুলা এবং নাটকের ভাঁড়/অভিনেতা , কারো সাথেই মিশতে পারতেন না , কেননা এসব দাস দের সংস্পর্শে তাদের অপবিত্র হবার আশঙ্কা ছিল ।

আশ্চর্যের কথা হচ্ছে তাদের সেই সংঘ আজও বিদ্যমান ।

- Advertisement -

এই হচ্ছে সেই সংঘের মনোগ্রাম বা Coat OF Arms.

রোমানদের পূর্বে গ্রিক দের মাঝেও রুটি এক ধরণ এর আভিজাত্য কেই নির্দেশ করত ,

প্লেটো তার ইউটোপিয়া তে আশা করেছেন যে সমস্ত মানুষেরা সাদা গম এর রুটি খেয়ে সেখানে জীবন ধারণ করবে ।

মধ্যযুগে রুটি ও সেন্ট এন্থনি এর ক্রোধ

রাই এর তৈরি কৃষ্ণবর্ণের রুটি খাবার কারণে এক ধরণ এর ভয়াবহ অসুখ এর মধ্যে পড়তে হয়েছিল সমগ্র ইউরোপ কে মধ্যযুগে , যাকে ধরা হত সেন্ট এন্থনি এর ক্রোধ হিসেবে । এরগোট এর  (যা রাই এর সাথে জন্মানো এক জাত এর ছত্রাক এর নাম)  মধ্যে এমন এক ধরণ এর কেমিকেল এর অস্তিত্ব থাকতো যার ফলে সেটা দিয়ে বানানো রুটি খেলে পারে মানুষ এর মাঝে পাগলামি , ভুল দেখা , হ্যালুসিনেশান সহ নানা রকম এর সমস্যা দেখা দিত । সবাই মনে করত এটা সেন্ট এন্থনি এর ক্রোধ , আর সেই সময়ে সমগ্র ইউরোপে শুধু সেন্ট এন্থনি এর দ্যা অর্ডার অব এন্থনিই ছিল একমাত্র চিকিৎসা সংঘ , যারা এই রোগ এর চিকিৎসা করতে পারতো , এই রোগ যদি অধিক দিন ধরে চলত তাহলে মানুষ এর আঙ্গুল খসে পড়ে যেত কালো হয়ে । এই কারণে ফ্রান্স থেকে প্রায় ৪০০ কিমি দূরে কলমার শহরে  সেন্ট এন্থনি এর চার্চ এ দরিদ্র তীর্থযাত্রী দের ভিড় লেগেই থাকত , তবে তারা এটাই জানত না যে সাদা রুটিতে এই ফাঙ্গাস জন্মায় না এটা সেই ধর্ম যাজক রা জানতেন , তারা তাদের কে সাদা গমের  রুটি খাইয়ে ভালো করে দিতেন , যার পুরো কৃতিত্ব যেত তখন সেন্ট এন্থনি এর উপরে ।

সেন্ট এন্থনি এর এই রোগ নিয়ে সবথেকে নিখুত বর্ণনা পাওয়া যায়  জেরওয়ার্ড নামের এক রয়েল চ্যাপেলেইন বা রাজকীয় ধর্মাবেত্তা  এর লেখা Annales Xantenses এ , এখানে বলা হয়েছে ৮৫৭ সালের দিকে এক ভয়াবহ রোগ এর প্রাদুর্ভাব ঘটে যেটা ছিল এরূপ

“victims suffered from hallucinations, insanity, vomiting, and gangrene of the hands and feet due to constriction of blood flow to the extremities. Those afflicted felt as if they were being burned at the stake as their fingers and toes split open and dropped off, one by one. A late medieval chronicler wrote of an “invisible fire that separated the flesh from the bones and consumed it.”

চিত্র ঃ সেন্ট এন্থনির ক্রোধ

সেইন্ট  এন্থনি ছিলেন একজন মিশরীয় মঙ্ক যিনি সর্বদা উপবাস  আর নিজেকে পৃথিবীর সব ভালো জিনিস থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করতেন , তার মাঝেও এরকম ধরণ এর বিচ্ছিন্ন চিত্র কে দেখা আর অজ্ঞান হওয়ার বৈশিষ্ট্য ছিল , এই কারণে এটাকে সেণ্ট এন্থনি এর রোগ হিসেবেই দেখা হত ।

মধ্যযুগীয় মুসলিম দেশে ব্রেড বা রুটি

মুসলিমেরা সেই সময়ে স্বর্ণযুগে ছিলেন যেই সময় ইউরোপ ছিল বর্বর অন্ধকার যুগে , সেই স্বর্ণপ্রভা তাদের খাবার এর মাঝেও ছিল , এটাই জানা যায় যে সে সময়ে মুসলিম সম্রাটেরা সাধারণ রুটিকেও শাহি টুকরা হিসেবে বানিয়ে খেতেন , এর সাথে সাথে থাকত চা আর অন্যান্য পানীয় , সেই সময়ে একজন ফ্রেঞ্জ রোগী এটাই জানিয়েছিলেন যে আল আন্দালুস(স্পেন)  এর হসপিটাল এর খাবার এত চমৎকার ছিল যে ইউরোপ এর অন্যান্য দেশ এর রোগীরা ভালো হবার পরেও সেখান থেকে যেতে চাইতেন না ।

এই ব্যাপারে বাগদাদ এর বিখ্যাত বাবুর্চি ইবনে সাইয়ার আল ওয়ারাক এর ভাষ্য থেকেই কিছুটা শুনে নেওয়া যাক ।

সাদা ব্রেড সব ক্ষেত্রেই একই রকম , এটা সব কিছুর সাথেই যায় , এর সাথে একটা ভালো পরিমাণ লবণ আর ইস্ট মিশালে এটা অনেক বেশী ফুলকো আর মচমচে হয় , এগুলো সহজপাচ্য আর সুন্দর ভাবে রান্নাও করা যায় । জিযমাযাক (এক ধরণ এর ফুলের রেণু মিশ্রিত ব্রেড) আর রুকাক (অতি পাতলা পাউরুটি)  তুলনামূলক কম ভারী খাবার , আর এরা হজমও হয় আর ও দ্রুত । মাল্লা(তন্দুর) এর রুটি আর তাবাক (বড় তাওয়া এর রুটি)  এরা বেশ কঠিন হজম করা , আর খেলে পেটে ব্যাথা হয় , শুধুমাত্র কঠোর পরিশ্রমকারী মানুষেরাই এগুলো খেতে পারে ।

চিত্র ঃ মধ্যযুগে অভিজাত রুটির কারিগর

রেফারেন্স

 https://www.botham.co.uk/bread/history1.htm

 http://www.ancientcraft.co.uk/Archaeology/iron-age/ironage_food.html

 https://www.jstor.org/stable/3560205?seq=1#page_scan_tab_contents

 https://en.wikipedia.org/wiki/Ergotism#History

https://en.wikipedia.org/wiki/Ergotism#History

 http://www.medievalists.net/2013/07/bread-in-the-middle-ages/

মন্তব্য
লোডিং...