এবার পুরো পৃথিবী বাংলায়

খোয়াজ খিজির : বাংলাদেশের পোসাইডন (বাংলা কিংবদন্তী-প্রথম পর্ব)

ইংরেজি Legend শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ হলো কিংবদন্তী। কিংবদন্তী শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো জনশ্রুতি। মূলত, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে যেসব কাহিনি ঘুরে বেড়ায় এবং অনেকক্ষেত্রে সত্য বলে সাধারণ মানুষ বিশ্বাসও করে থাকে, এ ধরনের জনশ্রুতি বা কাহিনিকে কিংবদন্তী বলা হয়। বাংলাদেশের আনাচেকানাচে এমন হাজারও জনশ্রুতি বা কিংবদন্তী ছড়িয়ে আছে। তেমনি একটি কিংবদন্তী হলো খোয়াজ খিজির।

গ্রিক মিথলজির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর একটি হলো দেবতা পোসাইডন, যিনি পানির নিচের রাজ্যের শাসক ও একচ্ছত্র অধিপতি। আবার রোমান মিথলজিতে একই রূপে দেখা যায় দেবতা নেপচুনকে। আমাদের দেশেও রয়েছে এমন একজন, যাকে আমাদের লোককথার বিভিন্ন জায়গায় উপস্থাপন করা হয়েছে পানির রাজা হিসাবে। শুধু লোককথাতেই তার স্থান সীমাবদ্ধ এমনটা নয়, বরং তিনি অনেকের বিশ্বাসের মধ্যেও স্থান করে নিয়েছেন যুগ যুগ ধরে। মুসলমানদের কাছে তিনি পানির পীর হিসাবেও স্বীকৃত। তার নাম হয়তো আপনি শুনে থাকবেন। বঙ্গদেশের সেই পানির রাজার নাম খোয়াজ খিজির। তবে তিনি পোসাইডন বা নেপচুনের মতো ত্রিশূলধারী নন।

আরো পড়ুন- ৫টি প্রাচীন লেজেন্ড (কিংবদন্তী) যেগুলো সত্যিই ঘটেছিল

জনশ্রুতি রয়েছে, পানির নিচে যে জগতটি রয়েছে, খোয়াজ খিজির হলেন সেই জগতের শাসক, একচ্ছত্র অধিপতি। তার রয়েছে অলৌকিক সব ক্ষমতা। খোয়াজ খিজিরের সেইসব অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে কিংবদন্তী। বলা হয়ে থাকে খোয়াজ খিজির শুধু পানির নিচের সম্রাজ্যের শাসকই নয়, একই সাথে তিনি পানির নিচে থাকা যাবতীয় ধনসম্পদেরও মালিক। তার চারিত্রিক গুণাবলীর মধ্যে অন্যতম হলো–দরিদ্র লোকেদের প্রতি সবসময় সদয় থাকা। বলা হয়ে থাকে, একসময় যদি কোনো অভাবী লোক অর্থকষ্টে পড়ে কোনো দীঘি বা জলাশয়ের তীরে গিয়ে খোয়াজ খিজিরের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতো, তখন জলের ওপর একটি সোনার সিন্দুক ভেসে উঠত। সিন্দুকটি থাকতো নানাবিধ রত্নরাজিতে পরিপূর্ণ। সেখান থেকে কেবল যেকোনো একটি রত্ন তুলে নেওয়া যেত। একের অধিক রত্ন তুলে নেওয়া ছিল একেবারেই নিষিদ্ধ। যদিও সিন্দুকে থাকা প্রতিটি রত্নই ছিল বহু মূল্যবান। শুধু মূল্যবান রত্ন দিয়েই সাহায্য করতো তা কিন্তু নয়। একসময় বিভিন্ন দীঘি বা জলাশয়ের জল থেকে তৈজসপত্রও ভেসে উঠতো বলেও কথিত আছে। আমাদের দেশে এটি খুবই জনপ্রিয় জনশ্রুতি। সেই তৈজসপত্রগুলোর মালিকও এই খোয়াজ খিজির। তবে এখন আর খোয়াজ খিজির কাউকে সহায়তা করেন না। এ নিয়েও একটি কিংবদন্তী শোনা যায় লোকমুখে।

খোয়াজ খিজিরের প্রতীকী চিত্র (ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত)

কথিত আছে, একবার এক দরিদ্র মাঝি অর্থকষ্টের পীড়া সহ্য করতে না পেরে খোয়াজ খিজিরের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। তার আহ্বানে সাড়া দেন খোয়াজ খিজির। জলে ভেসে ওঠে খোয়াজ খিজিরের রত্নরাজি ও মণিমাণিক্যতে পরিপূর্ণ সোনার সিন্দুক। সিন্দুকটি থেকে একটি মূল্যবান রত্ন তুলেও নেয় সে। কিন্তু সম্পদের প্রাচুর্যতা দেখে নিজের লোভকে সংবরণ করতে পারেনি। সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সিন্দুকটি থেকে একের অধিক সম্পদ তুলে নেয় এবং বাড়ি ফিরে আসে। পুরো বিষয়টা নিজের ভেতরে গোপন রাখলো সে। বাড়িতে থাকা বিশালাকার খড়ের গাঁদার মধ্যে চুরি করে আনা রত্নটি লুকিয়ে রাখলো।

মাঝি যখন রাতে ঘুমিয়ে পড়ল, তখন তার স্বপ্নে হাজির হলো পানির রাজা খোয়াজ খিজির। স্বপ্নের ভেতর খিজির তাকে চুরি করে আনা অতিরিক্ত রত্নটি দীঘির জলে ফিরিয়ে দিয়ে আসতে বলল। তখনই মাঝির ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু সম্পূর্ণ ব্যাপারটাকে নিছক স্বপ্ন ভেবে এড়িয়ে গেল। গা করলো না। চুরি করে আনা রত্নটিকে নিজের কাছেই রেখে দিলো। পরদিন রাতে মাঝি যখন গভীর ঘুমে মগ্ন, একইভাবে খিজির তার স্বপ্নে হাজির হলো এবং আগের মতোই চুরি করে আনা রত্নটিকে দীঘির জলে ফিরিয়ে দিতে বলল। কিন্তু এবারও মাঝি তার কথা কানে তুলল না। তৃতীয় রাতেও মাঝি যখন ঘুমালো, খিজির তাকে স্বপ্নের মধ্যে দেখা দিলো। এবার পানির রাজাকে প্রচণ্ড ক্রুধ দেখাচ্ছিল। মাঝিকে সে নিঃবংশ হওয়ার এবং কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হওয়ার অভিশাপ দিলো এবং সেই সাথে জানিয়ে দিলো মাঝির লোভ এবং বার বার চুরির ধনটি ফিরিয়ে দিতে বলার পরেও ফিরিয়ে না দেওয়ার শাস্তিস্বরূপ এরপর থেকে সব মানুষ খোয়াজ খিজিরের সাহায্য থেকে বঞ্চিত হবে।

তৎক্ষণাৎ ঘুম ভেঙে যায় মাঝির। মনের ভেতর খচখচ করতে শুরু করলো তার। দ্রুত বিছানা থেকে নেমে চুরি করে আনা রত্নটি পরীক্ষা করতে খড়ের গাঁদার দিকে ছুটল। সেখানে গিয়ে দেখল রত্নটি আর জায়গা মতো নেই। তখনই বোধদয় মাঝির। নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয় না। খোয়াজ খিজিরের অভিশাপে এক এক করে তার সব ক’টি সন্তান মারা যায়। কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হলো সেই মাঝি। আর এরপর থেকে আর কখনোই মূল্যবান ধনসম্পদে পরিপূর্ণ খোয়াজ খিজিরের সিন্দুককে জলের ওপর ভেসে উঠতে দেখা যায়নি।

কাহিনিটির আরেক রূপও রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো এক হতদরিদ্র্য ব্যক্তি তার মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে খোয়াজ খিজিরের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে খিজিরের পক্ষ থেকে সাহায্যের আশ্বাস মেলে। রত্নরাজি থেকে প্রয়োজনীয় থালা-বাটি সরবারহ করা হয় লোকটির বাড়িতে। উল্লেখ্য, সেগুলোর সবই ছিল সোনার তৈরি। যাই হোক, যথারীতি লোকটির মেয়ের বিয়ে ঠিকঠাকভাবেই সম্পন্ন হলো। সময় এলো বাসনকোসনগুলো ধুয়ে ফেরত দিয়ে আসার। কিন্তু তখন লোকটার স্ত্রীর মনের মধ্যে লোভ জন্ম নিলো। সে তার স্বামীকে না জানিয়েই বাসনকোসনগুলোর মধ্য থেকে একটা স্বর্ণের থালা লুকিয়ে রাখলো।

পরিষ্কার থালাবাসনগুলো নিয়ে লোকটা নদীর ধারে গেল ফেরত দিতে। সেগুলো যখন নদীর জলে ছেড়ে দিলো অদ্ভুতভাবে কেন যেন ডুবল না, বরং ভেসে রইলো পানির ওপর। বার বার চেষ্টা করার পরেও কোনোভাবেই সেগুলো পানির তলায় তলিয়ে গেল না। বাধ্য হয়ে লোকটা সব বাসনকোসন বাড়িতে ফেরত নিয়ে এলো।

সেদিন রাতেই লোকটার স্বপ্নে খোয়াজ খিজির হাজির হলেন। তাকে বলা হলো সবগুলো বাসনকোসন ফেরত দিতে, নচেৎ তার মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে নায়রী আসার সময় জামাইসহ নৌকা ডুবিতে মারা যাবে। এমন অভিশাপে ভয় পেয়ে গেল লোকটা। পাবেই বা না কেন–পরের দিনই যে তার মেয়ে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়িতে নায়রী আসবে নৌকা করে। পরদিন সকালে উঠে স্বপ্নের কথা তার স্ত্রীকে খুলে বলল। কিন্তু তার স্ত্রী একটা থালা লুকিয়ে রাখার বিষয়টি তখনো তার কাছে গোপন করলো। লোকটা সন্ধ্যার দিকে আবারও নদীতে গেল বাসন ফেরত দিতে। কিন্তু বরাবরের মতো থালাবাসনগুলো জলের তলায় তলিয়ে গেল না। সেই সময় দেখলো নদীতে একটা নৌকা, ঘাটের দিকেই এগিয়ে আসছে। একটু কাছাকাছি আসতেই দেখলো, নৌকাতে রয়েছে তার মেয়ে আর মেয়ের জামাই। লোকটার চোখের সামনেই ঘটল হৃদয় বিদারক ঘটনাটি। কোনো ধরনের ঝড় ছাড়াই একেবারে শান্ত নদীর জলের মধ্যে ডুবে গেল নৌকাটি। আর তৎক্ষণাৎ বাসনকোসনগুলোও জলের তলায় তলিয়ে গেল। সেই ঘটনার পর থেকে আর কখনো খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক বা বাসনকোসন ভেসে উঠতে দেখা যায়নি।

পীর খোয়াজ খিজির (প্রতীকী ছবি)

খোয়াজ খিজিরকে নিয়ে বাংলাদেশে বেশ প্রচলিত জনশ্রুতি রয়েছে। যেমন তাকে আবেহায়াতের উৎসমূল হিসাবে গণ্য করা হয়। তিনি নৌকাডুবির হাত থেকে রক্ষা করেন। আবার সামুদ্রিক ঝড়-তুফানের কারণও মনে করা হয় তাকে। অবশ্য মাঝীমাল্লারা বিশ্বাস করে পীর খোয়াজ কেবল বিপদ ডেকেই আনেন না, ভক্তের বিপদ দূর করেও থাকেন।

বিশ্বাস করা হয়, নদী বা সমুদ্রের তীর হতে একটানা চল্লিশ দিন ধরে নজর রাখলে পীর খোয়াজ খিজিরকে দেখা যায়।

ধারণা করা হয় ১৩শ শতকের দিকে তুর্কি শাসকদের মাধ্যমে খোয়াজ খিজির বাংলায় প্রবেশ করে এবং স্থায়ীভাবে এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে স্থান করে নেয়। নদনদী, খালবিল ও হাওড় অধ্যুষিত অঞ্চলের সাধারণ মানুষেরা যেকোনো ধরনের জলের অকল্যাণকর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার জন্য জলের পীর বা রাজা খোয়াজ খিজিরের উদ্দেশ্যে বেরাভাসান উৎসবের আয়োজন করে থাকে। ভাদ্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবার বেরা বা কলার ভেলা ভাসিয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে, মুর্শিদাবাদ ও ঢাকার নবাব-নায়েব-নাজিমরাও খোয়াজ খিজিরের ভক্ত ছিলেন। মুকাররম খান, মীর কাশিমসহ অনেকেই মহাসমারোহে ভাদ্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবারে ঢাকার বুড়িগঙ্গায় এবং মুর্শিদাবাদের ভাগীরথী নদীতে বেরা ভাসিয়েছিলেন জনশ্রুতি রয়েছে।

বেরা তৈরির জন্য যে কলাগাছের প্রয়োজন তা সংগ্রহের জন্য গাছের মালিকের অনুমতি নিয়ে কলাবাগানে যায় এবং গাছের উদ্দেশ্যে বলে, “মা গঙ্গা ও খোয়াজ খিজিরের বেরা তৈরির জন্য সাতটি কলাগাছ চাই।” পরবর্তীতে এক কোপে কাটা হয় সাতটি কলাগাছ। কেটে  নেওয়া গাছ থেকেই তৈরি করা হয় বেরা। উল্লেখ্য, একটি বেরাভাসান গানে গানে খোয়াজ ও গঙ্গার বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের কথাও রয়েছে। তবে এসব ঘটনার আদৌ কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। সবটাই যুগের পর যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসছে।

আরো পড়ুন- অ্যালকেমি ও অমরত্ব সুধার খোঁজে

মন্তব্য
লোডিং...