এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

স্টিফেন কিং : রক্তমাংসের মানুষ হয়েও যিনি ভূতেদের রাজা

656
সাহিত্যের বিভিন্ন ঘরানা মধ্যে অন্যতম হলো হরর উপন্যাস। আমাদের বাংলা সাহিত্যেও এটি একটি বহুচর্চিত ঘরানা। আগেও এটি নিয়ে কাজ হয়েছে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। আপনি জেনে হয়তো অবাক হবেন, স্বয়ং বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়সহ বাংলা সাহিত্যের অনেক সুপ্রতিষ্ঠিত লেখক সাহিত্যের এই ঘরানাটি নিয়ে কাজ করেছেন! সেসব কথা অন্য একদিন হবে। আজ কোনো বাঙালি লেখকের ভুতের গল্প নিয়ে কথা বলবো না। বরং এমন একজনের কথা বলবো যিনি হরর বা ভৌতিক সাহিত্যের জগতে “মাস্টার অব হরর” হিসাবে স্বীকৃত। তাকে তুলনা করা হয় জীবন্ত কিংবদন্তি হিসাবে। এ পর্যন্ত তার মোট বিক্রিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশো মিলিয়ন কপিরও অধিক। তার লেখা গল্প উপন্যাস থেকে তৈরি হয়েছে সিনেমা, মিনিসিরিজ, টেলিভিশন সিরিজ, কমিক বই প্রভৃতি। বলছিলাম আমেরিকান লেখক স্টিফেন এডউইন কিং  এর কথা, সাহিত্যের জগতে যিনি স্টিফেন কিং (Stephen King) নামেই সুপরিচিত। স্টিফেন কিংয়ের জীবন বেশ ঘটনাবহুল। তার জীবনের টুকিটাকি নিয়েই সাজানো হয়েছে লেখাটি।
ব্যক্তিগত জীবন

আমেরিকার মাইন শহরের পোর্টল্যান্ডে ১৯৪৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর স্টিফেন কিংয়ের জন্ম। তার বাবা ডোনাল্ড কিং ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। যদিও প্রাথমিক জীবনে তার বাবার নাম ছিল ডোনাল্ড পোলক, কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি “পোলক” বাদ দিয়ে নামের শেষে “কিং” জুড়ে দিয়ে বনে যান ডোনাল্ড কিং। কিংয়ের বয়স যখন দুই, তখন তাদের বাবা ডোনাল্ড কিং, তাদেরকে ছেড়ে চলে যান। স্টিফেন কিং ও তার বড়ো ভাই ডেভিড বড়ো হয়েছেন তাদের মা নেলি রুথের কাছে। বাল্যকালে বিভিন্ন সময়ে অর্থ কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবন পার করতে হয়েছে তাদেরকে। অনেক সময় না খেয়ে কাটাতে হয়েছে তাদেরকে। ক্ষুধার কষ্ট ভুলতে তারা দুই ভাই সস্তা হরর সিনেমাগুলো দেখে কাটিয়ে দিয়েছে দিনের অনেক সময়।
[বাঁ থেকে] স্টিফেন কিং, স্ত্রী টাবিথা কিং, ছেলে ওয়েন কিং

কিংয়ের বেড়ে ওঠা জন্মস্থান মাইন শহরেই। অবশ্য কিছুকাল তিনি তার পরিবারের সাথে উইসকনসিন, ইন্ডিয়ানা এবং স্ট্যানফোর্ডে কাটালেও এগারো বছর বয়স থেকে স্থায়ীভাবে মাইনেই বসবাস শুরু করেন। কিংয়ের বেশকিছু লেখার পটভূমি গড়ে উঠেছে মাইন শহরকে কেন্দ্র করে।

ডারহ্যাম এলিমেন্টারি স্কুলে কিংয়ের শিক্ষা জীবনের শুরু। ১৯৬৬ সালে লিসবন ফলস হাই স্কুল থেকে পাশ করে বের হওয়ার পর ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব মাইনে। ১৯৭০ ইংরেজি বিষয়ের ওপর ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন কিং। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তার সাথে পরিচয় হয় টাবিথা স্প্রুসের সাথে। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর টাবিথা স্প্রুস টাবিথা কিং নাম ধারণ করেন। টাবিথা নিজেও লেখালেখির সাথে জড়িত। স্টিফেন ও টাবিথা দম্পত্তি তিন সন্তান–নওমি কিং, জো হিল, ওয়েন কিং। উল্লেখ্য তাদের সন্তানেরাও পরবর্তীতে বাবা-মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন, অর্থাৎ লেখালেখির জগতের সাথে সরাসরি যুক্ত। এর মধ্যে জো হিল বর্তমান সময়ের বেশ জনপ্রিয় লেখকদের একজন।

লেখক হিসাবে ক্যারিয়ারের শুরু (stephen king books)

স্টিফেন কিংয়ের লেখালেখিতে হাতে খড়ি হয় ছোটোবেলাতেই। তবে পেশাদার লেখক হিসাবে কাজ করার শুরুটা হয় আরো পরে। ১৯৬৭ সালে প্রথমবারের মতো স্টার্লিং মিস্টেরি স্টোরিজের কাছে তিনি তার লেখা ছোটোগল্প “দ্য গ্লাস ফ্লোর” বিক্রি করেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর হাই স্কুলের শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন কিং, কিন্তু সেই সময় কোনো পদ ফাঁকা না থাকায় শিক্ষকতার পেশায় ঢোকা সম্ভব হয়ে ওঠে না তার। তাই তাকে জীবিকা নির্বাহের জন্য ক্যাভালিয়্যার ম্যাগাজিনের মতো পত্রিকাগুলোতে ছোটোগল্প লিখতে হতো। সেসব গল্পের অধিকাংশই পরবর্তীকালে কিংয়ের ছোটোগল্পের সংকলন “নাইট শিফট” সংকলিত হয়েছে।

১৯৭১ সালে হাম্পডেন অ্যাকাডেমিতে শিক্ষক হিসাবে যোগ দান করেন কিং। ১৯৭৩ সালে ডাবলডে পাব্লিশিং হাউজ তার লেখা “ক্যারি” উপন্যাসটি বই আকারে ছাপার আগ্রহ প্রকাশ করে। জানা যায়, ডাবলডে পাব্লিশিং হাউজের সম্পাদক উইলিয়াম থম্পসন কিংকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ঐ বছর মার্চের শেষ দিকে অথবা এপ্রিলের শুরুর দিকে টেলিগ্রাম পাঠান এবং তাতে ক্যারির জন্য ২৫০০ ডলার সম্মানী অগ্রিম পাঠিয়ে দেন। উল্লেখ্য, “ক্যারি” কিংয়ের লেখা চতুর্থ উপন্যাস হলেও বই আকারে এটিই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

 

আদতে “ক্যারি” হওয়ার কথা ছিল একটি ছোটোগল্প। কিন্তু লিখতে গিয়ে বেশ বড়ো হয়ে যাচ্ছিল বিধায় কিং প্রথম পৃষ্ঠাগুলো গার্বেজ ক্যানে ফেলে দেন। কিংয়ের স্ত্রী টাবিথা তখন গার্বেজ ক্যানের ভেতর পৃষ্ঠাগুলো পেয়ে পড়েন এবং কিংকে অনুরোধ করেন লেখা চালিয়ে যেতে। স্ত্রীর পরামর্শে কিং লেখা চালিয়ে গেলে তা একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসে রূপ নেয়।

“ক্যারি” উপন্যাসটির কাহিনি গড়ে উঠেছে ক্যারি হোয়াইট নাম্মী এক স্কুল পড়ুয়া মেয়েকে কেন্দ্র করে। ক্যারি উপন্যাসের জন্য পাওয়া অগ্রিম সম্মানী দিয়ে তিনি একটা নতুন ফোর্ড পিন্টো কেনেন। ১৯৭৩ সালের ১৩ এপ্রিল নিউ আমেরিকান লাইব্রেরি ৪ লাখ ডলারে “ক্যারি” উপন্যাসটির পেপারব্যাকের স্বত্ব কিনে নেয়। “ক্যারি” কিংয়ের লেখক ক্যারিয়ারে যে গতি এনে দিয়েছিল তার ধারা আজও বর্তমান। এরপর আর তাকে থেমে থাকতে হয়নি। ১৯৭৬ সালে উপন্যাসটি অবলম্বণে নির্মিত হয় হরর সিনেমা।

 

মায়ের মৃত্যুর পর পরিবার নিয়ে কিং চলে যান কলোরাডোর বোল্ডারে। সেখানেই লিখে ফেলেন তার বহুলালোচিত উপন্যাস “দ্য শাইনিং”, যেটি ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯৭৫ সালে কিং চলে আসেন পশ্চিম মেইনে। ততদিনে লিখে ফেলেছে “দ্য স্ট্যান্ড” উপন্যাসটি, যেটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে, পরবর্তীতে অনেক ক্রিটিক এটিকে কিংয়ের সবচেয়ে সেরা কাজ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।

কিং এখন পর্যন্ত প্রায় ৬১ টি উপন্যাস ও প্রায় ২০০ টিরও অধিক ছোটোগল্প লিখেছেন। রিচার্ড বাচম্যান, জন সুইদেন, বেরিল ইভানস ছদ্মনামগুলো ব্যবহার করেও বিভিন্ন সময় লেখালেখি করেছেন।

হরর সাহিত্যে প্রবেশের ক্ষেত্রে ছোটোবেলার এক স্মৃতিকে দায়ী করেন তার পরিবার। শোনা যায়, শৈশবে তার এক বন্ধু ট্রেন দূর্ঘটনায় মারা যাওয়ার সাক্ষী হয়েছিলেন। তার পরিবারের ভাষ্যমতে, কিং ছেলেটির সাথে খেলতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, এবং যখন তিনি বাড়ি ফিরে আসেন, তিনি ছিলেন নির্বাক। মানসিকভাবে ধাক্কা খেয়েছিলেন। অনেকে মন্তব্য করেন সেই ঘটনার ভূমিকা রয়েছে কিংয়ের হরর লেখক হয়ে ওঠার পেছনে। যদিও কিং তার “অন রাইটিং” বইয়ে এ সম্পর্কে কিছুই বলেননি।

পাঠকদের অটোগ্রাফ দিচ্ছে
স্টিফেন কিং এর লেখা অবলম্বনে মুভি ( stephen king movies)

কিংয়ের লেখা উপন্যাস ও ছোটো গল্প থেকে বিভিন্ন সময়ে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন সিনেমা। সেই সিনামাগুলোও হয়েছে ব্যবসায় সফল। পেয়েছে সিনেমা সমালোচকদের বাহবা। কিংয়ের রচিত উপন্যাস “দ্য স্ট্যান্ড”, “দ্য শাইনিং”, “ক্যারি”, “IT”, “পেট সিমেটারি”, “ডার্ক টাওয়ার” সহ বিভিন্ন উপন্যাস থেকে তৈরি করা হয়েছে বেশ কিছু সিনেমা।

 
লেখালেখিতে অবদানের স্বীকৃতি

বিভিন্ন সময়ে লেখালেখির জন্য কিং ভূষিত হয়েছেন বিভিন্ন পুরষ্কারে। তিনি দুই বার আমেরিকান লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক “বেস্ট বুক ফর ইয়াং অ্যাডাল্ট”-এ ভূষিত হয়। ব্রাম স্টোকার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন এখন পর্যন্ত মোট ১৫ বার। চারবার লাভ করেন ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ড। দু’বার কনভেনশন অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন। ছ’বার জিতেছেন ব্রিটিশ ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ড। মি. মার্সিডিজ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন এডগার অ্যাওয়ার্ড। দু’বার জিতেছেন ইন্টারন্যাশনাল হরর গিল্ড অ্যাওয়ার্ড। লুকাস অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন পাঁচবার। ইউনির্ভাসিটি অব মাইনের অ্যালামনাই ক্যারিয়ার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। সালে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড হরর কনভেনশনে স্টিফেন কিং “ওয়ার্ল্ড হরর গ্র্যান্ড মাস্টার” উপাধিতে ভূষিত হন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে আরো অনেক অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন তিনি।

লেখক হিসাবে তাকে সবচেয়ে সফল বলে মনে করা হয়। তার লেখা প্রায় প্রতিটি বই-ই আন্তর্জাতিক বেস্টসেলার হিসাবে স্বীকৃত।

 
কিংয়ের পছন্দের কিছু বই

লেখক কিং বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসতেন। তার পছন্দের বইগুলো হলো–দ্য গোল্ডেন আরগোসি, অ্যাডভেঞ্চার অব হাকলবেরি ফিন, দ্য স্যাটানিক ভার্সেস, লর্ড অফ দ্য ফাইলস, ব্লেক হাউজ, নাইনটিন এইটি-ফোর, ব্লাড মেরিডিয়ান, লাইট ইন আগস্ট প্রভৃতি।
গিটার বাজাচ্ছেন স্টিফেন কিং
কিং সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য
  • স্টিভ হলো তার ডাকনাম।
  • হাইস্কুলের ব্যান্ডে তিনি গিটার বাজাতেন।
  • তিনি গতানুগতিক ধর্মীয় ভাবধারায় বিশ্বাস করেন না। তবে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন।
  • স্টিফেন কিংয়ের প্রায় ১৭ হাজার বইয়ের একটি লাইব্রেরি রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, লাইব্রেরির সবগুলো বই-ই তার পড়া।
  • বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রখ্যাত লেখিকা লেখিকা জে কে রাওলিং এবং নিল গেইম্যানের লেখার ভক্ত তিনি।
  • মাত্র দশ দিনে ৩০৪ চার পাতার “দ্য রানিং ম্যান” উপন্যাসটি লিখেছিলেন।
  • বিভিন্ন চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানে কিং তার আয় থেকে মোটা অংকের ডোনেশন দিয়ে থাকেন, কিন্তু অর্থের অংকটা কখনোই প্রকাশ করেন না।
  • সম্ভাবনাসম্পন্ন সিনেমা পরিচালকদের তিনি তার ছোটোগল্পের স্বত্ব নামমাত্র এক ডলারে দিয়ে থাকেন।
  • একমাত্র আমেরিকান হিসাবে কানাডিয়ান বুকসেলারস অ্যাসোসিয়েশন থেলে আজীবন সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
  • স্টিফেন কিংকে একবার গাড়ি চালাতে গিয়ে ২৫০ ডলার জরিমানা গুণতে হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ে তার হাতে কোনো অর্থই ছিল না। জরিমানার ঐ অর্থ তাকে পরিশোধ করতে হয়েছিল ম্যাগাজিনে একটা ছোট গল্প বিক্রি করে।
স্টিফেন কিংয়ের রচিত উপন্যাস “IT” থেকে নির্মিত সিনেমার

কিংয়ের লেখায় কেবল যে ভৌতিক ব্যাপার-স্যাপারগুলোই বিদ্যমান তা কিন্তু নয়। বরং এর পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনগুলোর দিকেই তাকে জোর দিতে দেখা যায়। এতে করে তার লেখা গল্প বা উপন্যাসগুলো পাঠকের মনের ভেতর পোক্ত আসন গাড়তে সক্ষম হয়। ভয় বিষয়টাকে আরো স্থায়িত্ব প্রদান করে।


*ফিচার ইমেজ সোর্স : movieweb.com
মন্তব্য
লোডিং...